খন্দকার আপন হোসাইন

  ২২ জুন, ২০২৪

দৃষ্টিপাত

সাময়িক অনুভূতির অপর নাম আত্মতুষ্টি

ঈদুল আজহার আমেজ এখনো রয়ে গেছে। ঈদ মানেই আনন্দ ঈদ মানেই খুশি। ঈদের আনন্দ শুরু হয় ঈদের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকে। সেই আনন্দ ঈদ-পরবর্তী সপ্তাহ জুড়ে লেগে থাকে। সেই আনন্দ কারা ভোগ করে? ঈদ আনন্দ সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় শিশুদের মধ্যে। ধনিক শ্রেণির মাঝে অবশ্য বছর জুড়েই ঈদ আনন্দ বিদ্যমান থাকে। বার্ষিক ঈদ তাদের কাছে উপলক্ষ মাত্র। ঈদ আনন্দ দরিদ্র শ্রেণির মাঝেও বিরাজমান।

প্রায় আড়াইশো বছর আগে টমাস জেফারসনের নেতৃত্বে আমেরিকার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় ‘পারস্যুট অব হ্যাপিনেস’ বা ‘সুখের সাধনা’র অধিকার। ১৭৭৬ সালে নবসৃষ্ট মার্কিন সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে ‘ভালো থাকাটাই’ ছিল সুখের রূপচিত্র। ভালো থাকার অপর নামই হলো আনন্দ। আনন্দ বা আত্মতৃপ্তির ধারণা বদলায়। সুখের ধারণাও বদলায়। বৈষ্ণব পদাবলির অন্যতম পদকর্তা জ্ঞান দাসের দুটি বিখ্যাত চরণ এখনো স্বতঃসিদ্ধ পঠিত। চরণ দুটি হলো ‘সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু অনলে পুড়িয়া গেল/ অমিয় সাগরে সিনান করিতে সকলি গরল ভেল’। সুখ বা আনন্দ চক্রাকারে পরিবর্তিত হয়।

সুখের আরেক নাম আত্মতুষ্টি। আত্মতুষ্টির অন্তর্নিহিত গভীরতা নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বিশিষ্ট গবেষক এলিজাবেথ ডান ২০১৪ সালে একটি বই প্রকাশ করেন। বইটির নাম ‘হ্যাপি মানি’। বইটিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা আছে ‘টাকা যদি আত্মতুষ্টি আনতে না পারে তাহলে বুঝে নিতে হবে ঠিকঠাক টাকা খরচ করা হচ্ছে না’। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৩৮ সাল থেকে অদ্যাবধি ‘আত্মতুষ্টি’ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। সেই গবেষণার অন্যতম একজন গবেষক হচ্ছেন রবার্ট ওয়ালডিংগার। রবার্ট ওয়ালডিংগার তার ‘দ্য গুড লাইফ’ বইয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন ‘সুখী জীবনের মূলমন্ত্র হচ্ছে সুসম্পর্ক’। কবিগুরু মনে করেন, ‘নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস’।

কে কতটা সুখী কিংবা কতটা আনন্দিত তা পরিমাপের যন্ত্র এখনো আবিষ্কার হয়নি। আনন্দ পরিমাপের ধারণা এসেছে হিমালয়ের দেশ ভুটান থেকে। ১৯৭৯ সালে ভুটানের তরুণ রাজা জিগমে সিংহে ওয়াংচুক বম্বে এয়ারপোর্টে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে সুখ পরিমাপক যন্ত্রের ধারণা দেন। ভুটানের সেই তরুণ রাজার মতে, গ্রস ন্যাশনাল প্রোডাক্টের চেয়ে গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বক্তব্য সে সময় বিশ্বব্যাপী আলোচনার প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল। এক নতুন ফিলোসোফির সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন তিনি। ভুটান ২০০৮ সাল থেকে গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস নিয়ে আনুষ্ঠানিক নাড়াচাড়া শুরু করে। কিন্তু পুরো বিশ্ব ১৯৭৯ সাল থেকেই ‘সুখ’ মাপার তুলাযন্ত্র নির্মাণের ধারণাটি নিয়ে গবেষণা চালিয়েছে। যাই হোক, ২০১২ থেকে ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ইন্ডেক্স’ চালু হয়ে যায়। ২০২৪ সালের সমীক্ষায় বিশ্বের ১৪৩টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ সুখী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১২৯তম। গত বছরের চেয়ে এবার ১১ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৩ সালে এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১৮তম। কীভাবে মাপা হয় এই দেশগত সুখকে? জিডিপিকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হয়। তার সঙ্গে নেওয়া হয় সামাজিক সহায়তা, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার গড় সীমা, স্বাধীনতা, উদারতা এবং দুর্নীতির অনুপস্থিতির হিসাব-নিকাশ। এসব বিবেচনা করেই তৈরি হয় সুখের পরিমাপ। তবে এসবের কতটা যে ‘ভালো-থাকা’ আর কতটা যথার্থ ‘সুখ’, সে তর্ক প্রতিনিয়ত চলমান। দীর্ঘদিন বেঁচে থাকাটাই কি সুখ? নাকি সুখের সঙ্গে রোজগারের লম্বা হিসাবের ফর্দ কতটা লম্বা হবে সে হিসেবটাই সুখ?

