রাকিবুল রকি

  ০৩ ডিসেম্বর, ২০২১

‘পূরবী’ কাব্যের ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতা

রবীন্দ্রসাহিত্যের দিকে তাকালে বিস্মিত হতে হয়- এত বাঁক, এত বৈচিত্র্য দেখে। এসব বাঁক বা বৈচিত্র্যের সঙ্গে কোথাও হয়তো স্থানমাহাত্ম্য জড়িয়ে আছে বা বলা চলে তার সৃষ্টির পেছনে বিভিন্ন জায়গার কিছুটা হলেও গুরুত্ব রয়েছে। কেননা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি ছেড়ে পূর্ববঙ্গে যদি না আসতেন, তাহলে হয়তো তার অসাধারণ ছোটগল্পগুলো- ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, ‘চৈতালী’ প্রভৃতি কাব্য পেতাম না। এখানে লক্ষণীয় ‘সোনার তরী’ কাব্যকে যে-কেউই রবীন্দ্রকাব্যের একটি বাঁক বলে গণ্য করবেন। তেমনি ‘বলাকা’ কাব্য রবীন্দ্রনাথের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি বা বাঁক। মাহবুবুল আলমের ভাষায় ‘বলাকা’, ‘পূরবী’, ‘মহুয়া’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে চতুর্থ পর্ব বিকাশ পেয়েছে।’ ‘গতিতত্ত্ব’কে রবীন্দ্রনাথ প্রথম এ কাব্যে সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন। ‘বলাকা’র পর রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য কাব্য ‘পূরবী’। ‘বলাকা’ প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে আর ‘পূরবী’ প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে। এরই মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটো কাব্য প্রকাশিত হয়। ‘পলাতকা’ এবং ‘শিশু ভোলানাথ’।

রবীন্দ্র-রচনাবলিতে ‘পূরবী’ কাব্যের গ্রন্থপরিচয়ে লেখা হয়েছে, ‘গ্রন্থটি দুই অংশে বিভক্ত। ১৩২৪-১৩৩০ সালে রচিত কবিতা ‘পূরবী’ অংশে ও ১৩৩১ সালে ইয়োরোপে ও দক্ষিণ আমেরিকায় ভ্রমণকালে লিখিত কবিতা ‘পথিক’ অংশে সংকলিত হয়েছে।’ তবে প্রমথনাথ বিশীর মতে ভ্রমণকালে লিখিত ষাটটি কবিতাই ‘পূরবী’ কাব্যের প্রধান অংশ। তিনি লিখেছেন, ‘পূরবী কাব্যের প্রধান অংশ লিখিত হয় কবির দক্ষিণ আমেরিকা যাত্রাকালে, দক্ষিণ আমেরিকায় ও তথা হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে। অর্থাৎ ইহা সমুদ্রের ওপরে ও সমুদ্রপারে লিখিত কাব্য। প্রথমদিকে বিভিন্ন সময়ে লিখিত ষোলোটি কবিতা আছে, যাহার মধ্যে চার-পাঁচটি মাত্র পূরবীর বিশিষ্ট সুরে বাঁধা।’ তার মতে প্রথম ষোলোটি কবিতা ‘পূরবী’ কাব্যের ভূমিকা হিসেবে মেনে নেওয়া যায়। আমাদের আলোচ্য ১৩২৪-১৩৩০ সালের মধ্যে লিখিত কবিতাগুলোর মধ্যে একটি কবিতা। ‘পূরবী’ কাব্যের চতুর্থসংখ্যক কবিতা সেটি। শিরোনাম ‘পঁচিশে বৈশাখ’। কবিতাটি লেখা হয়েছিল ১৩২৯ সালের ২৫ বৈশাখে। আমরা জানি, ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। ১৪২৮ বঙ্গাব্দে বসে ঠিক ৯৯ বছর আগে অর্থাৎ ১৩২৯ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনে নিজের জন্মদিন নিয়ে কী ভাবনা ছিল, সেটি বোঝার জন্য ‘পূরবী’ কাব্যের ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতার বিকল্প নেই। এ ছাড়া মনে রাখতে হবে, তিনি তখন একষট্টি বছর অতিক্রম করেছেন। এই যে বালাই ষাট পেরিয়ে আসার পর তার নিজের সম্বন্ধে ভাবনা, নিজের জন্মদিবস সম্পর্কে অনুভূতি সেটা কিছুটা হলেও এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।

