রকি উল হাসান

  ১১ জুলাই, ২০২৪

সাক্ষাৎকার

কুবি ট্রেজারার আসাদুজ্জামানের চার বছর

গতকালের পর

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের এইচপিএলসি (এইচপিএলসি) ক্রয়-সংক্রান্ত একটি বিষয় অনেক দিন আলোচনায় ছিল- এ বিষয়ে যদি কিছু বলতেন।

আমি যখন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করি, সময়টা ছিল ২০২০ সালের ৫ জুলাই। দুঃখের বিষয় হলো ২০১৯-২০ অর্থবছরের ইউজিসি কর্তৃক বরাদ্দ করা টাকার মাধ্যমে সাবেক উপাচার্য কোনো ধরনের সায়েন্টিফিক ইনস্ট্রুমেন্ট কিনতে পারেনি। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোডের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেননি। আমি যোগ দেওয়ার পর ২০২০-২১ অর্থবছরের টাকাসহ আগের অর্থবছরের টাকা জমা হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল। বিভাগীয় প্রধানদের মাধ্যমে এই অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় ইনস্ট্রুমেন্ট কেনা হয়েছে। উল্লেখ্য, তখনকার ফার্মাসি ডিপার্টমেন্টের বিভাগীয় প্রধানের অনুরোধে আমি তাকে একটি আধুনিক এইচপিএলসি (High Performance Liquid Chromatography, HPLC) ক্রয় করার পরামর্শ দিই। আমার পরামর্শ গ্রহণ করে তিনি এইচপিএলসি (এইচপিএলসি) ক্রয় করার পদক্ষেপ নেন।

অন্য বিভাগগুলো যেখানে ছোট ছোট ইনস্ট্রুমেন্ট কিনে অর্থ ব্যয় করেছিল, সেখানে ফার্মাসি ডিপার্টমেন্টের সাবেক প্রধান একটি দামি ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যন্ত্র কিনে ডিপার্টমেন্টের গবেষণা ও শ্রেণি শিক্ষার্থীদের নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ করেছেন। ওই সময় সাবেক উপাচার্য আমার ওপরে ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন, কারণ সবাই যখন আমার প্রশংসা করছিল, তিনি তা সহ্য করতে পারেননি। এ কারণে তার সৃষ্ট কতিপয় লোক কীভাবে আমি ফার্মাসি ডিপার্টমেন্টকে এইচপিএলসি ক্রয় করে দিয়েছিলাম, সে বিষয়ে না জেনে না বুঝেই আমার সমালোচনা করছিল। অথচ এই ইনস্ট্রুমেন্ট ফার্মাসি ডিপার্টমেন্টের একটি অত্যন্ত জরুরি যন্ত্র, যা আমরা বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহার করতে দেখি। এ ছাড়া কেমিস্ট্রি, বায়োকেমিস্ট্রি, অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি বিভাগের গবেষণা কাজে যন্ত্রটি বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং সমালোচকরা যা কিছুই বলুক না কেন, আমি একজন গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার হিসেবে সঠিক কাজ করেছি বলে মনে করি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নানা আয়োজনে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে ৯৬ লাখ টাকার জামানাত আপনি ঠিকাদারদের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা করেছেন। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমার মনে হয়, যারা এই অভিযোগ করেছে, সৃষ্টিকর্তা তাদের মানবিক গুণাবলি দিয়ে সৃষ্টি করেননি। না হলে এ ধরনের মিথ্যা কথা বলতে পারতেন না। ৯৬ লাখ টাকা নয়, মাত্র ৯৬ পয়সার জামানাতের কিংবা অন্য কোনো উৎস থেকে ভাগবাটোয়ারা যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে, তাহলে রাষ্ট্র যে ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সেটা আমি মাথা পেতে নেব। কিন্তু কেউ যদি তা না পারেন, তাহলে তাকে চাকরিচ্যুত এবং যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।

সরকারি দপ্তরগুলোয় দেখা যায় অযথাই অর্থের অপচয় করা হয়। আপনি কোষাধ্যক্ষ হিসেবে এমন কিছু কি দেখেছেন? দেখে থাকলে বন্ধ করার চেষ্টা করেছেন?

