মুফতি আহমদ আবদুল্লাহ

  ১৫ জুন, ২০২৪

হজ

মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সম্মিলন

হজ ইসলামি জীবন বিধানের পঞ্চম স্তম্ভের অন্যতম। হজের প্রতিটি কাজ ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত ও খুবই তাৎপর্যবহ। সর্বপ্রথম বাইতুল্লাহ শরিফে হজ আদায় করেন হজরত আদম (আ.)। এরপর হজরত নুহ (আ.) থেকে শুরু করে সব নবী-রাসুল কাবা শরিফের জিয়ারত ও তাওয়াফ করেন। কাবা শরিফ পুনর্নির্মাণের কাজ সমাপ্তির পর মহান রাব্বুল আলামিন জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে এই পবিত্র গৃহের তওয়াফ ও হজ করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ পেয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) উভয়েই তাওয়াফসহ হজের যাবতীয় আহকাম পালন করেন। এরপর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হুকুম দিলেন, ‘হে ইব্রাহিম! তুমি পুরো পৃথিবীর মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা ছড়িয়ে দাও। এই বিষয়ে আল-কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, আল্লাহতায়ালা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দাও, তারা তোমার কাছে আসবে হেঁটে। সব ধরনের ক্ষীণকায় উঠের পিঠে। তারা আসবে বহু দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে। (সুরা হজ : ২৭)

পবিত্র কোরআন কিয়ামত পর্যন্ত আগন্তুক সব মানুষকে আল্লাহর ঘর কাবা শরিফের জিয়ারত ও হজ করার বিধান দেওয়া হয়েছে। আল-কোরআনের ভাষ্য ‘আল্লাহর উদ্দেশ্যে বাইতুল্লাহর হজ করা তাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য, যাদের সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রয়েছে। (সুরা আল-ইমরান : ৯৭)

হজ আজকের মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর সব মানুষ একই সূত্রে গ্রথিত। মানবজাতির পিতা হজরত আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.) জান্নাত থেকে পৃথিবীতে এসে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে একজন-আরেকজনকে খুঁজতে থাকেন। পরিশেষে ময়দানে আরাফাতে মিলন হয় পরস্পরের। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ আদম সন্তান হজব্রত পালনে আরাফাতের মহামিলন প্রান্তরে সমবেত হয়ে থাকে। তেমনিভাবে হজব্রত পালনকারীদের সাফা-মারওয়ার মধ্যে সায়ি করা, মিনায় শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ করা ও পশু কোরবানি করা ইত্যাদি প্রধানত হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে ও প্রসঙ্গত বিবি হাজেরা ও হজরত ইসমাইল (আ.)-কে স্মরণ করিয়ে দেয়। স্মরণ করিয়ে দেয় হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আল্লাহ প্রেমের ইতিহাস ও তাওহিদী জীবনযাত্রার প্রকৃত শিক্ষা।

হজের ফাজায়েল ও মাসায়েল : হজের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কীয় অসংখ্য আয়াত ও হাদিস উল্লেখ রয়েছে। প্রিয়নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন তুমি হাজিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন তুমি তাকে সালাম করবে, মুসাফাহা করবে এবং তার বাড়িতে প্রবেশের আগে তাকে তোমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করার অনুরোধ করবে। কেননা তিনি ক্ষমাপ্রাপ্ত।’ (আহমদ : ২৫৩৮) এমনিভাবে হুজুর (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির নিমিত্তে হজ করে এবং মাঝে কোনো ধরনের অনর্থক কথা-বার্তা ও গুনাহের কাজে লিপ্ত না হয়, তখন সে এমনভাবে পবিত্র হয়ে প্রত্যাবর্তন করে, যেমন কোনো বাচ্চা তার মায়ের গর্ভ থেকে পূর্ণ নিষ্পাপ ও পবিত্র হয়ে দুনিয়াতে এলো। (বোখারি : ১৪৪৯)

হাজিরা আল্লাহতায়ালার সম্মানিত মেহমান। তাদের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যখন তোমাদের সঙ্গে কোনো সম্মানিত হাজির সাক্ষাৎ হয়, তখন তাকে নিজ ঘরে আনার আগে তাকে সালাম দাও, মুসাফা করো এবং তার কাছে স্বীয় মাগফিরাতের জন্য দোয়া চাও। কেননা সে এখন এ অবস্থায় আছেন যে তার সব গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। (মুসনাদে আহমদ : ২৫৩৬) হজের নেকি হলো অসহায় লোকদের খানা খাওয়ানো আর অত্যন্ত নরম ভাষায় কথা বলা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘হজে মাবরুর অর্থাৎ মাকবুল হজের প্রতিদান জান্নাতই। হুজুর সাল্ললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, হজের নেকি কী? রাসুল (সা.) বললেন, অসহায়দের খানা খাওয়ানো আর নরম ভাষায় কথা বলা। (মুসনাদে আহমাদ : ২৫৪২)

