ড. আফরোজা পারভীন

  ২৫ জুন, ২০২৪

দৃষ্টিপাত

সরিষায় ভূত

প্রিন্স মামুন-লায়লা এদের নাম আমি কখনো শুনিনি। দেখার তো প্রশ্নই ওঠে না। হঠাৎ করেই জানলাম, এরা নাকি টিকটক সেলিব্রিটি, হাজার হাজার ফলোয়ার এদের। জানলাম লায়লা ধর্ষণের মামলা করার পর, ওদের নিয়ে তোলপাড় শুরু হওয়ায়। ভাবছি কোন দুনিয়ায় পড়ে আছি আমি! কোনো কিছুরই খবর রাখি না! টিকটক জিনিসটা কী আজও ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারিনি! আরও সব অদ্ভুত অদ্ভুত নাম আছে, বোঝা তো দূর, বোঝার চেষ্টাও করি না।

কৌতূহলী হয়ে লায়লাকে দেখলাম, পড়লাম। ৪৮ বছরের একজন রমণী। ওর পাশে মামুন তো রীতিমতো শিশু। ছোট ভাই হলে মানায়। কী করে ওদের প্রেম হয়, একসঙ্গে থাকা হয়, ধর্ষণ হয় আবার মামলাও, হয় বুঝি না! ওরা তো একসঙ্গেই লায়লার বাড়িতে ছিল দুজন চেয়েছিল বলে, তাও আবার মামুনের বাবা-মায়ের সম্মতিতে। এক বিছানায় ঘুমাত। প্রেমে দুজনই ছিল ভরপুর। তাহলে ধর্ষণ হলো কীভাবে? দু-চারটে ভিডিও যা দেখলাম তাতে তো লায়লাকেই অতি উৎসাহী মনে হলো, গায়ে গা লাগিয়ে বসা, খুনসুটি, কথায় কথায় গিফট দেওয়া- এসব তো সে-ই করেছে। লায়লার কী বাবা-মা নেই বা অন্য কোনো আত্মীয়? তার কি বিয়ে হয়নি? যদি থেকে থাকেন তারা কীভাবে একবাড়িতে থেকে এই অবাধ মেলামেশা মেনে নিলেন? লায়লার কথাবার্তায় যা বুঝলাম মামুনের পরিবার নিডি এবং লোভি, তাই তারা মেনেছেন কিন্তু লায়লার পরিবার!

আমরা পশ্চিমাদের দোষারোপ করি, তাদের লিভিং, ডেট নিয়ে কটূক্তি করি, হাসি, ঘৃণার চোখে দেখি। কিন্তু তাদের সমাজে বয়ফ্রেন্ড, লিভ ইন লিগাল। একসঙ্গে তারা বাসাভাড়া নিয়ে থাকতে পারে। কোনো সমস্যা নেই। তাদের কাগজপত্রে রিলেশনশিপ, লিভ ইন, বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ডদের জন্য আলাদা কলাম আছে। আমাদের দেশের বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রীর জন্য যেমন থাকে, তেমন। তাদের সমাজ এটা মেনে নিয়েছে। তাদের সন্তানদেরও সমাজ মেনেছে। এমনকি দত্তক পুত্র-কন্যা ওদের সমাজে স্বীকৃত। গর্ভজাতের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পায় তারা। কিন্তু আমাদের সমাজ তো বিয়ের আগে একসঙ্গে থাকা সমর্থন করে না। তাহলে লায়রা কেন থাকলেন? তিনি তো শিশু নন? কেন বিয়ে করে নিলেন না? বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিল আর তিনি থাকতে শুরু করলেন- এ কেমন কথা। এখন মামলা করে ৯০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ চাইছেন। দিতে না পারলে আবার সেই ধর্ষণকারীকেই ফিরিয়ে নিতে চাইছেন। বিয়ে করার কথা কিন্তু বলছেন না! অদ্ভুত! যে ধর্ষক তাকে কেন তিনি আবার ফিরে চাইবেন। সরিষায় যে ভূত আছে, লায়লার ভেতরে যে গলদ আছে, তা সহজেই বোঝা যায়।

ভারতে অহরহ লিভ ইনের ঘটনা ঘটছে। আমরা চিত্রতারকাদের বেলায় প্রায়ই শুনতে পাই, অমুক অমুকের সঙ্গে লিভ ইনে আছে। কেউ কেউ বহুদিন লিভ ইনে থেকে বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছেন আবার অনেকে দীর্ঘদিন লিভ ইনে থেকে বিয়েও করছেন। তারা অকপটে সে কথা বলছেনও, কোনো রাখঢাক নেই। চিত্রতারকা বা শিল্পীদের খবর আমরা পাই, তাই জানি। অন্যদের ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই এসব ঘটছে এবং ঘটছে তাদের পরিবারের সম্মতিতেই। সেই ঢেউ কি এসে লেগেছে বাংলাদেশে! কিন্তু ভুললে তো চলবে না, এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম। তারা চলে ইসলামি বিধান মেনে।

