রণজিৎ মোদক

  ১২ আগস্ট, ২০২২

সাহিত্যের জমিদার

বাঙালি মনীষার এক আশ্চর্য প্রকাশকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তার জাদুকরী প্রতিভার স্পর্শ লাগেনি। বাংলা সাহিত্যে তিনিই একমাত্র নোভেল বিজয়ী কবি

‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই ঘাটে’ বৈশাখে খড় তপ্তময় পৃথিবীতে এসেছিলেন, স্বর্গীয় প্রেমিক পুরুষ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বর্ষণ-মুখর মেঘে ঢাকা, ২২ শ্রাবণে তিনি চির বিদায় নিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের কুঞ্জে ফুল ফুটিয়ে রেখে গেলেন, এ ফুল অক্ষয় অমর পারিজাত। চিরদিন বাংলা বাঙালি এমনকি সাহিত্যপ্রেমী বিশ্ববাসীর মধ্যে গন্ধ বিলিয়ে যাচ্ছে। এ আসা-যাওয়ার মাঝখানের সময়টুকু পঞ্জিকার হিসেবে ছিল ৮০ বছর। আশি বছর একটা মানুষের জীবনে কম সময় নয়। আশি বছরের অমূল্য সৃষ্টি তার বাংলা সাহিত্যের বিশাল ভা-ার রবীন্দ্র সাগরে অবগাহন না করলে, এ রতন আহরণ কারো সম্ভব নয়।

অথচ বিগত পাক-আমলে এক শ্রেণি এ দেশের বেতার টিভিতে রবীন্দ্রচর্চা বন্ধ করে দেন। কিন্তু রবীন্দ্রপ্রেমিক জ্ঞান-বুদ্ধারা তার বিপরীতে তীব্র প্রতিবাদ আন্দোলন করেন। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে তার লেখা গান আমাদের জাতীয় সংগীত- ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।

বাঙালি মনীষার এক আশ্চর্য প্রকাশকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তার জাদুকরী প্রতিভার স্পর্শ লাগেনি। বাংলা সাহিত্যে তিনিই একমাত্র নোভেল বিজয়ী কবি। কেউ কেউ তাকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনক বলে আখ্যায়িত করেন।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বাবা-মার চতুর্দশ সন্তান। বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মা সারদা দেবী। কলকাতা বিখ্যাত জোড়া সাঁকো ঠাকুর পরিবারে ১২৬৮ সালে ২৫ বৈশাখ (৭ মে ১৮৬৯) জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক রীতি অনুযায়ী ৪/৫ বছর বয়সে গৃহশিক্ষকের কাছে তার পড়াশোনা শুরু হয়। ছয় বছর বয়সে ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে ভর্তি হন। বছরখানেক পর নরমাল স্কুলে, তারপর বেঙ্গল অ্যাকাডেমিতে তিনি লেখাপড়া করেন। কলকাতার বিখ্যাত সেন্ট জেভিয়াস স্কুলে কিছুদিন লেখাপড়া করেন। কিন্তু স্কুলের বাধা-ধরা লেখাপড়ায় তার মন বসত না। বনের পাখি কখনোই খাঁচায় বন্দি জীবন চায় না। কবি ছিলেন মুক্ত মনের অধিকারী বনের পাখি। অভিভাবকরা তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তবে ব্যারিস্টারি পড়ানোর জন্য প্রথমে ব্রাইটন ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেড় বছর পড়াশোনার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরই মধ্যে তার সাহিত্য প্রতিভার উন্মেষ ঘটে এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী কাদম্বিনী দেবী রবীন্দ্রনাথকে খুব স্নেহ করতেন। প্রতিটি কবিতাণ্ডগল্প লেখে তিনি তার বৌদিকে দেখাতেন। বৌদির উৎসাহ আদরে রবীন্দ্রনাথ উৎসাহিত হয়ে কাব্যজগতে বিশাল স্থান করে নেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় ১৮৭৭ সালে মাসিক ‘ভারতী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। দাদা-বৌদির অনুপ্রেরণায় মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি ‘বনফুল’ নামে কাব্য রচনা করেন। এরপর কবি কাহিনি, সন্ধ্যা সংগীত প্রভৃতি কাব্য একের পর এক প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভানু সিংহের পদাবলি ছদ্ম নামে বহু কীর্তন লিখে গেছেন, তিনি বৈষ্ণব কবি চণ্ডী দাসের একটি গান বহু বছর পর সুর দিয়ে ছিলেন। ১৮৮২ সালে কলকাতার ১০ নম্বর স্ট্রিটে অবস্থানকালে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতাটি রচনা করেন।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, কবির এই ভবঘুরে জীবনের সমাপ্ত ঘটাতে ১৮৮৩ সালে কুষ্টিয়ার শিয়ালদহ এবং পাবনার শাহজাদপুরে ঠাকুর পরিবারের জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পল্লীর প্রকৃতি ও তৃণমূল-সংলগ্ন মানুষের মধ্যে এসে তার সৃষ্টিকর্ম নতুন সমৃদ্ধি লাভ করে। সোনার তরী, চিত্রা, মানসী বিখ্যাত কাব্যগুলো এ সময় রচনা করেন। এ সময় তিনি তার নিজের বিরুদ্ধেই ‘দুই বিঘা জমি’ শ্রেষ্ঠ কবিতাটি লেখেন। জমিদারি দেখতে এসে সাহিত্যের জমিদার হয়ে ওঠেন। জমিদারের অর্থ না পাঠানোর জন্য কৈফিয়ত চাওয়া হলে, তিনি উত্তরে বলেন, আমি ঠাকুর পরিবারের অমরত্বের দায়িত্ব পালন করেছি। রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের মাঝে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সুখণ্ডদুঃখের জীবন মূর্ত হয়ে উঠেছে। বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই সেখানে প্রবেশ না করেছেন। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, গান, প্রবন্ধ, পত্র সাহিত্য, অনুবাদ, ভাষণ ও সাহিত্য, নন্দনতত্ত্ব, চিত্রকর্মসহ বহুমাত্রিক রচনা-সম্ভার দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের সাহিত্য জগৎ। সংগীতের গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠ তার নিজেরই, যা রবীন্দ্রসংগীত বলে উল্লিখিত।