হজের তারানা : আমাদের প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘যখন হাজিরা লাব্বাইক বলেন, তখন তার সঙ্গে সঙ্গে ডানে-বামে পাথর, বৃক্ষ তরুলতা লাব্বাইক বলতে থাকে। এমনিভাবে জমিনের প্রতিটি বস্তু তার সঙ্গে লাব্বাইক বলতে থাকে। (তিরমিজি : কিতাবুল হজ)। হজের তারানা হলো, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাববাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাকা।’

হজ তিন প্রকার- ১. তামাত্তু। ২. কিরান। ৩. ইফরাদ। এই তিন প্রকারের মধ্যে যেকোনো একটি করার অবকাশ আছে। তবে মিকাতের ভেতর অবস্থানকারীরা হজে ইফরাদ করবে।

হজে তামাত্তু : মিকাত থেকে কেবল উমরার ইহরাম বাঁধবে। উমরার তওয়াফ এবং সায়ি করবে। চুল মুণ্ডিয়ে ইহরাম খোলে ফেলবে। জিলহজ মাসের ৭/৮ তারিখে হজের জন্য ইহরাম বাঁধবে। জিলহজের ৮ তারিখে তালবিয়া পড়তে পড়তে মিনাতে গিয়ে ওই আমল করবে, যা হজের ছয় দিনে করা হয়।

হজে কিরান : মিকাত থেকে হজ এবং ওমরাহ উভয়টা একসঙ্গে ইহরাম বাঁধবে। ওমরাহর তওয়াফ এবং সায়ি করবে। আর ইহরাম অবস্থাই থাকবে। মামনুআতে ইহরাম থেকে বেঁচে থাকবে। ৮ জিলহজে তালবিয়া পড়তে মিনাতে গিয়ে সেই আমল করবে যা হজের ছয় দিনে উল্লেখ আছে।

হজে ইফরাদ : মুকাত শুধু হজের ইহরাম বাঁধবে। তওয়াফে কদুম করবে। ইহরাম অবস্থাই থাকবে। মামনুআতে ইহরাম থেকে বেঁচে থাকবে। ৮ জিলহজে তালবিয়া পড়তে পড়তে মিনাতে গিয়ে সেই আমল করবে যা হজের ছয় দিনে উল্লেখ আছে।

হজের ছয় দিনে আমলসমূহ

প্রথম দিন : ৮ জিলহজ। মিনাতে অবস্থান করে জোহর, আসর, মাগরিব, এশা এবং ৯ জিলহজে ফজর নামাজ আদায় করবে। মিনাতে এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া আর মিনাতে হজের রাত অতিবাহিত করা সুন্নাত। যদি কোনো কারণবশত মিনাতে পৌঁছাতে কিছুটা বিলম্ব হয় অথবা যদি নাই পৌঁছে, তাহলে কোনো দম বা অন্য কিছু তার ওপর আবশ্যক হবে না। কিন্তু ইচ্ছাকৃত এমন না করাই শ্রেয়।

দ্বিতীয় দিন : ৯ জিলহজ। সকালেই তালবিয়া পড়তে পড়তে মিনা থেকে আরাফাতের ময়দানে রওনা দেবে। আরাফাতে পৌঁছে জোহর এবং আসর পড়বে। সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত কেবলার দিকে ফিরে দোয়া করবে। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর তালবিয়া পড়ে আরাফাত থেকে মুজদালিফার দিকে রওনা করবে। মুজদালিফায় এসে মাগরিব আর এশা, এশার ওয়াক্ত একসঙ্গে আদায় করবে। রাতে মুজদালিফায়ই অতিবাহিত করবে। মহিলা এবং অসুস্থ লোক অর্ধরাত পর মুজদালিফা থেকে মিনাতে যেতে পারবে।

তৃতীয় দিন : ১০ জিলহজ। মুজদালিফায় ফজর পড়ে দোয়া করবে। সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বে মিনার উদ্দেশে রওনা হয়ে যাবে। কঙ্কর সঙ্গে নিয়ে নেবে। বড় এবং শেষ জমরাতে ৭টি কঙ্কর মারবে। তালবিয়া পড়া বন্ধ করে দেবে। কোরবানি করবে। চুল মুণ্ডাবে এবং ইহরাম খোলে ফেলবে। তওয়াফে জিয়ারত অর্থাৎ হজের তওয়াফ এবং হজের সায়ি করবে।