দেশে এসব কী হচ্ছে বুঝি না। কিছুদিন আগে মুশতাক-তিশাকে নিয়ে দেশ তোলপাড় হলো। তিশার বাবা মামলা করলেন। এখনো এই ইস্যু শেষ হয়ে যায়নি। তিশা বিয়ে করলেন বাবার চেয়ে বেশি বয়সি মুশতাককে। পশ্চিমে একে ‘সুগার ড্যাডি’ বলে। পয়সা বা প্রতিষ্ঠার লোভে এমন বিয়ে করে কিছুসংখ্যক মেয়ে। মুশতাক-তিশার দৌলতে শব্দটা এখন আমাদের দেশেও অনেক পরিচিত। তবে তিশা বলেছেন, তিনি সুগার ড্যাডি বানানোর জন্য বিয়ে করেননি, বিয়ে করেছেন ভালোবেসে। এ কেমন ভালোবাসা! স্কুলের গভর্নিং কমিটির একজন সদস্য সেই স্কুলের মেয়ের চেয়ে কম বয়সি ছাত্রীকে বিয়ে করেন কীভাবে। এটা তো নৈতিকতাবিরোধী।

মুশতাক তিশার সঙ্গে সমতালে তখন চলেছে ড. সাবরিনা ইস্যু। সাবরিনা পাস করা ডাক্তার। কোভিডকালীন কোভিডের জাল রিপোর্ট প্রদান ইস্যুতে জেল খেটেছেন তিনি। জেল থেকে ছাড়া পেয়েই লিখেছেন ‘বন্দিনী’। তিনি বলেছেন, বন্দিনীতে লিখেছেন জেলবন্দিনীদের কথা। বই-এর জন্য তিনি প্রতিদিন বইমেলায় গেছেন, অটোগ্রাফ দিয়েছেন, হেসেছেন, কেঁদেছেন, দেদার ছবি তুলেছেন। তাকে দূর দূর করে তাড়ানো হয়েছে যেমন, তেমনই তাকে নিয়ে সেলফি তোলার হিড়িক পড়েছে। মেলা শেষ হয়েছে। সাবরিনা এখন কখনো মডেল সাজছেন, কখনো পার্লারে যাচ্ছেন, র‌্যাম্পে হাঁটছেন, ল পড়ছেন আরো কত কিছু। একইভাবে মুশতাকও একখানা বই লিখেছেন, মুশতাক অ্যান্ড তিশা। এ যেন এক অমর প্রেম কাহিনি ভাবখানা এমন। সে বইয়ের জন্য তারাও মেলায় গেছেন। ধাওয়া খেয়েছেন। থামেননি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমনভাবে ক্রিয়াকর্ম চালিয়েছেন যেন কত মহৎ কাজ তারা করেছেন। এমনভাবে নিজেদের উপস্থাপন করেছেন, যাতে অন্যরা তাদের দেখে উৎসাহিত হয়। এমনকি মুশতাক তো বটেই তিশাও তার বাবা-মার বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই বলেছেন। গর্ভজাত সন্তান কী করে বাবা-মাকে এভাবে অপমান করতে পারে, মাথায় আসে না!

এই ইস্যু থামতে না থামতেই শুরু হয় ভুয়া ডাক্তার মুনিয়া ইস্যু। সে এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা। মুনিয়া খান নামে একজন ভুয়া ডাক্তারকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াসহ সারা দেশ তোলপাড় হয়। সোশ্যাল ছেড়ে তখন মুনিয়ার জায়গা হয় খবরের কাগজে, টেলিভিশনের পর্দায়। হটকেকের মতো বিকোয় তার ভিডিও। একের পর এক সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় আর তিনিও দিয়ে চলেন অবিরাম।

বিষয়টা সত্যিই অদ্ভুত! ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত হয়ে তিনি জেলে ছিলেন। জেল থেকে জামিনে ছাড়া পেয়েই তিনি নিজেকে খাঁটি দাবি করেন জোরেশোরে! বারবার টেলিভিশনে যান, সাক্ষাৎকার দেন! তাকে ভুয়া বলায় টেলিভিশনকে হুমকিও দেন! তিনি দিনের পর দিন মেডিকেলে বসে চিকিৎসা দিয়েছেন অথচ ধরা পড়েননি। তার কথার মধ্যে বিস্তর অসংগতি ছিল। একবার বলেছেন পাস করেছেন, একবার বলেছেন ইন্টার্ন করছেন আবার বলেছেন থার্ড ইয়ারে পড়ছেন। ওটি মানে কী, আইসিইউর ফুল মিনিং কি, এমবিবিএসের অ্যাবরিভিয়েশন কী তিনি জানেন না অথচ তিনি ঢাকা মেডিকেলে অবস্থান করছিলেন। আইসিইউতে গিয়ে টিকটক করছিলেন। ভাবা যায়! আইসিইউ কী টিকটক করার জায়গা। যেখানে ক্রিটিক্যাল রোগীরা থাকে, রোগীর আপনজনদের পর্যন্ত ঢুকতে দেওয়া হয় না। দুঃখজনক হলেও সত্য, শেষ পর্যন্ত মুনিয়ার ব্যাপারটা কী হলো আমরা জানতে পারিনি। অনেক অনেক ঘটনার মতো এটাও হয়তো অমীমাংসিত থেকে গেল।