কবির ৫০ বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে ১৯১১ সালে কবিকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ দেশবাসীর পক্ষে সংবর্ধনা প্রদান করেন। অন্যদিকে নিজের অনুবাদ করা এবং ইংরেজি কবি ডব্লিউ বি ইয়েট’স-এর ভূমিকা লেখা ‘গীতাঞ্জলি’ প্রকাশিত হলে ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

কলকাতাবাসী কবিকে সংবর্ধনা দেন। কবি তাদের সংবর্ধনা সমন্ধে বলেন, আপনাদের দেওয়া এ সংবর্ধনা আমার ওষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায়নি। কারণ আমি গীতাঞ্জলি বাংলায় লিখেছি, তখন এ দেশের মানুষ মূল্যায়ন করেনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব ল’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯১৯ সালে জালিয়া নওরালাবাগ হত্যাকাণ্ডের কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজদের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি পরিত্যাগ করেন।

রবীন্দ্রনাথ শুধু কবিই ছিলেন না, তিনি সমাজ উন্নয়নে সমবায় আন্দোলন, কৃষি উন্নয়ন, রাজনীতি, সংস্কৃতি নানা ক্ষেত্রে অবদান রেখে গেছেন। ১৯২১ সালে ‘বিশ্ব ভারতী’ ও ১৯২২ সালে ‘শান্তি নিকেতন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই মহান কবিকে নিয়ে কত ঘটনা কত রটনা। রবীন্দ্রনাথ বিচিত্র ও বহুমুখী হলেও তার প্রধান পরিচয় তিনি কবি। সত্য সুন্দর কল্যাণই তার আদর্শ। সীমার মধ্যে তিনি অসীমের সন্ধান করেছেন। ছোটবেলায় পড়ায় ফাঁকি দিতে গিয়ে শীতের সকালে নাগরা জুতায় জল ভরে খোলা ছাদে বেড়িয়েছেন। সুস্থ সুন্দর নীরোগ দেহের অধিকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৃদ্ধ বয়সে ‘অ্যাপেন্টিসাইড’ অপারেশন করার কিছুদিন পর ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বাংলা, ৭ আগস্ট ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ৮০ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতায় পরলোক গমন করেন। তার অজস্র সৃষ্টি আমাদের শিল্প-সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে রয়েছে। তারই লেখা দুটি গান বাংলাদেশ-ভারতের জাতীয় সংগীত। বাংলা-বাঙালি ও বিশ্ববাসীর ভালোবাসায় অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর...

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close