reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১৪ জুন, ২০২৪

সাক্ষাৎকার

কোরবানির পশু নির্বাচন ও জবাইয়ের সঠিক পদ্ধতি

১৭ জুন সারা দেশে উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো পশু কোরবানি করা। এ উপলক্ষে কোরবানির পশুর হাটে পুরোদমে চলছে বেচাকেনা। কোরবানির জন্য ত্রুটিমুক্ত ও সুস্থ পশু নির্বাচন করা খুবই জরুরি। কোরবানির পশু নির্বাচনপদ্ধতি, সহজে জবাই করার নিয়ম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মাংস ও চামড়া সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিদিনের সংবাদের শেকৃবি প্রতিনিধি মো. আবদুল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল প্রোডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মহব্বত আলী

কোরবানির পশু কীভাবে হবে নির্বাচনপদ্ধতি

কোরবানির পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হবে পশুটি প্রাপ্তবয়স্ক কি না। সাধারণত গবাদি পশুর (গরু, ছাগল ভেড়া কিংবা অন্য যেকোনো) দাঁত দেখে বয়স নির্ধারণ করা হয়। যদি নিচের পাটিতে দুটি স্থায়ী দাঁত থাকে, তবে গরুর বয়স দুবছর, স্থায়ী দাঁত সাধারণত একটু বড় এবং হলদে হয়। ছাগলের ক্ষেত্রে দাঁত দুটি হলে বয়স ১২-১৫ মাস, চারটি দাঁত হলে দুই বছর। খামারিদের কাছে যদি গবাদি পশুর জন্মতারিখ ও সালের তথ্য থাকে, তবে সহজেই বয়স নির্ধারণ করা যায়।

সুস্থ গরু চেনার উপায়

১. গরু খুব চঞ্চল হবে, কানগুলো খাড়া থাকবে, চোখ উজ্জ্বল হবে এবং লেজ নাড়াচাড়া করবে। খাবার সামনে নিয়ে গেলে টান দেওয়ার চেষ্টা করবে।

২. গরুকে ধরতে গেলে নড়াচড়া করবে, ধরতে দেবে না, সব সময় জাবর কাটবে, স্বাভাবিক ইউরিনেশন হবে।

৩. খুরা রোগ আছে কি না দেখতে হবে, তাপমাত্রা, সুস্থ পশুর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হবে, মুখ হালকা আর্দ্র থাকবে।

অসুস্থ গরু চেনার উপায়

গরু অল্পসময়ে মোটাতাজা করার জন্য অসাধু ব্যবসায়ীরা ঈদের ২০-২৫ দিন আগে থেকে স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ খাওয়ানো শুরু করে। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ডোজ খাওয়ানোর কারণে গরুর শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায়। হৃৎপিণ্ড, কিডনি, ফুসফুসের কার্যক্রম বিনষ্ট হয়। এতে শরীরে পানি জমে শরীর ফুলে যায়, ফলে সাধারণ লোকজন সহজে গরুর অসুস্থতা বুঝতে পারে না। এ ক্ষেত্রে অসুস্থ গরু চেনার উপায় হলো- গরু-গম্ভীর হয়ে যায়, অস্বাভাবিক দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়, শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, বসে থাকে এবং সহজে উঠতে চায় না।

আমাদের দেশে গরুতে ঝিমানো ভাব দেখলেই সবাই ভেবে নেয় সেটা স্টেরয়েডযুক্ত গরু। এখানে আমাদের কিছুটা ভুল হয়। যেসব গরু উত্তরাঞ্চল কিংবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আনা হয়, ১০-১২ ঘণ্টা গাড়িতে থাকার ফলে তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই একটা ঝিমানো ভাব চলে আসে। সে ক্ষেত্রে স্টেরয়েডমুক্ত গরু বাছাইয়ের প্রক্রিয়া হলো, গরুর দেহে চাপ দিতে হবে। চাপ দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পর যদি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তাহলে এতে স্টেরয়েড নেই। যদি ফিরে না আসে বা আসতে বেশি সময় নেয় তাহলে বুঝতে হবে গরুটি স্টেরয়েডযুক্ত। বাহ্যিক অবস্থা দেখে সেটাকে স্টেরয়েডযুক্ত হিসেবে ভেবে নেওয়ার কিছু নেই। বাজারের তাপমাত্রা, অধিক মানুষজন, ভ্রমণজনিত ক্লান্তির কারণেও গরুতে ঝিমানো ভাব চলে আসে। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের প্রতি আমাদের পরামর্শ হলো, গরুকে ইলেকট্রলাইট, খাবার স্যালাইন, লবণপানি দিতে হবে। এতে করে সে অনেকটা শক্তি ফিরে পাবে।

গরুর পরিচর্যা ও জবাইয়ের আগে করণীয়

ঈদের দিন গরু জবাই করার ৬-১২ ঘণ্টা আগে থেকে পানি ছাড়া অন্য কোনো খাবার দেওয়া ঠিক নয়। গরু যেহেতু জাবরকাটা প্রাণী, খাবার দিলে তার হজম প্রক্রিয়া চলমান থাকে। জবাইয়ের আগে পর্যন্ত খাবার দিয়ে গেলে ওই গরুর মাংসটা মারা যেতে সময় লাগে বেশি। ১০-১২ ঘণ্টা আগে খাবার বন্ধ করে দিলে তার হজম প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়, ফলে মাংসটা দ্রুত মরে এবং মাংসের স্বাদ বৃদ্ধি পায়। এ সময় শুধু পানি খাওয়ালে চামড়া ছাড়ানো অনেক সহজ হয়।

