অনলাইন ডেস্ক
  ২০ নভেম্বর, ২০২০

বহুমাত্রিকতায় প্রাণজাগা প্রবাদপ্রতিম

জোবায়ের মিলন

রাজকোটের সান্ধ্যরং আর মিউনিখের সান্ধ্যরং এক না। কাঁটাসুরের বিকাল আলোর সঙ্গে মিল নেই সিডনির বিকাল আলোর। সুনীলের সঙ্গে মিল নেই জর্জ বায়রনের, কিটসের সঙ্গে মিল নেই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের। নাজিম হিকমতের সঙ্গে তাই মিলে না শেলির। প্রত্যেকের অবয়ব-রং আলাদা। ভেতর-বিন্যাস ভিন্ন। তাই কবিতা বহু রঙের, বহু রকমের। বহু হাতে প্রস্ফুটিত গোলাপ।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে যারা জানি, সত্যজিৎ রায়ের সেই ‘অপুর সংসার’ থেকে ‘শেষবেলা’ অব্দি এক তুখোড় অভিনেতা; তার ফাঁকে যারা জানি, প্রমিত উচ্চারণের অনন্য বাচিকশিল্পী, নাট্যকার, নির্মাতা ও মঞ্চ সংগঠক। অনেকে জানি না, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একজন আপাদমস্তক কবিও। পর্দার এই গুরুগম্ভীর রসোদ্দীপ্ত চঞ্চল মানুষটি কবিতায় সুদীর্ঘ চর্চা-পথের এক প্রণম্যপূজারি। নাটকে, সিনেমায়, আবৃত্তিতে, নির্মাণে, রুপালি পর্দায় সুঠাম উপস্থিতি আর দাপুটে অভিনয়ের আড়ালে কবিতায় মমত্ববোধের উপস্থাপন মøান থাকলেও সে অধ্যবসায় উজ্জ্বল। তিনি কবিতাকে নিয়ে চলেছেন নিভৃতে, নিজের ভেতর-সত্তার সঙ্গে সমান ও সমন্বয় করে। তাই শিল্পের সঙ্গে সাহিত্যকে পোষণ করে কবিতাও লিখেছেন সারাটা জীবন।

------
হয়তো তাচ্ছিল্য লাগতে পারে। হয়তো পেছনে পড়ে থাকা কোনো চর্চাকে টেনে সামনে আনার চেষ্টা মনে হতে পারে। বিস্ময়ের বিষয় এই, তার আটশো পৃষ্ঠার কবিতার বই (কবিতা সমগ্র, ২০১৪, আনন্দ পাবলিশার্স) সহজ কোনো কবির প্রমাণ নয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনয়ের ফাঁকে, নির্মাণের ফাঁকে যে সময় কুড়িয়ে পেতেন, সে-কুড়িয়ে পাওয়া সময়ের কবি নন বলেই পরিশ্রমসাধ্য এ কাজ সম্ভব হয়েছে প্রাণের প্রাণবন্ত ইচ্ছায়, বোধের কোরকে জাগ্রত তাড়ার তাগিদে। অন্যথায় তা অসম্ভব। কবিতা তার কাছে সময় পার নয়, অস্তিত্বের অভ্যন্তরে প্রগাঢ় সাধনা। দায় ও দায়িত্বের প্রতিফলন।

কবিতার জগতে সৌমিত্রের স্থান হুট করে নয়। বাংলা সাহিত্যে পড়া ছাত্রাবস্থাতেই তার ভেতরে হয়েছে কবিতার বীজ রোপা। তা যতœ করে তিনি ধীরে ধীরে ফলিয়েছেন কবিতার শত-সহস্র চারা। একে একে রচনা করেছেন কবিতার ফসল। গ্রন্থাকারে তা সংগৃহীত হয়েছে বছরে বছরে। কেউ জেনেছে, কেউ হয়তো জানেনি। কেউ হয়তো শুনেছে, কেউ হয়তো শোনেনি। তাতে কবি সৌমিত্রের যায়-আসেনি কিছুই। তার আঙুলের নিব চলেছে। অভিনয় তো খোলস, খোলসের বাইরে-কবিতায় সত্যি সৌমিত্র উপস্থিত হতে চেয়েছেন। হয়েছেন। ‘এক এক দিন/একটা নদী জেগে ওঠে এই দেহটার মধ্যে/কূল ভেঙে দেয়/নিরাপদ যা কিছু ছিল খরস্রোতে ভাসে।/এক এক দিন/নদী জেগে ওঠে ডমরু বাজিয়ে/তোমারও ঘুম ভাঙাতে চায়/বসন্তের গানও সেদিন বুঝি বলতে চায়/যেদিন থাকবো না সেদিনও ভালোবাসবো।/স্মৃতিও এক এক দিন সত্যি হয়ে ওঠে।’ (এক এক দিন)।

