মাছুম বিল্লাহ

  ২৫ জুন, ২০২৪

মতামত

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো প্রসঙ্গে

শিক্ষার জাতীয় দৈনিক ‘আমাদের বার্তা’ একটি প্রতিবেদন ছেপেছে কিছুদিন আগে। যেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বেসরকারি কলেজগুলো দ্বৈত শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে শিক্ষার মান, শিক্ষা প্রশাসনে জটিলতা এবং এসব কলেজে শিক্ষাদানরত শিক্ষকদের করুণদশার কথা তুলে ধরেছে। যুগ যুগ ধরে এসব কলেজে চলছে দ্বৈতশাসন। একটি হলো নিয়ন্ত্রণকারী ও বেতন-ভাতা দেওয়ার ক্ষমতার অধিকারী শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তর। অন্যদিকে রয়েছে শুধু তালিকা প্রকাশ আর নিয়োগ বোর্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি দেওয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। যুগ যুগ ধরে তারা এমপিওবিহীন, আদালতের বারান্দায় তাদের দৌড়াদৌড়ি ইত্যাদি চলছে আর মাঝখানে শিক্ষার মান নিম্নমুখী হচ্ছে। কিছুদিন আগে আমরা আর একটি প্রতিবেদন দেখেছিলাম, সেটি ছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে। সেখানে দেখানো হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ৪৮ শতাংশ বেকার থেকে যাচ্ছে। এ জন্য কি শুধুই শিক্ষার্থীরা কিংবা শুধুই শিক্ষকরা দায়ী? এ প্রশ্ন সহজেই চলে আসে কিন্তু এর ভেতরকার কারণগুলো আমরা খুঁজে দেখি না। আমাদের বার্তা সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটিই করেছে।

