আজহার মাহমুদ

  ১৬ জুন, ২০২৪

মুক্তমত

বাবা নামক বটগাছটির যত্ন করি তো?

আজ ১৬ জুন বিশ্ব বাবা দিবস। ১৭ জুন পবিত্র ঈদুল আজহার কারণে হয়তো এবারের বাবা দিবসটা আড়ালে থেকে যেতে পারে। আড়ালে থেকে যাওয়াটা অবশ্য বাবাদের পুরাতন অভ্যাস। বাবারা সব সময় নিজেদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে আড়ালেই থেকে যান। গোটা পৃথিবীর খবর আমার জানা নেই, তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে বাবারা সব সময় সন্তানদের ভালোবাসা পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে। মাকে নিয়ে যতটা ভালোবাসা, সংগ্রাম, আবেগী, হার না মানা গল্প শোনা যায়, তার অর্ধেকও বাবাদের নিয়ে হয় না।

এসবের পেছনে অবশ্য লম্বা যুক্তিতর্ক হতে পারে। তর্ক-বিতর্ক যাই হোক বাবা শব্দটার ওজন অনেক। বাবা কি শুধু একটি নাম? আমি বিশ্বাস করি সবার উত্তর না হবে। বাবার অপর নাম হওয়া উচিত প্রাণ। বাবা মানে নতুন ভোরের আলো, বাবা মানে বেঁচে থাকার শক্তি। বাবা মানে ভয়হীন পথচলা, বাবা মানে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে যাওয়া। বাবা মানে স্বপ্নপূরণের হাতিয়ার, বাবা মানে প্রয়োজন নেই পেছনে ফিরে তাকানোর।

বাবার সংজ্ঞাটা আমার কাছে এমনই। তবুও বাবা নিয়ে আমাদের অনেকের অভিযোগ, অনুযোগ রয়েছে। সেটা স্বাভাবিক। বাবা বকা দেয়, বাবা কঠোর শাসন করে, বাবা মনের মতো জীবনযাপন করতে দেয় না। বাবাকে নিয়ে এমন শত শত অভিযোগ আমার-আপনার-আমাদের অনেকেরই থাকতে পারে। এই অভিযোগগুলো জীবনের একটা পর্যায়ে আমার-আপনার সন্তানরাও করবে। তখন আমি-আপনিও বাবা-মায়ের ভূমিকায় থাকব। আর আমাদের বাবাদের মতোই শাসন করব। কেন করব সেটা নিশ্চয়ই আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

সত্যি বলতে, বাবা নামটাই সন্তানের জন্য। একজন পুরুষ যখন বাবা হয়ে যায়, তখনকার চিন্তা-চেতনায় থাকে শুধু সন্তান। সন্তানের প্রতি তার যে দায়িত্ব রয়েছে, সেটা পালন করার জন্যই রোজ নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছে।

কিন্তু আমরা সন্তান হয়ে বাবার প্রতি যে দায়িত্ব আছে তা কজন পালন করছি! বৃদ্ধ হলে যে বাবাদের আমরা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসছি, তারাই আজ আমাদের এ পর্যন্ত এনেছে। অথচ আজ আমরা সেটা ভুলে গেছি। মায়ের গর্ভে হয়তো মাকে অনেক কষ্ট দিয়েছিলাম। কিন্তু পৃথিবীতে এসে বাবাকে দিয়েছি কঠিন পরীক্ষার চ্যালেঞ্জ। বাবার সামনে সন্তানের পড়াশোনার খরচ, খাবারের দায়দায়িত্ব, জামা, চিকিৎসা এবং আমাকে সুখে রাখার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছি। যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাবা রোজ লড়াই করে যাচ্ছেন নিজের সঙ্গে। এসব কার জন্য? আমার-আপনার জন্য। কিন্তু সেই সন্তানই এক দিন ‘বাবা’ নামক প্রাণীটিকে চেনে না।

প্রতিটি বাবাই চান তার সন্তান যেন মানুষের মতো মানুষ হয়। আর আমরাই এক দিন অমানুষের মতো আচরণ করে বাবাকে দূরে সরিয়ে দিই। আমাদের কষ্ট হলে বাবারও কষ্ট হয়। আমরা হয়তো তা বুঝতে পারি না, কারণ বাবা আমাদের সেটা বুঝতে দেন না। কিন্তু আমরা বাবার কষ্ট হলে কখনো কি নিজেদের কষ্ট অনুভব করি? এমনও কিছু কিছু নজির রয়েছে, বাবা সন্তানকে সারাজীবন পরিশ্রম করে বড় করে তুলেছে; আজ

সেই সন্তান তার বাবাকে আঘাত দিয়ে চলে গেছে। কারণ আজ তার জীবনে আর বাবার প্রয়োজন নেই। তবুও সব বাবারাই চায় তার সন্তান ভালো থাকুক, সুখে থাকুক, সুন্দর থাকুক।

বাবার চিন্তা থাকে শুধু পরিবার আর সন্তান। কীভাবে সন্তানের চাহিদা পূরণ করবে, কীভাবে পরিবারের সব চাহিদা পূরণ করবে- সেই চিন্তা নিয়েই বাবার বাকি জীবন কাটে। মৃত্যুর আগেও বাবা নামক মানুষটি তার সন্তানের জন্য চিন্তা করে যাবে। হ্যাঁ, এটাই বাবা। বাবার চিন্তার ভাগ নেওয়ার মতো কেউ থাকে না। বাবাকে একাই তার সব চিন্তার ভার নিয়ে চলতে হয়। আর আমরা সেই বাবাকেই অনেক সময় ভালোবাসতে জানি না, দেখাতে পারি না কৃতজ্ঞতা।

একটা সময় আমাদের হয়তো অর্থ-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি হতে পারে। আমরা নিজেরা স্বাবলম্বী হব। তখন চারপাশে আমাদের অনেক আপনজন হয়ে উঠবে। অনেক সময় এতে আমরা আমাদের সত্যিকারের আপনজনটাই হারিয়ে যায়। হ্যাঁ, সেই বৃদ্ধ বাবাকেই আমরা তখন একা করে দিই।

একবার নিজের কাছে প্রশ্ন করলেই উত্তর পাব আমরা। বাবা কীভাবে সময় কাটায়, কীভাবে খায়, কীভাবে ঘুমায় সে খবরটাও আমরা রাখি না। আমরা কি কখনো জানতে চেয়েছি, বাবা তোমার ডায়াবেটিসের কী অবস্থা? নাকি কখনো জিজ্ঞাসা করি, বাবা তোমার প্রেশার কেমন? আসলে আমরা বাবার বেলায় ব্যক্তিত্বহীন, দায়িত্বহীন হয়ে পড়ি। তাই আমরা এসব কিছুই জানতে চাই না।

তাই আসুন, এসব ভুল থেকে বের হয়ে আসি। বাবাকে সেভাবেই ভালোবাসি, যেভাবে তিনি আমাদের ভালোবাসেন। পৃথিবীতে বাবারাই একমাত্র প্রাণী যারা কিছু দাবি করেন না সন্তানদের কাছ থেকে, শুধু দিয়ে যান নিঃস্বার্থভাবে। ভালো থাকুক পৃথিবীর সব বাবা। ভালো থাকুক আমাদের বাবা নামক বটগাছটি।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close