তানজিব রহমান

  ১৫ জুন, ২০২৪

পর্যালোচনা

জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে কমিউনিস্ট রাজনীতির মগজধোলাই

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আন্দোলন ও কৌশলে বরাবরের মতো হুঁচোট খেয়ে ভোল পাল্টে ফেলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবে জিয়াউর রহমানের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠানে জামায়াতের রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টানা এক বক্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চুলচেরা বিশ্লেষণের বিষয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে। তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি সমর্থন না করলেও ‘জ্ঞানচর্চায় তাদের কর্মপদ্ধতির’ ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি মনে করেন জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক যে প্রক্রিয়া তা অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত, ঠিক কমিউনিস্ট পার্টির মতো, যেখানে তারা প্রচুর পড়াশোনা করে। তার এ বক্তব্যে দুটি বিষয় নিয়ে বিপত্তি বাধে। প্রথমত, জামায়াত-শিবির বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফরমের নাম, যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতা করে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে তাদের শীর্ষ নেতাদের সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর হয়। যারা ছিল ছাত্রসংঘ, আলবদর, আলশামস বাহিনীর জনক। দ্বিতীয়ত, কমিউনিস্ট পার্টি মূলত বাম ঘরানার রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী এবং যারা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মতো বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হয়ে কীভাবে দুটি আদর্শকে মিলিয়ে ফেললেন? ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পাকিস্তানপন্থি জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির একটি ঐতিহাসিক সখ্য রয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সাংবাদিক ও লেখক এন্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশ রক্তের ঋণ’ বইতে লিখেছেন, অসময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল বিএনপি। তিনি লিখেছেন- জিয়ার বিএনপি পাকিস্তানি দালালদের জন্য সব কটা সদর দরজা খুলে দিয়েছিল। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী জিয়ার দলের ২৫০ জনই ছিল দালালগোত্রের সদস্য। যারা দালাল আইনে অভিযুক্ত, যারা বঙ্গবন্ধুর আমলে পাকিস্তানের শাসকচক্র ও হানাদার বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছিল এবং দালাল আইনে অভিযুক্ত ছিল। জেনারেল জিয়া তার মন্ত্রিসভাকে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন, যেখানে পাকিস্তানি মনোভাবাপন্ন দালালশ্রেণি ও মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানিরা একই সঙ্গে বসে দেশের ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণ করেছিলেন, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তবে জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ অধ্যায়ের একটা পরিসমাপ্তি হয়। কেননা পাকিস্তানপন্থি আর পাকিস্তানবিরোধী ধারা একই সঙ্গে চলতে পারে না।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমান সময়ে এসেও যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তাতে নিজের দল ভারী করার জন্য তিনি জামায়াত-শিবিরের পড়াশোনাকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি হিসেবে সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন অথচ বাস্তবে তা কতটা বিজ্ঞানসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন করা যেতেই পারে। জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন একাত্তর সালে ভয়ংকর ‘ছাত্রসংঘ’ থেকে কীভাবে নাম পাল্টে ‘ছাত্রশিবির’ হয়েছে তা অবশ্য মির্জা সাহেবের ভালো মনে থাকার কথা। ‘১৯৭২ সালের দালাল আইন’ ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে বাতিল করে দেন প্রয়াত জিয়াউর রহমান। দালাল আইন বাতিলের ফলে জেলে আটক প্রায় সাড়ে ১০ হাজার রাজাকার সে সময় মুক্তি পেয়ে যায়। তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে স্বাধীনতাবিরোধীদের মুক্ত করে দেয় সাবেক এই সামরিক সরকার। এ ছাড়া যেসব রাজাকার পাঁচ বছর ধরে পালিয়ে ছিল, তারাও তখন বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে আসে। এ সুযোগে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হয় জামায়াত। তাদের পুরোনো ‘ছাত্রসংঘ’কে নতুন করে ঢেলে সাজাতে ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখে রাজধানীর সিদ্দিকবাজারে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয়রা মিলিত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই সংগঠনটির কার্যক্রম প্রায় নিষ্ক্রিয় ছিল। রাজনীতির মাঠে প্রকাশ্যে নামার প্রস্তুতি নেয় ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’ নামের দেশবিরোধী সংগঠনটি। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ছাত্রসংঘের নতুন নাম হয় ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির’। শুধু ‘সংঘ’ বাদ দিয়ে ‘শিবির’ যুক্ত করা হয়, আর সবকিছুই একই থাকে। পতাকা, মনোগ্রাম সবই এক। প্রশিক্ষণব্যবস্থা, এমনকি জেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত নেতৃত্ব-কাঠামো সবই এক থাকে। মীর কাশেম আলীকে সভাপতি ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক করে জামায়াতের এই ছাত্র সংগঠন নতুন কার্যক্রম শুরু করেছিল, যারা ইতিহাসের বর্বরতম মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজা ভোগকারী।