চতুর্থ এবং পঞ্চম দিন : ১১ ও ১২ জিলহজ। মিনাতে অবস্থান করে তিনো জামরাতে জাওয়ালের পর সাত সাতটি কঙ্কর মারবে। কোরবানি, তওয়াফে জিয়ারত এবং হজের সায়ি ১০ জিলহজে না করে তাহলে ১১ ও ১২ তারিখে দিনে কিংবা রাতে যেকোনো সময় করতে পারবে। আর ১২ তারিখে কঙ্কর মারার পর মিনা থেকে যেতে পারবে।

ষষ্ঠ দিন : ১৩ জিলহজ। যদি কেউ ১২ তারিখে মিনা থেকে রওনা না হয় তাহলে তিনো জামরাতে জাওয়ালের পর কঙ্কর মারবে।

হজ ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ : ১. মুসলমান হওয়া, ২. জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া, ৩. বালেগ হওয়া, ৪. স্বাধীন হওয়া, ৫. হজের সময় হওয়া, ৬. মধ্যম ধরনের ব্যয় হিসেবে সফরের ব্যয় বহনের সামর্থ্য থাকা, যদিও হজ পালনকারী মক্কা শরিফে অবস্থান করে। ৭. যারা মক্কা শরিফের বাইরে থাকেন তাদের জন্য হজ পালনের শর্ত হলো মালিকানা বা ভাড়া সূত্রে স্বতন্ত্রভাবে একটি বাহন বা অন্য কিছু ব্যবহারের সামর্থ্য থাকা। যেমন : আমাদের দেশের হাজিরা বিমান ব্যবহার করে থাকেন। ৮. অমুসলিম দেশে মুসলমান ব্যক্তির ‘হজ ইসলামের একটি রুকন’ এ কথা জানা থাকা।

হজ ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ : ১. সুস্থ থাকা, ২. হজে যাওয়ার বাহ্যিক বাধা না থাকা, ৩. রাস্তা নিরাপদ হওয়া, ৪. মহিলারা নিজ ইদ্দত অবস্থায় না থাকা, ৫. নারীর সঙ্গে একজন মুসলমান আস্থাভাজন, জ্ঞানসম্পন্ন, বালেগ মাহরাম পুরুষ থাকা।

হজের রুকন দুটি : ১. ইহরাম বাঁধা। ২. মুসলমান হওয়া।

হজের ফরজসমূহ : ১. ইহরাম। ২. আরাফায় অবস্থান। ৩. তওয়াফে জিয়ারত। ৪. অনেক উলামায়ে কেরাম সায়ি করাও ফরজ বলেছেন।

ওয়াজিবসমূহ : ১. মিকাত থেকে ইহরাম ছাড়া বের না হওয়া। ২. আরাফার দিনে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। ৩. মুজদালিফায় অবস্থান করা। ৪. জামরাতে কঙ্কর মারা। ৫. কোরবানি করা (হজে ইফরাদে ওয়াজিব নয়) ৬. মাথার চুল মুণ্ডানো বা কাটা। ৭. সায়ি করা। ৮. তওয়াফে বিদা করা।

হজে কোনো ফরয যদি ছুটে যায়, তাহলে তার হজ সহিহ হবে না এবং এর ক্ষতিপূরণ দম দ্বারাও সম্ভব না। আর কোনো ওয়াজিব ছুটে যায়, তাহলে হজ আদায় হয়ে যাবে কিন্তু তার ওপর কাজা ওয়াজিব আবশ্যক হবে।

ইহরাম অবস্থায় যে কাজ করা নিষেধ : ১. সুগন্ধি ব্যবহার করা। ২. নখ কাটা। ৩. শরীর থেকে পশম কেটে ফেলা বা উপড়িয়ে ফেলা। ৪. সহবাস করা। ৫. চেহারা ঢেকে রাখা। ৬. সেলাইকৃত কাপড় পরিধান করা (শুধু পুরুষের জন্য) ৭. মাথা ঢেকে রাখা। (শুধু পুরুষের জন্য)।

বি:দ্র: মিকাত থেকে বাইরে অবস্থানকারী সবাই তওয়াফে বিদা অবশ্যই করবে। সবিশেষ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হজ ডেকে আনে মুসলিম সমাজে ঐক্যের সুর, ঐক্যের সম্মিলন এবং একাত্মতার আহ্বান। হজের মাধ্যমে পরস্পরের মাঝে বিরাজিত হোক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও প্রকৃত মানবতার আন্তরিক সম্পর্ক। বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হোক জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে মানবতার অনাবিল শান্তি।

লেখক : প্রিন্সিপাল, শ্যামপুর কদমতলী রাজউক তাকওয়া মাদরাসা ঢাকা

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close