২০২১ সালে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ার ম্যাট কিলিংসওয়ার্থ একটি গবেষণাপত্র উন্মুক্ত করেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন ‘অর্থোপার্জনের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে ভালো লাগা বাড়তে থাকে যার কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই।’ ২০১০ সালের এক সাড়া জাগানো গবেষণাপত্রে সুখ ও অর্থের গাণিতিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। ড্যানিয়েল কানেম্যান ও অ্যাঙ্গাস ডিটন আমেরিকার পরিপ্রেক্ষিতে গবেষণা করে বের করেন আয়ের সঙ্গে আনন্দ বাড়লেও আয় যখন বছরে ৭৫,০০০ ডলারে পৌঁছে তখন আর আনন্দ বাড়ে না। অঙ্কটা আজকের মানদ-ে মোটামুটি এক লক্ষ ডলার, আর আমেরিকায় ১০ শতাংশেরও কম মানুষ এতটা আয় করেন। তাহলে কোনটা সঠিক? সঠিক সমাধানের জন্য কানেম্যান ও কিলিংসওয়ার্থ একসঙ্গে স্বীয় গবেষণাপত্র পুনর্বিশ্লেষণ করেন। তাদের যৌথ গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৩ সালের মার্চে। তারা শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, তাদের দুজনের ধারণাই সঠিক ছিল। কিন্তু কিলিংসওয়ার্থ একটু বেশি সঠিক। অর্থের সঙ্গে সুখের ধারাবাহিক উত্তরণ ঘটে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার ক্ষেত্রে। কিন্তু সুখের বিচারে সর্বনিম্ন এক-পঞ্চমাংশ জনগণের ক্ষেত্রে বার্ষিক এক লাখ ডলার আয়ের সীমারেখার পরে সুখের রেখচিত্র অনুভূমিক হয়।

অনেকেই কানেম্যান ও ডিটনের গবেষণা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। অনেকেই আবার সুখের আর্থিক পরিমিতির ঊর্ধ্বসীমার সন্ধান পেয়ে প্রভাবিত হন। আধুনিককালের রবিনহুড হিসেবে পরিচিত একজন ব্যক্তি ড্যান প্রাইস। তিনি ‘গ্র্যাভিটি পেমেন্টস’ নামক সিয়াটলের এক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও। কানেম্যান ও ডিটনের গবেষণা উপলব্ধি করে তিনি কোম্পানির ১২০ জন কর্মচারীর সবার বার্ষিক বেতন বাড়িয়ে ৭০,০০০ ডলার করেছিলেন। এই অতিরিক্ত টাকা জোগাতে নিজের বার্ষিক বেতন ১১ লাখ ডলার থেকে কমিয়ে ৭০,০০০ ডলারে নামিয়ে আনেন। তার বই ‘ওয়ার্থ ইট’ এ এই ব্যতিক্রম করপোরেট এবং সামাজিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

