ড. মো. মোরশেদুল আলম

  ২৪ জুন, ২০২৪

বিশ্লেষণ

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও বাংলাদেশের প্রভাব

ভূমণ্ডলীয় উষ্ণতা বৃদ্ধি বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রক্রিয়া হলো জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বিশেষ প্রপঞ্চ। ইউএনএফসিসিসি ও আইপিসিসির মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মানুষের কারণে সৃষ্ট। বিশ্ব উষ্ণায়ন হলো জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বিশেষ ঘটনা। জীবাশ্ম জ্বালানি বা অন্যান্য কারণে বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাইঅক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং গ্যাসগুলো বায়ুমণ্ডলে তাপ ধরে রাখে। এতে করে দিন দিন পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে; যাকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বলা হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বন উজাড়, শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, পারমাণবিক বিস্ফোরণ, শিল্পবর্জ্যরে অব্যবস্থাপনা, এল নিনোর প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সমুদ্রে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিক্ষেপণ, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত প্রভৃতি বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য দায়ী। বায়ুমণ্ডলের তাপ বৃদ্ধির কারণে জলবায়ুগত যে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে, তার প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল ভয়াবহ। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রধান ও সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব হলো মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়া এবং এতে করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বিশ্ব আজ হুমকির মুখে। বিশেষ করে অনুন্নত ও সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশগুলো সবচেয়ে বেশি হুমকির শিকার। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব দ্রুত বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান গ্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপন্ন কার্বন-ডাইঅক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড। গ্যাসগুলো তাপ ধারণ করার মধ্য দিয়ে উষ্ণতা বাড়ায়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে ০.৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কার্বনের পরিমাণ এখনকার মাত্রায় স্থির রাখলেও আগামী ৩০ বছর পর্যন্ত তাপ বাড়তেই থাকবে। বর্তমানে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাইঅক্সাইডের মাত্রা বিগত ৬ লাখ ৫০ হাজার বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। আইপিসিসি সতর্ক করেছে, যদি নির্গমন কমানো না যায়, তাহলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০ সেন্টিমিটার থেকে ১ মিটার পর্যন্ত বাড়বে। জরুরি পদক্ষেপ না নিলে পৃথিবীর সব থেকে ঘনবসতিপূর্ণ প্রধান শহরগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাবে।

আইপিসিসি বহু বছর আগেই সতকর্তা জারি করেছিল, কার্বন-ডাই অক্সাইডের মাত্রা যদি শিল্পায়নপূর্ব সময়ের দ্বিগুণে স্থির করা না যায়, তাহলে ২১০০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা ৫.৮০ সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে হলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ২০ সেলসিয়াসের নিচে রাখতে হবে। এজন্য মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা ২০৫০ সালের মধ্যে বর্তমানের তুলনায় কমপক্ষে ৬০-৮০ ভাগ কমিয়ে আনতে হবে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, পৃথিবীর উষ্ণতম বছরের রেকর্ড ভাঙতে পারে ২০২৪ সাল। আবহাওয়া-সংক্রান্ত বার্ষিক রিপোর্টে সবচেয়ে উষ্ণ দশক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২০১৪ থেকে ২০২৩-এর সময়সীমাকে। ২০২৩ সাল উষ্ণায়নের পুরোনো সব রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেছে। ৮ জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ মার্ভিস জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি ছিল পৃথিবীর উষ্ণতম মাস। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞানী বলেছেন, গত বছরের তুলনায় ২০২৪ সাল আরো বেশি রেকর্ড গরম পড়ার এক-তৃতীয়াংশ আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকায় তীব্র দাবানল, মধ্যপ্রাচ্যে রেকর্ড ভাঙা দাবদাহে বিপর্যস্ত হয়, এশিয়ার দেশগুলোয় ফসলের মাঠ খরায় পুড়ে।

উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী ক্ষতিকর গ্যাস হলো কার্বন-ডাইঅক্সাইড, কার্বন-মনোক্সাইড, সালফার-ডাইঅক্সাইড এবং সালফারের অন্য অক্সাইডগুলো, নাইট্রিক অক্সাইড, মিথেন এবং ক্লোরোফ্লুরোকার্বন প্রভৃতি। আইপিসিসির বিজ্ঞানীরা এবং অন্য বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত যে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনজনিত কারণে ভূমণ্ডলীয় উত্তাপ বেড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ স্ফীত হওয়ার কারণে পৃথিবীর সমুদ্রতীরবর্তী বা পরিবেষ্টিত দেশগুলোর কোনোটি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ সেসব দেশের অন্যতম। জনপ্রতি প্রতি বছর বাংলাদেশের কার্বন-ডাইঅক্সাইড গ্রাস নির্গমনের হার ১২৪ কিলোগ্রাম। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫ টনের মতো এবং পশ্চিম ইউরোপে আড়াই টনের মতো। বাংলাদেশে কার্বন-ডাইঅক্সাইড নির্গমনের হার এখনো পর্যন্ত উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। যে গ্যাসটি গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধিতে সামান্য ভূমিকা রাখছে, সেটি হচ্ছে মিথেন; যার উৎস পশুপালন ও ধান চাষ। সুতরাং প্রতীয়মান হয়, সভ্যতার লগ্ন থেকেই উন্নত দেশগুলো তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রকৃতিতে ব্যাপক নেতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। এতে ভূমণ্ডলীয় তাপবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনসহ ওজোনস্তর ও বিভিন্ন মূল্যবান ইকোসিস্টেম ক্ষয়িত হওয়ার মতো বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

কপ-২৬-এর মূল লক্ষ্য ছিল তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার আশা বাঁচিয়ে রাখা, সেই উদ্দেশ্য সাধিত হলেও এটা কীভাবে পরিপূর্ণ সফলতা পাবে, তা কিন্তু তর্কাতীত নয়। কপ-২৬ সভাপতি আলোক শর্মার মতে, আমরা ১.৫ ডিগ্রির লক্ষ্যমাত্রার আশা বাঁচিয়ে রেখেছি, কিন্তু এর নাড়ি বড়ই দুর্বল। প্যারিস চুক্তির আওতায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ২০২০ সাল থেকে প্রতি বছর জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। কপ-২৬-এর সভাপতি আলোক শর্মা আরো বলেন, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে বিশ্বের ৭০ কোটি মানুষ চরম দাবদাহের শিকার হবে। ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সেই সংখ্যা ২০০ কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে। দ্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর ডিজাস্টার রিডাকশনের সমীক্ষায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে নিম্নে উল্লিখিত প্যারামিটারের ভিত্তিতে বাংলাদেশের নামোল্লেখ করেছে। বন্যার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ প্রথম, সুনামির ঝুঁকিতে তৃতীয় এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে বিশ্বের সব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মানবসৃষ্ট উষ্ণায়ন প্রক্রিয়া স্থান-কালের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক রূপ ধারণ করেছে। গলে যাওয়া পোলার আইস ক্যাপ কানাডার উপকূলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। নব্বইয়ের গোড়া থেকেই গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার আইস শিট দ্রুত পুরুত্ব হারাচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়নজনিত সমুদ্রপৃষ্ঠ স্ফীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি বিচ, লুইজিয়ানা ও টেক্সাস উপকূল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি ইউরোপীয় কমিশনের জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টার ও পিবিএল নেদারল্যান্ডস এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট এজেন্সির এক যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের ৪০ শতাংশের জন্য দায়ী। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাশাপাশি এশিয়া ও ইউরোপের বড় অর্থনীতির দেশগুলোও দায়ী। প্রতিবেদন ২০২১-এ বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে চীন। দেশটি প্রতি বছর ১১ হাজার ২৫৬ মেগাটন কার্বন নিঃসরণ করে। এরপরই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বছরে ৫ হাজার ২৭৫ মেগাটন। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বছরে ৩ হাজার ৪৫৭ মেগাটন কার্বন নিঃসরণ করে। তালিকায় এরপরই ভারত, রাশিয়া ও জাপান রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের ২৮ শতাংশ চীন, ১৪ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র, ১০ শতাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভারত নির্গমন করেছিল। তবে মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বেশি, যা চীনের তুলনায় দ্বিগুণ এবং ভারতের তুলনায় আট গুণ বেশি।