কবিতায় ব্রত ছিলেন সৌমিত্র। শিল্পিত বহু কাজের চর্চায় কবি সৌমিত্র কবিতা নিয়ে এসে দাঁড়াননি সামনের সারিতে; বহুমাত্রিকতার সঙ্গে কবিতাকে চালিয়েছেন কালের খেয়ালি ভেলায়। তিনি ভাঙতে চাননি। তিনি নাড়া দিতে চাননি। পাহাড়-চূড়া থেকে কেবল সবুজ ঘাস ছুঁয়ে মেঘের আবির গলিয়ে মাটিতে মিশতে চেয়েছেন আপন সংগীত বাজিয়ে। তাই তিনি রচনা করেছেন, ‘...ভারী, দামি পাথরের টুকরো মতো সময়কে/ঢালু জমির ওপর গড়িয়ে যেতে দেখেছি/জলের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে,/অনতিপ্রদোষের মধ্যে/সব ছবিগুলো ডুবে যাবে/ঝিল, জলের ভেতরে ছায়া আকাশনিমের।’ (পড়ন্ত ছায়ার মধ্যে)।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কবিতায় জাগ্রত কবিয়াল প্রাণ। তিনি দিন শেষে কবিতার কাছে ফিরে আসা ভোরে কবিতা থেকে বের হয়ে আহারের খোঁজে উড়ে যাওয়া শালিক পাখি। তার অন্দরে ‘কবিতা’ সর্বদা বেজে চলা মিউজিক। কর্মোদ্দীপনা। কবিতায়ই তিনি সহজ মানুষ। ভালোবাসায় বিগলিত শিল্পিত ছবি : ‘ভালোবাসা মানেই কেবলই যাওয়া/যেখানেই থাকি না কেন/উঠে পড়া/পেয়ে গেলে নিকটতম যান।/কলকাতা কিছুতেই ফুরতে চায় না/কোনো রাস্তা ফুরতে চায় না/কখনো তুমি মিনিবাস ধরে নেবে/আমি ঝংকার দেওয়া ট্রামÑ/তারপর থেকে কেবলই যাওয়া/কাছ থেকে অনেক দূর/কিংবা সময় ঠিক করা থাকলে কাছে আসা।’ (ব্যক্তিগত নক্ষত্রমালা)।

নিভৃতে কবিতা চাষ করা কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম কবিতার বই ‘জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াব বলে’ প্রকাশ পায় ১৯৭৫ সালে। ৫৪টি কবিতার সেই সংকলন প্রথম প্রকাশ করেছিল ‘অন্নপূর্ণা পাবলিশিং হাউজ’। প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন ‘সত্যজিৎ রায়’। তারপর একে একে বহু কবিতার বই; ‘শব্দেরা আমার বাগানে’, ‘পড়ে আছে চন্দনের চিতা’, ‘হায় চিরজল’, ‘ব্যক্তিগত নক্ষত্রমালা’, ‘পদ্মবীজের মালা’, ‘হে সায়ংকাল’, ‘জন্ম যায় জন্ম যাবে’, ‘হলুদ রোদ্দুর’, ‘মধ্যরাতের সংকেত’, ‘যা বাকি রইল’ ইত্যাদি। কবি সৌমিত্রের কবিতা প্রকাশ ছিল অনিয়মিত কিন্তু তার কবিসত্তা ছিল প্রবাহমান। নায়ক সৌমিত্র যেমন কিংবদন্তি, কবি সৌমিত্র হয়তো তেমনটা নন; তবু তার কবিতা অনেকের অন্তরে থাকবে চিরজাগরূক।

 

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়