রায়হান আহমেদ তপাদার

  ১৬ জুন, ২০২৪

মতামত

সাম্য ও সহানুভূতিশীল হৃদয়ের পরিচয়ে ঈদুল আজহা

পৃথিবী জুড়ে সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন উৎসব আছে। উৎসব জাতিগত ঐক্যের চেতনা সৃষ্টি করে। উৎসবের দিনগুলোও যেকোনো জাতির স্বাতন্ত্র্য ও পৃথক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ও প্রতীক। একটি জাতির স্বাতন্ত্র্য পরিচয় সত্তা নির্মাণ করতে, তাদের মধ্যে ঐক্যবোধ, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের চেতনা জাগ্রত করতে সম্মিলিত আনন্দ ও উদযাপন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঈদ শব্দটিতে জড়িয়ে আছে এক অপূর্ব আনন্দ শিহরণ। শব্দটি নিমেষেই পরিবেশের আবহ বদলে দেয়। সব অভাব-অনটন দুঃখ-বেদনা সরিয়ে অদৃশ্য এক আনন্দ অনুভবে মন ভরিয়ে দেয়। মুসলিম জীবনাচারে ঈদ পেছনে ফেলে আসা আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আনন্দে উদ্বেল করে তোলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। আত্মীয়-পরিজন, শৈশবের বন্ধু, সবার সঙ্গে ঈদ আনন্দকে ভাগ করে নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা সবাইকে ঘরমুখী ও শেকড়মুখী করে তোলে। নাড়ির অচ্ছেদ্য টান- যেন প্রাণ ফিরে পায় ঈদ এলেই। প্রবাসের দুঃখ-বেদনা-যন্ত্রণা সব পেছনে ফেলে তাই তো মানুষ অনেক কষ্ট করে হলেও ছুটে যায় আপনজনের মধ্যে। পথের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট আমলে না নিয়ে সবাই ফিরতে চায় ফেলে আসা শতসহস্র স্মৃতিবিজড়িত শৈশবের পরিবেশে, আত্মীয়-পরিজন এবং বন্ধুদের মধ্যে। এ এক অপার্থিব আনন্দক্ষণ। হাজার বছর ধরে চলে আসা এক ধারাবাহিকতা। মুসলিম জীবনাচারের সাংস্কৃতিক ধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ ঈদ এবং ঈদ আনন্দ। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ধারাবাহিকতায় এখনো ঈদের ছুটি, ঈদযাত্রার সরলীকরণ করা যায়নি, বিশেষ করে আমাদের দেশে। প্রতি বছরই পুনঃপৌনিকভাবে একটা সমস্যা এই আনন্দকে প্রায়ই বিষাদে পরিণত করে। তা হচ্ছে ঈদের ছুটি বিন্যাস। অথচ মুসলিম জীবনে অসীম গুরুত্ব আর তাৎপর্যময় উৎসব ঈদুল আজহা। আত্মত্যাগ ও ধৈর্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দিন।

ঈদ উৎসবটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পবিত্র ধর্মীয় অনুভূতি। ইসলামে ধর্ম আর জীবন অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িয়ে আছে। সুতরাং মুসলিম জীবনে ঈদ শুধু বিলাসিতা কিংবা স্রেফ আনন্দ উপভোগেরই নাম নয়, এতে জড়িয়ে আছে কর্তব্যবোধ, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের বৈশিষ্ট্য। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্প্রীতির ভাবটা এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এলাকার লোকরা ঈদের নামাজের জন্য নির্দিষ্ট ঈদগাহে সমবেত হয়। এতে সবার মধ্যে একাত্মতা ও সম্প্রীতি ফুটে ওঠে। ইসলামের মহান ভ্রাতৃত্ববোধে সবাই উদ্দীপ্ত হয়। পরস্পর কোলাকুলির মাধ্যমে সব বিভেদ ভুলে গিয়ে পরস্পর ভাই বলে গৃহীত হয়। ধনী-গরিবের ব্যবধান তখন প্রাধান্য পায় না। ঈদের আনন্দ সবাই ভাগ করে নেয়। এর ফলে ধনী-গরিব, শত্রু-মিত্র, আত্মীয়স্বজন সবাই পরস্পর ভ্রাতৃত্বের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। ঈদ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভোলার জন্য, মানুষের মধ্যে প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হওয়ার জন্য পরম মিলনের বাণী নিয়ে আসে। ঈদুল আজহায় যে কোরবানি দেওয়া হয়, তার মাধ্যমে মানুষের মনের পরীক্ষা হয়, কোরবানির রক্ত-মাংস কখনোই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। শুধু দেখা হয়, মানুষের হৃদয়কে। ঈদের মধ্যে আছে সাম্যের বাণী, সহানুভূতিশীল হৃদয়ের পরিচয়। পরোপকার ও ত্যাগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় মানুষের মন।

আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নাদিষ্ট হয়েছিলেন প্রিয়তম বস্তু তার পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করার জন্য। সেই অনুযায়ী তিনি পরম করুণাময় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয়পুত্রকে কোরবানি দিতে উদ্যত হন। কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তাকে আর শেষ পর্যন্ত পুত্রকে কোরবানি দিতে হয়নি। ইসমাইলের পরিবর্তে কোরবানি হয় একটি পশু। মহান আল্লাহর এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন হজরত ইব্রাহিম (আ.)। এই সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমাকে তুলে ধরাই ঈদুল আজহার পশু কোরবানির প্রধান মর্মবাণী।

ঈদুল আজহার শিক্ষায় উজ্জীবিত হলে আমরা সব পাপ, বঞ্চনা, সামাজিক অনাচার ও রিপুর তাড়না বা শয়তানের আসওয়াসা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হব। পবিত্র ঈদুল আজহা প্রতি বছর আমাদের কাছে ঘুরেফিরে আসে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ পশু কোরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশা করে। এই কোরবানির শিক্ষা কী, তা আমাদের জানা দরকার। মনে রাখতে হবে, কোরবানি শুধু পশু জবেহ করা নয়, কোরবানি হলো নিজের ভেতরের পশু সত্তাকে জবেহ করা। তার মানে মনের সব কুপ্রবৃত্তিকে খতম করা। কোরবানির গোশত পেয়ে গরিব-দুঃখী খুশি হয়। কোরবানি করার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর আনুগত্য ও নির্দেশ মানার শিক্ষা গ্রহণ করে। কোরবানির দিন মুসলমানরা একে অন্যের সঙ্গে মহামিলনে মিলিত হয়। এদিন ধনী-গরিব কোনো ভেদাভেদ থাকে না। সবাই সাম্য, ঐক্য, সম্প্রীতি ও সহানুভূতির মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসে। এতে সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি হয়। তাই কোরবানি যাবতীয় আহকাম মেনে খোদাভীতির মানসিকতা নিয়ে কোরবানি করা দরকার। তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহর দরবারে আমাদের কোরবানি কবুল হবে। এর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে সামর্থ্য হব। সুতরাং, ঈদুল আজহা শুধু পশু কোরবানি করা এবং আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে আনন্দ-প্রমোদকে বোঝায় না, বরং ঈদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আত্মোৎসর্গ, নিজের ভেতরে থাকা পশুত্বের মূলতপাটন এবং একমাত্র রবের সন্তুষ্টি। উল্লেখ্য, ইমান আনয়নের মাধ্যমে সবাই মুমিন বা মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ইমান গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিটি মুমিন ইসলামের সব বিষয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে। সুখ-দুঃখ এবং সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা সর্বাবস্থায় ইসলামই একমাত্র অনুশাসন, এ কথাটি নিজের মধ্যে দৃঢ় করে নেওয়া।

প্রকৃত মুমিনের মৌলিক চিন্তাচেতনা এমন হওয়াটাই কাম্য। ঈদ মুসলিম এবং প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার অনন্য মাধ্যম। ইসলাম একটি তাৎপর্যপূর্ণ ধর্ম। এর প্রতিটি আদেশ-নিষেধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুসলিমদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা এবং প্রশান্ত করা। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি- এ কথাটি সবার মুখে রটে বেড়ায় কিন্তু ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা শিক্ষা এবং এর মহত্ত্বের প্রতি কজনই-বা গুরুত্ব দিচ্ছি। ঈদ যেমনি আনন্দের বার্তা দিচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে শিক্ষা দিচ্ছে মহান আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করার। নিজের মাঝে থাকা পশুত্ব ও অমানবিক মন-মানসিকতা বিসর্জন দেওয়ার। বার্তা দিচ্ছে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর। সুপথ দেখাচ্ছে ন্যায়নীতি আর নিষ্ঠার পথে চলার। শিক্ষা দিচ্ছে সুন্দর ও পবিত্র মনের অধিকারী হওয়ার। তাই আসুন ঈদুল আজহার প্রকৃত মহত্ত্ব ও তাৎপর্য নিজে লালন করতে শিখি। অসুন্দর ও কলুষিত হৃদয় পবিত্র করার লক্ষ্যে ঈদুল আজহায় শিক্ষা গ্রহণ করি। তাই ঈদুল আজহার পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশুশক্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রিপুকেই কোরবানি দিতে হয়। আর হালাল অর্থে অর্জিত পশু কোরবানির মাধ্যমে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়। আমরা চাই ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সব অনিশ্চয়তাণ্ডশঙ্কা দূর হোক। হিংসা, হানাহানি ও বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে একসঙ্গে এক কাতারে পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দে শামিল হয়ে সবার মধ্যে সাম্য ও সহমর্মিতার মনোভাব জাগিয়ে তুলি। মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে আমাদের প্রার্থনা হোক জগতের সব মানুষের সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি। পৃথিবী সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানিমুক্ত হোক! সন্ত্রাসের বিভীষিকা দূর হোক! আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে বন্ধন দৃঢ়তর হোক! আগামী দিনগুলো সুন্দর ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হোক হাসি-খুশি ও ঈদের আনন্দে ভরে উঠুক প্রতিটি প্রাণ। সবাইকে ঈদুর আজহার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন-ঈদ মোবারক।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close