ডিগ্রি, অনার্স ও মাস্টার্স স্তরের বেসরকারি কলেজগুলো পরিচালনার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের চাকরির শর্তাবলি রেগুলেশন মানতে হয়। আবার এসব কলেজে নিয়োগ ও পরিচালনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবলকাঠামো এবং এমপিও নীতিমালা রয়েছে, যা মেনে চলার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। গত ১১ জানুয়ারি অধ্যক্ষ নিয়োগের নতুন একটি সার্কুলার জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়েছে, বেসরকারি কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগের কমিটিতে জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি থাকবেন। পাঁচ সদস্যের এই নিয়োগ কমিটিতে শিক্ষা বোর্ড ও মাউশির একজন করে প্রতিনিধিও থাকতে হবে। নিয়োগ পরীক্ষায় প্রতি পদের বিপরীতে কমপক্ষে তিনজন প্রার্থী থাকতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী বেসরকারি কলেজগুলোয় অনার্স কোর্স পরিচালনার জন্য প্রতিটি বিভাগে সাতজন শিক্ষক থাকতে হবে এবং মাস্টার্স কোর্সে অতিরিক্ত আরো পাঁচজন শিক্ষক অর্থাৎ ১২ শিক্ষকের প্রয়োজন হবে। প্রতিটি বিভাগে একজন অধ্যাপক, দুজন সহযোগী অধ্যাপক, চারজন সহকারী অধ্যাপক ও পাঁচজন প্রভাষকসহ ১২ জন থাকায় বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় অনার্স কলেজে প্রতি বিষয়ে শূন্যপদে মাত্র তিনজন শিক্ষক নিয়োগের বিধান আছে। অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। কোনো কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুসরণ করে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগ দিলে তা গ্রহণ করছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মেনে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে বেতন-ভাতা দেওয়া হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে তা অবৈধ। তার মানে হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেয় এমপিওসহ অন্যান্য ভাতাপ্রাপ্তি থেকে। মন্ত্রণালয় যেহেতু এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ডিল করে, তাদের দেওয়া নিয়ম না মানলে সেই কলেজ ও শিক্ষকদের দুর্দশা ভোগ করতে হচ্ছে। অথচ একটি বিষয়ে তিনজন শিক্ষক দিয়ে অনার্স পড়ানো সম্ভব নয়, যে কথা মন্ত্রণালয়ের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা না।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী চাকরিতে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সহকারী অধ্যাপক অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ পদে আবেদন করতে পারবেন। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিমালা অনুযায়ী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত হিসেবে তিন বছরের অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ পদের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উপাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত হিসেবে উচ্চমাধ্যমিক কলেজের অধ্যক্ষ/ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ/এমপিওতে তিন বছরের সহকারী অধ্যাপক পদে এবং ১২ বছরের শিক্ষকতা অভিজ্ঞতা থাকার বিধান রয়েছে। ফলে নিয়োগ নিয়ে জটিলতা লেগেই আছে। আবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী কলেজে শিক্ষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নিয়োগ নির্বাচনী বোর্ড গঠন করে গভর্নিং বডির মাধ্যমে সরাসারি শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। অথচ ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবরের পর থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে গভর্নিং বডির ক্ষমতা রহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনার্স মাস্টার্স কলেজে অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন হলে কীভাবে নিয়োগ দেওয়া হবে, তার বর্ণনা নেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধিমালায়। কলেজে ডিগ্রি পাস কোর্স অনুমতি নিতে গিয়ে তিনজন করে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বেসরকারি ডিগ্রি কলেজগুলো। আর এতেই ঘটে বিপত্তি। দুজন শিক্ষক এমপিওভুক্ত হলেও তৃতীয়জন দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত হতে পারছিলেন না। উচ্চ আদালতে গিয়ে বিষয়টির সমাধান করতে হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি (পাস) কলেজের এই জনবল কাঠামোকে সমন্বয়হীনতার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে দেশের অনার্স মাস্টার্স কোর্সের ৩৫০টি বেসরকারি কলেজের শিক্ষকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘ ২৮ বছরেও জনবল কাঠামো তৈরি না করায় শুধু অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সের শিক্ষক-কর্মচারীরা এমপিও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের জনবল কাঠামো অনুযায়ী অনার্স মাস্টার্স স্তরে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়নি। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবিধানে এই সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগে আট শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনার্স মাস্টার্স কোর্স চালু করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো বেগবান, গতিশীল, মানসম্পন্ন ও যুগের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়ার জন্য দেশের সব বেসরকারি ডিগ্রি, অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের কলেজগুলো সরাসরি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সম্পূর্ণভাবে ন্যস্ত করা প্রয়োজন। তারা শুধু সার্টিফিকেট দেওয়া আর নিয়োগ বোর্ডে প্রতিনিধি পাঠানোর প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকবে, সেটি হলে এর মান বৃদ্ধি কিংবা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাই বেসরকারি কলেজগুলোর সব ধরনের নিয়োগ, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদান, পদোন্নতি ও শিক্ষার মান বৃদ্ধির যাবতীয় কাজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা প্রয়োজন এবং জাতীয় বাজেটে সেই ধরনের বরাদ্দ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়ার দরকার। মাউশিকে শুধু উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত দায়িত্ব ন্যস্ত করা প্রয়োজন। অযথা মাথাভারী প্রশাসন এবং তথাকথিত উচ্চশিক্ষা মাউশির অধীনে থাকায় কোনোভাবে এর মানও বাড়ছে না আর মাউশিতে কাজের গতি আসছে না। এত বিশাল বহরের কলেজগুলোর সার্বিক দায়িত্ব এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বৈত দায়িত্ব পালন করার ফলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একটি অকার্যকর কিংবা মানহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে মাউশি হাজার হাজার সরকারি-বেসরকারি স্কুল ও কলেজ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজও দ্রুত এবং চাহিদামাফিক সম্পন্ন করা হয়ে উঠছে না। সরকারি যেসব কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স পড়ানো হয়, সেগুলো স্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা প্রয়োজন। আমাদের নতুন শিক্ষামন্ত্রী এ ধরনের একটি ঘোষণা দিয়েছেন এবং ইতিমধ্যে সম্ভবত কাজও শুরু হয়ে গেছে। এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে কলেজগুলোর স্ট্যাটাস যেমন বাড়বে, তেমনি শিক্ষার মানেরও উন্নতি ঘটবে। এসব কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্লাস নিতে পারবেন এবং ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকরা মন্ত্রণালয় থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এই কলেজগুলোয় ডেপুটেশনে যাবেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিয়ন্ত্রণ করবেন। তাতে, তারা একটু জবাবদিহির মধ্যে থাকবেন, ফলে পড়াশোনাসহ সার্বিক ক্ষেত্রে অনেকটাই পরিবর্তন ঘটবে।

সর্বশেষ বেসরকারি কলেজ পরিচালনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক দুটি বিধিমালায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। একটি অন্যটির সঙ্গে সাংঘর্ষিকও। ফলে দুই বিধিমালার আলোকে কলেজ পরিচালনা করতে গিয়ে নানামুখী ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষকরা। আমাদের শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে এবং শিক্ষা প্রশাসনকে অধিকতর কার্যকর ও স্মার্ট করার নিমিত্তে উপরোক্ত বিষয়গুলোয় দৃষ্টি দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। উপরোক্ত বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত শুধু মন্ত্রণালয় কিংবা শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিতে পারবে না। এ জন্য প্রয়োজন হবে আমাদের জাতীয় সংসদে বিষয়গুলো উত্থাপন করা। জাতীয় স্বার্থে সেটি আমাদের শিগগিরই করা উচিত।

লেখক : শিক্ষাবিশেষজ্ঞ ও গবেষক

সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর-ভাব বাংলাদেশ

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close