আমানুর রহমান
মুক্তমত
জ্বালানি নিরাপত্তায় বিকল্পের সন্ধানে বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক নীরব অশনি সংকেত। আমদানিনির্ভর জ্বালানি তেলের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই আমাদের পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাত স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে। মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ সংকটের এই দুষ্টচক্র থেকে দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে নিজস্ব ও বিকল্প জ্বালানি অনুসন্ধানের কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে কৃষিজ বর্জ্য থেকে উৎপাদিত ‘বায়োফুয়েল’ বা জৈব জ্বালানি একটি অত্যন্ত গুরুত্ববাহী বিকল্প হতে পারে। দেশে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ ধানের তুষ ও গমের খড় মাঠে পুড়িয়ে নষ্ট না করে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তা থেকে বায়োইথানল এবং পোলট্রি বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব। ব্রাজিল বা ভারতের মতো আমরাও যদি পেট্রলিয়ামের সঙ্গে ইথানল মেশানোর নীতি গ্রহণ করি, তবে আমদানি ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনারও একটি স্থায়ী সমাধান মিলবে। তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে, খাদ্য নিরাপত্তা যেন ব্যাহত না হয়; তাই কেবল অখাদ্য বর্জ্য ও অনাবাদি জমিকেই এই কাজে ব্যবহার করতে হবে।
ভোজ্য নয় এমন তেলের বীজ জৈব জ্বালানির আরেকটি বড় উৎস। আমাদের দেশের মাটি জ্যাট্রোফা (ভেরেন্ডা), ক্যাস্টর এবং করঞ্জা চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এসব গাছ অনাবাদি বা পতিত জমিতে খুব সামান্য যত্নেই বেড়ে ওঠে। জ্যাট্রোফার বীজ থেকে সাধারণ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমেই উন্নতমানের বায়োডিজেল তৈরি সম্ভব, যা প্রচলিত ডিজেল ইঞ্জিনে সরাসরি ব্যবহার করা যায়। পতিত জমিতে এসব চাষে উৎসাহিত করে সরকার যদি কৃষকদের কাছ থেকে বীজ কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়, তবে তা গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখবে।
বিকল্প জ্বালানির আরেকটি চমৎকার ও সহজলভ্য উৎস হতে পারে ব্যবহৃত ভোজ্যতেল। বড় শহরগুলোতে প্রতিদিন প্রচুর পোড়া তেল ড্রেনে ফেলে মারাত্মক দূষণ ঘটানো হয়। অথচ এই তেলকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সহজেই পরিবেশবান্ধব বায়োডিজেলে রূপান্তর করা যায়। সিটি করপোরেশনের সহায়তায় একটি সুষ্ঠু সংগ্রহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে এই বায়োডিজেল সাধারণ পেট্রলিয়াম ডিজেলের সঙ্গে ৫ থেকে ২০ শতাংশ মিশিয়ে অনায়াসেই ব্যবহার করা সম্ভব। এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের কাছে সমাদৃত ক্ষুদ্র শৈবাল বা মাইক্রোঅ্যালজিও ভবিষ্যতের জ্বালানি হিসেবে দারুণ সম্ভাবনাময়। আমাদের অসংখ্য জলাশয় ও দীর্ঘ উপকূলরেখা শৈবাল চাষের জন্য প্রাকৃতিক আশীর্বাদস্বরূপ। শৈবাল থেকে বায়োডিজেল উৎপাদনের হার যেকোনো স্থলজ উদ্ভিদের চেয়ে বহুগুণ বেশি এবং এর জন্য কোনো কৃষিজমির প্রয়োজন হয় না। পরিবেশ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এরা অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায়। যৌথ গবেষণার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে এই প্রযুক্তি লাভজনক করা গেলে তা দেশের জ্বালানি খাতের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে।
দেশীয় খনিজসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের দিকেও আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। দেশে বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ীর মতো এলাকায় কয়লার উল্লেখযোগ্য মজুদ রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে কয়লা থেকে গ্যাসিফিকেশন পদ্ধতিতে তরল জ্বালানি (ডিজেল) তৈরি করা সম্ভব। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে ঠিকই, তবে বিপুল পানির ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণের ঝুঁকি এড়াতে আধুনিক কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি সংযুক্ত করা আবশ্যক। একইভাবে, প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তরল জ্বালানি রূপান্তর প্রযুক্তিও আমাদের জন্য একটি বিবেচ্য বিষয় হতে পারে।
ভবিষ্যতের শক্তিব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে ধরা হয় হাইড্রোজেন ও সিন্থেটিক জ্বালানিকে (ই-ফুয়েল)। বাংলাদেশের বিপুল সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণ কার্বনমুক্ত ‘গ্রিন হাইড্রোজেন’ উৎপাদন করা অসম্ভব কিছু নয়। বিদ্যমান ইঞ্জিনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় ই-ফুয়েলের ব্যবহারও বেশ সুবিধাজনক। প্রাথমিক পাইলট প্রকল্প চালু এবং সুনির্দিষ্ট নীতিগত রোডম্যাপ তৈরি করার এখনই উপযুক্ত সময়।
বিকল্প জ্বালানির পাশাপাশি নিজস্ব সম্পদের অনুসন্ধানেও গতি আনতে হবে। স্থলভাগের পুরোনো খনিগুলোর মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে এলেও সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাসের বিপুল সম্ভাবনার অনুসন্ধান এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। সুনীল অর্থনীতির আওতায় গভীর সমুদ্রে দ্রুত খননকাজ চালানো গেলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার একটি টেকসই দেশীয় সমাধান মিলবে। একইসঙ্গে জ্বালানি ব্যবহারের ধরনেও কৌশলগত পরিবর্তন আনা জরুরি। পরিবহন ও কৃষি খাতকে দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তির আওতায় আনতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসার, মহাসড়কে সোলার চার্জিং স্টেশন স্থাপন এবং কৃষিতে সোলার সেচপাম্পের ব্যবহার আরো বাড়াতে হবে। শিল্পের অব্যবহৃত ছাদ ও পতিত জমিতে সোলার প্যানেল বসালে দেশের জ্বালানি সংকট অনেকাংশেই প্রশমিত হবে।
পরনির্ভরশীলতার শৃঙ্খল ভাঙতে দেশীয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এখন সময়ের উপযুক্ত দাবি। জৈব জ্বালানি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি টেকসই শক্তি-মিশ্রণ আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে সুদৃঢ় করবে। সঠিক নীতি, গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশও একটি আত্মনির্ভরশীল ও সবুজ অর্থনীতির মডেল হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা
"






