২০১৮ সালে আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সেখানকার স্থানীয় প্রশাসন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘হ্যাপিনেস ক্লাস’-এর ব্যবস্থা করে। তাতে ধ্যান, গল্প বলা, ইনডোর গেম ইত্যাদির সংযোজন করা হয়। সেই ক্লাস দেখে ভারত সফরকালে খুব খুশি হয়েছিলেন মেলানিয়া ট্রাম্প। কিন্তু ‘সুখ’ কি শেখানো যায়? অথবা ‘সুখ’ কি ‘অসুখ’-এর বিপরীত শব্দ? ফকিরের ‘সুখ’ দেখে ‘রাজার অসুখ’ গল্পের রাজা নিজের ‘অসুখ’ নিজেই সারিয়ে নেন। কিন্তু ‘সুখ’ কি অর্জন করা যায়? সুখ কি আদৌ পরিমাপ করা সম্ভব?

পুরো দেশ আনন্দে ভরপুর করতে ভেনিজুুয়েলা কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে মিনিস্ট্রি অব হ্যাপিনেসের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। তার পরও কি মনের শান্তিকে হাতের মুঠোয় আনা সম্ভব? আবার সুখ-শান্তি অবজ্ঞা করেই কি সার্বিক বিজয় সম্ভব? অনেকেই অবশ্য বিজয়কেই চূড়ান্ত সুখ মনে করে থাকে। দিগি¦জয়ী আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট তার অন্যতম উদাহরণ। ১৭৮৫ সালের গ্রাউন্ডওয়ার্ক অব দ্য মেটাফিজিক্স অব মরালস-এ দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট অবশ্য লিখছেন, ‘হ্যাপিনেস ইজ নট অ্যান আইডিয়াল অব রিজন, বাট অব ইমাজিনেশন।’ তবু চলতেই আছে আমাদের সুখ অন্বেষণ।

স্বার্থিক উদ্দেশ্যেরও আরেক নাম সুখ-শান্তি। একজন ব্যক্তির কী আছে কী নেই তার ওপর সুখ নির্ভর করে না। বরং ব্যক্তি ভাবনা, ইহজাগতিক ও পরলৌকিক চিন্তনের ওপর পরোক্ষভাবে সুখ-শান্তি নির্ভর করে। মানুষ আজ যা ভাবছে তার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠে তার ভবিষ্যৎ। সরল মনে সঠিক কাজকর্ম ও ইতিবাচক চিন্তাধারাই নির্ধারণ করে দেয় মানুষের সুখ অথবা দুঃখ। আত্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী, মর্যাদাবান, হৃদয়বান, জ্ঞানী-গুণী, সৎ মানুষ সাধারণত সব সময় সুখী হয়। যারা শুধু নিতে চায়, দিতে জানে না বা চায় না, তারা সুখী হয় না। আবার অনেকেই মনে করে সুখ বলে কিছুই নেই, যা আছে তা কেবলি অভিনয়। প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর সুরে বলা যায় ‘সুখেরই পৃথিবী সুখেরই অভিনয় যতই আড়ালে রাখ আসলে কেউ সুখী নয়/নিজ ভুবনে চির দুঃখী আসলে কেউ সুখী নয়’।

সুখের বিপরীতে অবস্থান করে অসুখ। বস্তুত যে অসুস্থ নয় সেই সুখী। শারীরিক অথবা মানসিক যেকোনোভাবে অসুস্থ থাকা মানে নিজের সুখ-শান্তি পুরোপুরি নষ্ট করা। শারীরিক অসুস্থতায় ভুগলে মানুষের জীবনে সুখ থাকে না। মানসিক অসুস্থতায় ভুগলেও সুখ থাকে না। শারীরিক ও মানসিক শান্তির জন্য প্রয়োজন নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন। অল্পে তুষ্ট থাকা, অন্যের কাছে প্রত্যাশা করা ছেড়ে দেওয়া, লোভ না করা, দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে চেষ্টা করা, নিয়মিত ঘুম ও ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীর-মনের সুস্থতা বজায় রাখতে পারলে সুখ-শান্তির অভাব হওয়ার কথা না।

লেখক : গবেষক, সংগঠক ও শিক্ষক

ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড হাইস্কুল, শহীদ সালাহউদ্দিন সেনানিবাস ঘাটাইল, টাঙ্গাইল

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close