দেখুন আমি তো কারো ব্যক্তিগত শত্রু হতে পারি না। এখানে এসেছিলাম রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে। যেখানে যেখানে অসামঞ্জস্য দেখেছি কিংবা পেয়েছি তাদের শুধরিয়ে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করেছি মাত্র। যেমন অধ্যাপক আবু তাহের সাহেব আমার শুরুর দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ছিলেন, তখন তাকে আমি তার কৃতকর্মের জন্য বেশ কয়েকবার তার অফিস থেকে বের হতে বলেছিলাম। কারণ আমার কাছে অভিযোগ এসেছিল, তিনি তার কক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি ফোন ব্যবহার করে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করছিলেন। অন্যদিকে তৎকালীন সময়ে তিনি ছিলেন বেপরোয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়া ভিসি। তার আক্রোশের শিকার অনেক শিক্ষকের প্রমোশন কিংবা আপগ্রেডেশনে বাধা দেওয়ার বিরোধিতা করায় তিনি অসন্তুষ্ট হতে পারেন। অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান ড. জুলহাস মিয়া আমার দায়িত্বের দ্বিতীয় বর্ষ চলাকালে ২৫ লাখ টাকা দামের একটি সায়েন্টিফিক ইনস্ট্রুমেন্ট ক্রয় করেছিলেন। পরের অর্থবছরেই একই ইনস্ট্রুমেন্ট ক্রয় করার চাহিদা আমার দৃষ্টিগোচর হলে আমি বন্ধ করে দিই এবং জানতে চাই পূর্বের যন্ত্রটি কোথায় কী অবস্থায় রয়েছে, তিনি তার কোনো সদুত্তর দেননি। কোনো এক দিন ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এফ এম আবদুল মঈন স্যারের সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে সারপ্রাইজ ভিজিটে যাই। তখন আমি জানতে চাইলে দেখতে পাই যন্ত্রটি নষ্ট এবং একটি স্টিল আলমারিতে রক্ষিত আছে। যন্ত্রটির এমন অবস্থা কেন জানতে চাইলে তিনি তার সঠিক উত্তর দিতে পারেননি এবং কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সহায়তা নেননি, এর কোনো জবাব দেননি। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে ক্রয়কৃত যন্ত্র এক বছরের মধ্যেই নষ্ট হওয়া এবং কেন তার ট্রাবল শুটিং করা হলো না, এটা আজও আমার বোধগম্য নয়। এ ধরনের কাজগুলো সুস্পষ্টভাবে মনিটরিং করার কারণে তাদের অনেকেই আমার প্রতি বিরক্ত। কিন্তু আমি যে দায়িত্বে এসেছি, তার তো কোনো অবহেলা করা যাবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটির সদস্য সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী ওমর সিদ্দিকী ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান সম্পর্কে বলেন, ‘কোষাধ্যক্ষ স্যার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অর্থ দপ্তরকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে এনেছেন। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বলিয়ান হয়ে সৎ, নিষ্ঠা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে অনুকরণীয় একটি সুষ্ঠু আর্থিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করেছেন। অর্থ কমিটির একজন সদস্য হিসেবে আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, স্যার সব সিদ্ধান্ত অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের কথা

ভেবেই নিতেন। কোষাধ্যক্ষ স্যার এত স্ট্রেসফুল একটি পজিশনা থেকেও কতটুকু সৃজনশীল এবং মেধাবী হলে প্রতি বছর উন্নতমানের জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। আমি বিশ্বাস করি, স্যার যেখানেই থাকুক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠা এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন।’

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামানের বিদায়ের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈন বলেন,

‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর থেকে ওনাকে দেখছি। একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ। কোনো কাজ অযথা আটকে

রাখেন না। তার বিচক্ষণতায় প্রশাসনিক নানা বিষয় খুব সহজেই করতে পেরেছি। তার মঙ্গল ও উত্তরোত্তর সাফল্য

কামনা করি।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close