এর আগে নরমাল খাবার যেমন শুকনো খড় দিলে দৈনিক গরুর শারীরিক ওজনের (বডি ওয়েট) ২ দশমিক ৫ শতাংশ দিতে হবে। সবুজ ঘাস খাওয়ালে শারীরিক ওজনের ৪ শতাংশ দিতে হবে। ভুসি, খৈল দিলে ১-২ শতাংশ এবং নিয়মিত লবণপানি খাওয়ানো।

পশুর শোয়ানোর পদ্ধতি ও মৃত্যু নিশ্চিত করার উপায়

গরু শোয়ানোর সময় জোরজবরদস্তি করে শোয়ানো হয়। এতে করেও মাংসের গুণাগুণে প্রভাব পড়ে। জোর করে শোয়ানো হলে গরু ভয় পায়, এতে করে হরমোন ঠিকমতো প্রবাহিত হয় না ফলে মাংসের স্বাদ কমে যায়, মাংস পানি ধরে রাখতে পারে না। শোয়ানোর ক্ষেত্রে সমতল মাটিতে শোয়াতে হবে, যেখানে ইট বা পাথরের কণা নেই। জবাই করার ক্ষেত্রে আমরা আরেকটা যে ভুল করি তা হলো, একটা পশুর সামনে আরেকটা পশু জবাই করা। এটি একটি অমানবিক কাজ। একটা পশু জবাই করার সময় অন্য পশুকে আড়ালে রাখতে হবে।

গরু জবাই করার পর করণীয় হলো, ১০-১৫ মিনিট গরুকে স্পর্শ না করা। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার আগে পর্যন্ত এটার স্নায়ুরজ্জুতে আঘাত করা বা গোড়ালু কেটে দেওয়া যাবে না। গরুর মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হওরার উপায় হলো, গরুর শরীর থেকে কালচে জমাট বাঁধা রক্ত বের হবে, রক্তে বুদবুদ দেখা যাবে। জবাই করার ১০-১৫ মিনিট পর বুকে চাপ দিলে কালচে রক্ত আসবে, রক্তে বুদবুদ দেখা যাবে।

গরু জবাই যেন হত্যা না হয়ে যায়

বাংলাদেশের ৭০-৮০ শতাংশ মানুষের গরু জবাই-ই সঠিকভাবে হয় না। আমাদের দেশে গরু জবাই করার সময় গলার ধমনি-শিরা কাটার পরপরই ছুড়ির সুচালো অংশ দিয়ে গলার হাড়ে খোঁচা দেওয়া হয়। এতে করে গরুটা জবাই না হয়ে হত্যা হয়ে যায়। গরুর গলার এই হাড়ের ভেতরে স্নায়ুরজ্জু (স্পাইনাল কর্ড) থাকে, যা দিয়ে মস্তিষ্ক থেকে সারা দেহে বার্তা প্রবাহিত হয়। আমরা গরুটা জবাই করার পর গরুর মস্তিষ্ক থেকে স্নায়ুরজ্জুর মাধ্যমে রক্তক্ষরণের একটা সিগন্যাল সারা দেহে পৌঁছায়। আমাদের দেশে গরুর মৃত্যু দ্রুত নিশ্চিত করার জন্য স্নায়ুরজ্জুতে আঘাত করা হয়। এতে করে রক্তক্ষরণের সিগন্যাল বাধাগ্রস্ত হয় এবং রক্তক্ষরণ অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া স্নায়ুরজ্জুতে আঘাত করার ফলে পরুর স্বাভাবিক মৃত্যু না হয়ে ব্রেইন স্ট্রোকের মাধ্যমে গরুর মৃত্যু হয়। আবার গরুর মৃত্যু হওয়ার আগেই পায়ের গোড়ালি কেটে দেওয়া হয়। এতে করেও এটা কোরবানি না হয়ে হত্যা হয়ে যায়। স্ট্রোক করা এই গরুর মাংস খেলে মানুষের শরীরে প্রায় ১৮ ধরনের রোগবালাই হয়। কোরবানি করার ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান হলো, পশু যেন কষ্ট না পায়। স্নায়ুরজ্জুতে আঘাত করলে গরুর জবাই শুদ্ধ হয় না এবং মাংসের ভেতরে রক্ত থেকে যায়, খাওয়ার সময় ভালো স্বাদ পাওয়া যায় না।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

আমাদের দেশে খালে-বিলে, কিংবা ঝোপঝাড়ে বর্জ্য ফেলা হয়। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ দূষণ ঘটে। ফেলে রাখা এই বর্জ্যে বিভিন্ন অনুজীব জন্মায়। খোলামেলা ফেলে রাখলে কুকুর-বিড়াল সেখানে গিয়ে খাবার খোঁজে, গৃহপালিত হাঁস-মুরগিও সেখানে যায়। হাঁস-মুরগি কিংবা কুকুর-বিড়ালের মাধ্যমে বিভিন্ন সেসব অনুজীব মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হলো, এটি গর্ত করে মাটিচাপা দিয়ে দিতে হবে।

মাংস সংরক্ষণ

এখন সাধারণত সবাই ফ্রিজেই মাংস সংরক্ষণ করে, শুকানো হয় না। ফ্রিজে রেখেই প্রায় ১২-১৫ মাস সংরক্ষণ করা যায়। যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ সুবিধা নেই, সেখানে মাংস শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close