বিশ্বের তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তাহলে দাবানল এক-তৃতীয়াংশের বেশি বেড়ে যেতে পারে। খরার কারণে বিশ্বে ৮০-৮০০ কোটি মানুষ তীব্র পানিসংকটে পতিত হবে। আর পৃথিবীর তাপমাত্রা যদি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তবে এই শতকের শেষ নাগাদ চরম আবহাওয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা ৫ গুণ বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বব্যাপী ২৯ শতাংশ গাছ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হতে পারে। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো গরমের ক্ষেত্রে নিত্য রেকর্ড করে চলেছে। ইতালি, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির মতো। সুইজারল্যান্ডের তাপমাত্রাও বেড়ে চলেছে। জাপানের রাজধানী টোকিওসহ বিভিন্ন এলাকায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৫২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ইরাকের তাপমাত্রাও ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। গ্রিসে দাবানল ছড়িয়েছে। কানাডার বনাঞ্চল জ্বলছে। অস্ট্রেলিয়ায়ও লাখ লাখ একর বন পুড়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারত, পাকিস্তান ও চীন। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে ২২ হাজার ৮০০ কোটি শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে; যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৮ থেকে ৩১ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। আর বাংলাদেশে বছরে ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৪০০ কোটি শ্রমঘণ্টা। মাথাপিছু হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫৪ কর্মঘণ্টা। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বিশ্বব্যাপী জলবায়ুতে কিছু মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। এ উষ্ণতা ঋতু পরিক্রমায় প্রভাব ফেলছে এবং ঋতুবৈচিত্র্যের রূপ বদলে দিচ্ছে। এতে করে বিভিন্ন দুর্যোগ তথা অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খড়া, সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানিতে অতিরিক্ত মাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া ইত্যাদির প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ফসল। বিগত ১০০ বছরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে ১৭-২১ সেন্টিমিটার। আইপিসিসির গবেষণায় দেখা যায়, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে তলিয়ে যাওয়া অঞ্চলের ৩ কোটিরও বেশি মানুষ বাস্তুহীন হবে। সমুদ্র উপকূলের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রতিকূল প্রভাবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান নশ্বর পরিস্থিতির শিকার। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ হচ্ছে সমগ্র বিশ্বের বিপন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্বল অর্থনীতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা বিপন্নতার মাত্রাকে আরো বৃদ্ধি করেছে। জাতিসংঘের এক হিসাব মতে, যদি বৈশ্বিক উষ্ণতা এ গতিতে বাড়তে থাকে, তাহলে সমুদ্র ও নদীর স্তর বৃদ্ধির ফলে কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে অভ্যন্তরীণভাবে স্থানচ্যুত হবে। এর কুপ্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। উষ্ণতার এ হার অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের স্থলভাগের ১০ শতাংশ ভূমি বিলীন হবে। এ ছাড়া ব্যাপক মরুময়তা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জমির উর্বরতা হ্রাস পাবে। ফলে ফসলের উৎপাদনও কমে যাবে। অন্যদিকে অধিক জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপও রয়েছে। সম্পদের সংকট ও জনসংখ্যাধিক্য মিলে এক অপরিহার্য দুর্ভোগ দেখা দেবে।

বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের নিকট ‘রোল মডেল’ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ এখন দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের পরিবর্তে টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতি গ্রহণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনকে প্রাধান্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ডেল্টাপ্ল্যান-২১০০ প্রণয়ন করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন ও সহনশীলতা বিনির্মাণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত কপ-২৮ সম্মেলনে ইনোভেশন ইন ডেভেলপিং ফাইন্যান্স ক্যাটাগরিতে গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে বাংলাদেশ। জলবায়ু সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব হ্রাসের জন্য সব দেশের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। বিগত বছরগুলোয় জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলনে গৃহীত পদক্ষেপ এবং চুক্তিগুলো যথাযথ বাস্তবায়নে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব জোরদার করা প্রয়োজন। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা, বনায়ন কর্মসূচি, পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন, প্রশমন কার্যক্রম বৃদ্ধি করা, টেকসই উন্নয়নসহ পরিকল্পিত নগরায়ণ করা জরুরি।

লেখক : শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close