মো. সাখাওয়াত হোসেন

  ০৯ জুলাই, ২০২৪

মতামত

শেখ হাসিনার ভারত ও চীন সফর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর (২১-২২ জুন ২০২৪) বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। বিজেপির তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনের পর এটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় সফর হলেও এটি ছিল দুই দেশের মধ্যকার প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর। ভারতও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রথম বিদেশি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি সরকারের শাসনামলে আমন্ত্রণ জানিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের একটি নতুন বার্তা প্রদান করেছেন। বিশেষ করে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যস্থতায় তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সম্পর্কের গভীরতা আরো দৃঢ় হবে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তিস্তার বিষয়ে তার আপত্তির কথা তুলে ধরেছেন। তথাপি বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশা করছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তিস্তার বিষয়ে যৌক্তিক সমাধান নিশ্চিত করবে।

প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ককে আরো সুসংহত করতে সাতটি নতুন, তিনটি নবায়নকৃতসহ ১০টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। ‘ডিজিটাল অংশীদারত্ব’ এবং ‘টেকসই ভবিষ্যতের জন্য সবুজ অংশীদারত্ব’বিষয়ক দুটি সমন্বিত রূপকল্পকে সামনে রেখে ভারত ও বাংলাদেশ কাজ করবে। এই লক্ষ্যে দুই যৌথ কার্যক্রমের নথি সই করেছে বাংলাদেশ। এ দুটি হলো- বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল অংশীদারত্বের বিষয়ে অভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা এবং টেকসই ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশ-ভারত সবুজ অংশীদারত্বের বিষয়ে অভিন্ন লক্ষ্যমাত্রাবিষয়ক নথি। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ক্রমাগত ও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী চলমান অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে আরো গভীরভাবে কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশ। সফরকালে ভারতের নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল

নবনির্বাচিত দুটি সরকার কীভাবে সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে, সে বিষয়ে একটি রূপকল্প প্রণয়ন করা।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের ফলাফল হিসেবে দুই দেশের মধ্যকার বিভিন্ন সমঝোতা ও ঘোষণার কথা উল্লেখ করা হয়। উল্লিখিত বিষয়সমূহ হচ্ছে : বাংলাদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য ই-ভিসা, রংপুরে ভারতের নতুন সহকারী হাইকমিশন স্থাপন, রাজশাহী এবং কলকাতার মধ্যে নতুন ট্রেন পরিষেবা চালু করা, চট্টগ্রাম এবং কলকাতার মধ্যে নতুন বাস পরিষেবা চালু করা, গেদে-দর্শনা এবং হলদিবাড়ি-চিলাহাটির হয়ে ডালগাঁও পর্যন্ত মালবাহী রেল পরিষেবা চালু; অনুদান সহায়তায় সিরাজগঞ্জে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) নির্মাণ।

এ ছাড়া ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে নেপাল থেকে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির সূচনা, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন নিয়ে আলোচনার জন্য দুই দেশের যৌথ কারিগরি কমিটি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তা নদী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশে ভারতীয় কারিগরি প্রতিনিধিদলের সফর, বাংলাদেশ পুলিশের অফিসারদের জন্য ৩৫০টি প্রশিক্ষণ স্লট, ইন্দো-প্যাসিফিক ওশানস ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশের যোগদান, ইউপিআই চালু করার জন্য এনপিসিআই ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি।

এরই মধ্যে চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে (৮-১১ জুলাই ২০২৪) প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগেই চীনের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ভারতের সঙ্গে তিস্তা প্রকল্পে কাজ করতে রাজি চীন। তিনি আরো আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন; প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে, উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয় জোরদার হবে, বাংলাদেশের রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করা আরো সার্থক ও অর্থবহ হবে। ডিজিটাল ইকোনমি, ক্লিন এনার্জি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়বে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে রপ্তানি বৃদ্ধি, ওষুধ, সিরামিক, চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্র প্রসার, চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অবকাঠামো নির্মাণ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। বাংলাদেশ ও চীনের মাঝে বাণিজ্য-ঘাটতি নিয়েও জোরালো আলোচনা হবে। সফরে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিমণ্ডলের নানা ঘটনাপ্রবাহের কারণে ভূরাজনৈতিকভাবে এই দ্বিপক্ষীয় সফরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনীতি ও উন্নয়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সম্পর্ক গভীরতর করার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনান, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও ব্রিকসে যুক্ত হতে সহযোগিতা চেয়েছে ঢাকা। ব্রিকস হলো উদীয়মান অর্থনীতির পাঁচটি দেশ- ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং সাউথ আফ্রিকার প্রথম অক্ষরের সমন্বয়ে নামকরণ করা একটি জোট। মূলত উন্নয়নশীল অথবা সদ্য শিল্পোন্নত এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশ ঊর্ধ্বমুখী। সেই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির ওপর তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তাই এই জোটকে বেশ প্রভাবশালী বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। ব্রিকস জোটের সদস্য হতে পারলে বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্ত হবে। ব্রিকস জোটের সদস্য হওয়ার পর বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশ ঋণ নেওয়ার

সুবিধা পাবে। এ ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হারও কম হবে। ফলে আগামী দিনের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বাংলাদেশ দৃঢ় অবস্থানে থাকবে।

ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এমনকি আওয়ামী রাজনীতির ঘোর বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রীকে ভারতপন্থি হিসেবে বললেও বর্তমানে সে অবস্থান থেকে ফিরে এসেছে সমালোচনাকারীরা। কেননা তিনি চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক দক্ষতায় সম্পর্ক সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং চীনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনিয়োগ করছে বাংলাদেশে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা শেখ হাসিনার ভারত ও চীন সফরকে রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় অনন্য মাত্রা প্রদান করেছে। কেননা আঞ্চলিক রাজনীতিতে উভয় দেশের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব সীমাহীন। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বাংলাদেশ প্রভাব বিস্তারকারী। সে কারণেই উভয় পক্ষই বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও সবার সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ককে মজবুত ও জোরালো করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফরমে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বাংলাদেশ নেতৃত্ব প্রদান করছে।

সাম্প্রতিক এ সফরের পরবর্তী সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্বন্ধে অগ্রগতি জানা যাবে। কেননা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দুই দেশকেই ভূমিকা রাখতে হবে। চীন ও ভারত যদি সমন্বিতভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে কাজ করে, তাহলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অচিরেই ত্বরান্বিত হবে। কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ইতিবাচকতা নির্ধারণ করতে পারলেই সম্পর্কগুলো স্থায়িত্বশীল হয়। বিশ্বায়ন ও আধুনিকায়নের যুগে পারস্পরিক স্বার্থ ও সহযোগিতা নিরূপণে পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োগ করতে হয় এবং সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশ অগ্রসরমান। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যের কারণেই বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র ইকোনমিক জোনগুলোয় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশা রাখে প্রধানমন্ত্রীর চীন ও ভারত সফর আগের যেকোনো সফরের তুলনায় সফল ও প্রায়োগিক হয়ে উঠবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close