১৯৭৬ সালে যখন জামায়াত রাজনীতিতে পুরোদমে প্রবেশ করে, তখন জামায়াতের নীতি-নির্ধারকদের মনে এই ভয় ছিল যে, ছাত্রসংঘ নামটাকে হয়তো এ দেশের মানুষ একাত্তরে তাদের জঘন্য কর্মকাণ্ডের জন্য ভুলে যাবে না। এই চিন্তা থেকেই তারা ছাত্রসংঘের ‘সংঘ’ কেটে সেখানে ‘শিবির’ যোগ করে দেয়। এ ছাড়া জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রসংঘের হিংস্র এবং পৈশাচিক কার্যকলাপ বাংলাদেশের মানুষের মনে একটা স্থায়ী ঘৃণার ভাব সৃষ্টি করেছে। জামায়াত তখন ভালো করেই জানত এই ঘৃণাটা কখনো দূর হবে না। ইসলামী ছাত্রসংঘের কথা উঠলেই অবধারিতভাবে আলবদর বাহিনীর কথা চলে আসবে। ফলে সংগঠনের প্রচার-প্রচারণা বাধাগ্রস্ত হবে। আর যদি কখনো স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে, তখন আইনগতভাবে ফেঁসে যেতে পারে ইসলামী ছাত্রসংঘ। সে ক্ষেত্রে যাতে সংগঠনের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য জামায়াতের নেতারা সংঘ নামটি কেটে ফেলে শিবির যোগ করে দেয়, হয়ে যায় ‘ছাত্রসংঘ’ থেকে ‘ছাত্রশিবির’।

আর এই ছাত্রসংঘের বর্তমান রূপ ছাত্রশিবিরের পড়াশোনার তারিফে বিএনপি মহাসচিব কমিউনিস্টদের সঙ্গেও তুলনা করতে ছাড়লেন না। অথচ তিনি ভুলে গেলেন একাত্তরে এই ছাত্রসংঘ কতটা ভয়ংকর ছিল, পাকিস্তান প্রেমে মত্ত হয়ে কতশত মায়ের বুক খালি করেছিল। ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও দীক্ষা নিয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি জান্তার সহযোগী হিসেবে আলবদর, আলশামস হয়ে এ দেশের মানুষকে হত্যা করেছে। বুদ্ধিজীবীদের বধ্যভূমিতে নিয়ে পশুর মতো জবাই করেছে। জিয়াউর রহমান সেই জামায়াতে ইসলামকে রাজনীতি করার অনুমোদন দিলে ছাত্রশিবির নামে তাদের ছাত্রসংগঠন মাঠে নামে। যারা এখন মির্জা সাহেবদের পাঠ্য আদর্শ হিসেবে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন! ছাত্রসংঘ, ছাত্রশিবির, জামায়াত যেসব বইপুস্তক পড়ে বা পাঠ করায়, সেগুলো তাদের দলীয় নেতাদের লেখা বইপুস্তক। গোলাম আযমের লেখা বই পড়ে ছাত্রশিবিরের একজন স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়পর্যায়ের নেতা বা কর্মী যদি নিজেকে রাজনৈতিক প্রাজ্ঞ, বিজ্ঞ ভাবতে শুরু করেন এবং দুনিয়ার তাবৎ গবেষণা গ্রন্থকে মিথ্যা কিংবা বিভ্রান্তিকর বলে মনে করেন। তাহলে বলতে হবে এসব প্রশিক্ষণ কিংবা বইপুস্তক পাঠের ফলাফল মোটের ওপর মগজধোলাই ছাড়া আর কিছুই না। 

মাও সে তুং, মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিনসহ আরো অনেক মার্কসবাদী নেতাদের লেখা কিংবা তাদের ওপর আলোচিত বই পাঠ করে কজনই বড় রাজনীতিবিদ হয়েছেন, তা বলা মুশকিল। মার্কসবাদ, লেলিনবাদ, কিংবা রাজনীতির অতীত বর্তমান পর্যালোচনা করা, পড়াশোনা করা, রাষ্ট্র রাজনীতির দর্শন আলোচনা, চর্চার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতির জ্ঞান অর্জনকে কেউ খাটো করে দেখছে না হয়তো। তবে তার সঙ্গে শিবিরের মগজধোলাই পড়ামোনাকে এক করে ফেলে রাষ্ট্র রাজনীতির উন্নয়ন করা তো দূরে থাক ক্ষতি ছাড়া ভালো করার পরামর্শ হবে দুর্বোধ্য।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close