মুক্তক অক্ষরবৃত্তে লেখা কবিতাটি বিন্যস্ত হয়েছে আটটি স্তবকে। প্রথম স্তবকটি মাত্র সাত লাইনের। সেখানে তিনি লিখেছেন- ‘রাত্রি হল ভোর।/আজি মোর/জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,/প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি/হাতে করে আনি/দ্বারে আসি দিল ডাক/পঁচিশে বৈশাখ।’

প্রথম স্তবকে দেখতে পাচ্ছি, রাত শেষ হয়েছে, ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হচ্ছে নতুন একটি দিন, নতুন তারিখ। প্রসঙ্গত মনে রাখতে হবে, খ্রিস্টীয় তারিখ শুরু হয় রাত বারোটা থেকে কিন্তু বাংলা তারিখ শুরু হয় সকাল শুরু হওয়ার সময় থেকে। সেই নতুন দিন, নতুন তারিখণ্ড পঁচিশে বৈশাখ কবিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে জন্মদিনের কথা।

দ্বিতীয় স্তবকে এঁকেছেন প্রকৃতির চিত্র। ‘দিগন্তে আরক্ত রবি’। তখনো ছায়া ঢাকা অরণ্য। কবির মনে তা বিষণœ ভৈরবীর সুর বাজিয়ে যাচ্ছে। ‘শাল-তাল-শিরীষের’ পাতার মর্মরে মনে হচ্ছে বনের ধ্যান ভাঙছে। অর্থাৎ সকালের একটি চিত্র পাই স্তবকে। দ্বিতীয় স্তবকটি শেষ হয়েছে একটি চমৎকার উৎপ্রেক্ষার মাধ্যমে। লিখেছেন, ‘রক্তপথ শুষ্ক মাঠে,/যেন তিলকের রেখা সন্ন্যাসীর উদার ললাটে।’

তৃতীয় স্তবকে জানান দিচ্ছেন, প্রতি বছর নানাভাবে, নানান রূপে এই দিনটি ফিরে আসে। আমের বনে, তালের নতুন পাতার গুচ্ছ নাড়িয়ে এক দিন এসে হাজির হয় কালবৈশাখী। উন্মত্ত বন্ধহীন। এই দিন যেন কবির কাছে প্রাণদেবতা নিজহাতে সাজানো নীল আকাশের থালা উপহার নিয়ে আসে। যে থালায় রাখা আছে ‘ভুবনের উচ্ছলিত সুধার পিয়ালা।’ চতুর্থ স্তবকে কবির মনে হচ্ছে, আজকের সকাল ‘যে অনন্ত সমুদ্রের শঙ্খ’ হাতে করে নিয়ে এসেছে তারই ‘নির্ঘোষ’ কবির বুকের মাঝে ক্ষণে ক্ষণে বাজছে। কবি যে ‘জীবনস্মৃতি’তে বলেছেন, ‘আমার তো মনে হয় আমার কাব্যরচনার এই একটিমাত্র পালা। সে পালার নাম দেওয়া যাইতে পারে সীমার মধ্যে অসীমের সহিত মিলনসাধনের পালা’। এখানে তারই প্রতিধ্বনি পাই। ফলে জন্মমৃত্যুর সুতোয় ঘেরা যে জীবন, সে জীবন জন্মমৃত্যু থেকে অনেক ঊর্ধেŸ উঠে গেছে। তাই ‘আলোর অসীম সংগীত’ কবির মনে ঝংকার তুলছে, ‘সুরে সুরে রণিত’ হচ্ছে তন্ত্রীতে। পঞ্চম এবং ষষ্ঠ স্তবকে দেখি, আজকের দিন অর্থাৎ পঁচিশে বৈশাখ জানিয়ে যাচ্ছে কবিকে, এক দিন অসংখ্যের মধ্যে কবি নতুন হয়ে এসেছিল এই পৃথিবীতে। সেই নতুনকে জাগাতেই তার জন্মদিবস আবার ফিরে এসেছে। তার জন্মের সময় সে যেমন নতুন ছিল, সে যেন আবার তেমন নতুন করে হাজির হয়। তেমন করেই যেন জন্ম নেয়। কবিকে বলছে, ‘হে নূতন,/দেখা দিক্ আরবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।’ কবিকে জানাচ্ছে, তার প্রথম জন্ম ক্ষয়হীন। নির্ঝর যেমন প্রতি মুহূর্তে জন্ম নেয়, সাগরের বুকে ঢেউ যেমন প্রতিক্ষণে নতুন করে উথলে ওঠে- কবির জীবনও যেন তাই। তাই তাকে ‘হে নূতন’ বলে সম্বোধন করে বলছেন, ভস্ম থেকে যেমন আগুন জ¦লে ওঠে, কবির জাগরণ যেন তেমনি হয়। অষ্টম স্তবকেও দেখি, পঁচিশে বৈশাখের নতুন দিন তাকে বলে যাচ্ছে, সূর্য যেমন কুয়াশা, অন্ধকার দূর করে, কবির প্রকাশও যেন সেই সূর্যের মতো হয়। হয় যেন বসন্তের মতো। যে বসন্ত শূন্যডাল পাতায়, পাতায়, ফুলে, ফুলে ভরিয়ে তোলে। কবির মাঝে যেন ফুটে ওঠে জীবনের জয়, ‘অনন্তের অক্লান্ত বিস্ময়।’ কবিতার শেষ স্তবক অর্থাৎ অষ্টম স্তবক খুবই ছোট। মাত্র চার লাইনের- ‘উদয়দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে।/মোর চিন্ত-মাঝে/চির-নূতনের দিল ডাক/পঁচিশে বৈশাখ।’