শুরু করেছিলাম প্রিন্স মামুন আর লায়লাকে নিয়ে। আমাদের দেশের আইন নারীর পক্ষে। এ দেশে নারীরা সুবিচার পান না, বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হন, তাই নারীবান্ধব আইনকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই আইনের সুবিধা নিয়ে অনেক ধান্ধাবাজ নারী নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করে নেন। হ্যাঁ, এটা ঠিক, বিবাহিত নারীও ধর্ষণ হয়, প্রচুর হয় এ ধরনের ঘটনা। বিয়ের তকমা কপালে আঁটা থাকে বলে তারা কিছু বলতে পারেন না। কিন্তু লায়লার ব্যাপারটা আলাদা। তিনি বিয়ে না করে নিজ ইচ্ছায় একসঙ্গে থেকেছে দিনের পর দিন, দুজন মিলে টিকটক করেছেন, তাদের সম্পর্কের কথা টিকটকপ্রেমীরা জানেন। তারপর তিনি মামলা করলেন আবার ক্ষতিপূরণ দিতে না পারলে ধর্ষককেই চাইছেন। এখানটাতেই আমার আপত্তি। ধর্ষককে কী কেউ কখনো ফিরে পেতে চান। তাকে পুনর্বার ধর্ষণ করার সুযোগ দেবেন কেউ? লায়লা কেন চাইছেন। তাহলে আমরা ভেবে নিতে পারি, তিনি ধর্ষিত হননি। মামুনকে জব্দ করার জন্যই মামলাটি করেছেন।

আর মামুনেরই বা এত লোভ কেন। কেন তার অন্যের বাড়ি চাই, গাড়ি চাই, টাকা চাই, পয়সা চাই। নিজেই তো টিকটক করে ভালো কামাই-রোজগার করছিলেন। লায়লার সঙ্গে গাটছড়া বাঁধার কী প্রয়োজন পড়ল তার। এত লোভ ভালো নয়। কথায় আছে লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। মামুনের বয়স কম, এখনো তার শুধরানোর সময় আছে।

এসব অনাচার আমরা চাই না। আমরা দুর্নীতিপরায়ণ বা ভুয়া ডাক্তার, ইঁচড়ে পাকা মেধাবী ছাত্রী, অনৈতিক গভর্নিং বডির মেম্বার, লোভী এবং জালিয়াত মানুষ চাই না। আমরা এখনো দেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখি। আশা করি দেশ হবে সোনার দেশ। এই জাতীয় কিছু মানুষ আমাদের স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করে। কিন্তু এরা এক দিনে এমনটা হয়ে ওঠে না। এদের এ পর্যায়ে যাওয়ার পেছনে অনেকের মদদ থাকে, পৃষ্ঠপোষকতা থাকে। কিন্তু অসুবিধা হচ্ছে, এরা যখন ধরা পড়ে তখন বামাল সমেত পড়ে না। তাই মদদদাতাদের একটা অংশের পরিচয় অজ্ঞাতই থেকে যায়।

সবশেষে বলব, ঢাকা মেডিকেলসহ সব চিকিৎসাকেন্দ্রে নজরদারি বৃদ্ধি করুন। মেডিকেলের আইসিইউতে টিকটক হয় কী করে? বিষয়টা কী অবিশ্বাস্য না? আইসিইউ কী বিনোদনের জায়গা? কিছুদিন আগে শুনেছিলাম, পিজিতে পরকীয়ার জেরে মারামারি হয়েছে। এসব কী হচ্ছে আমাদের হাসপাতালগুলোয়? টিকটকে কি যা ইচ্ছে তাই পোস্ট করা যায়? কোনো নিয়ন্ত্রণ কি নেই? তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞজন ভেবে দেখতে পারেন। সামাজিক অনুশাসন জোরদার করা দরকার। দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো। প্রয়োজনে শুদ্ধি অভিযান করুন। বিষয়গুলো অতি জরুরি।

লেখক : কথাশিল্পী, গবেষক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close