পুব আকাশে যেন আলোর শঙ্খ বাজছে। এই অভিষেকের সময় কবির মনে ‘চির-নূতনের ডাক’ দিয়ে গেল পঁচিশে বৈশাখ। প্রকৃতপক্ষে আমরা যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কর্ম লক্ষ করি, দেখতে পাব- তিনি সারাজীবনই কর্মে কিংবা সৃজনে ছিলেন চির-নূতনের বার্তাবাহক। বলতে দ্বিধা নেই, পঁচিশে বৈশাখ যে ‘চির-নূতনের’ ডাক দিয়ে গেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই সেই ‘চির-নূতন’। ‘চির-নূতন’ তাই ভাঙতে চেয়েছেন অচলায়তনকে। দুঃখের বিষয়, তাকে ঘিরেই আজ কেউ কেউ তৈরি করেছেন অচলায়তন। তিনি নিজেও হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, তাই ‘শেষের কবিতা’য় অমিতকে দিয়ে বলিয়েছেন, ‘রবিঠাকুরের লেখা যতক্ষণ না লোকে একেবারে ভুলে যাবে, ততক্ষণ ওর ভালো লেখা সত্য করে ফুটে উঠবে না।’

পঁচিশে বৈশাখ প্রতি বছর এসে বাঙালিকে মনে করিয়ে দেয় সেই চির-নূতন কবির কথা। এখন আমাদেরই দায়িত্ব সেই চির-নূতনকে অনুধাবন করার, ধারণ করার।

পরিশেষে আরেকটি তথ্য জানানো যেতে পারে। একই বিষয়কে একই মাধ্যমে অথবা ভিন্ন মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ নতুন করে রূপ দিয়েছেন অনেকবার। প্রসঙ্গত বলা যায়, ‘রাজর্ষি’কে তিনি ‘বিসর্জন’ নাটকে রূপান্তরিত করেছেন, ‘অচলায়তন’ নাটককে সহজে অভিনয়যোগ্য করে তোলার জন্য ‘কিঞ্চিৎ রূপান্তরিত এবং লঘুতর আকারে’ প্রকাশ করে নাম দিয়েছেন ‘গুরু’। তেমনি কবিতাকেও রূপান্তরিত করেছেন গানে। ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতাকে সংক্ষিপ্ত করে, কিছুটা ঘঁষেমেজে তৈরি করেছিলেন একটি গান। ১৩৪৮ সালের ২৩ বৈশাখে। ছোট এ গানটি খুবই পরিচিত; মাত্র দশ লাইনে ধারণ করেছে দীর্ঘকবিতার মূল বক্তব্য। লেখাটি শেষ করার আগে গানের প্রথম চার লাইন উদ্ধৃত করছি- ‘হে নূতন/দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ/তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদ্ঘাটন/সূর্যের মতন।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close