কর্কট বৃক্ষে সবুজ শব্দ সৃজনে সৈয়দ শামসুল হক

প্রণব মজুমদার

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

নিজের সৃজনে আনন্দ সে এক পরম প্রাপ্তি! এ চাওয়া মৃত্যুর কয়েক মুহূর্ত আগেও প্রত্যাশা করেন সৃষ্টিশীল ব্যক্তিরা। বিশেষ করে লেখকরা। শেষ মুহূর্তেও বাঁচার আকুতি সবার থাকে। বাংলা সাহিত্যের সব শাখা-প্রশাখায় প্রবল প্রতাপে সক্রিয় ছিলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। দৃঢ় মনোবলের দেশপ্রেমিক মানুষটি মৃত্যুর শেষদিনেও সৃজনের আনন্দে ছিলেন। চার বছর আগে ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি শেষ দুটি কাব্যগ্রন্থের নাম বলে গিয়েছিলেন। ‘কর্কট বৃক্ষে সবুজ শাখায়’ ও ‘উৎকট তন্দ্রার নিচে’।

ঢাকায় ফুসফুসে রোগ চিহ্নিত হয় ২০১৬ সালের এপ্রিলের শুরুতে। ১৫ এপ্রিল সব্যসাচী লেখক সস্ত্রীক উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান। সেখানে রয়েল মার্সডেন হাসপাতালে পরীক্ষায় ফুসফসে ক্যানসার ধরা পড়ে। প্রায় তিন মাস চিকিৎসায় কোনো সুরাহা হলো না। চিকিৎসকরা জানিয়ে দিলেন, তার জীবন আয়ু মাত্র ছয় মাস অবশিষ্ট! মাটির টান ও স্বদেশ প্রেম তাকে নিয়ে এলো দেশে। সেপ্টেম্বরে ভর্তি হন গুলশানের একটি হাসপাতালে। কর্কট রোগ শনাক্ত হওয়ার পর দুমাস লিখতে পারেননি। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, কর্কট রোগ ভালো হওয়ার নয়। সময় ফুরিয়ে আসছে দ্রুত!

লেখকের কাজ হচ্ছে লিখে যাওয়া। তিনিও সৃজনে নিমগ্ন থাকেন। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে প্রায় ২০০ কবিতা লিখেছেন। যুক্তরাজ্যের লন্ডনের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১২ জুন থেকে কবিতা লিখতে শুরু করেন হাতে-কলমে। এর আগে লিখতেন ল্যাপটপে। সর্বশেষ লেখাটি ছিল কবিতা। তা লিখেন ঢাকায়, ২০১৬-এর ১৩ সেপ্টেম্বর। এরপর তিনি মুখে বলেছেন সার্বক্ষণিক সঙ্গী সহধর্মিণী আনোয়ারা সৈয়দ হককে। আনোয়ারা তা কাগজে লিপিবদ্ধ করেছেন। তবে কী লিখেছেন সব্যসাচী লেখক তা শুনতে চাননি। কবি চলে যাচ্ছেন অস্তাচলে! নিজের হাতে লেখার শক্তিটুকু রহিত হয়ে গেছে। তারপরও দৃঢ় মনোবলে অন্তিম শয্যায় মাত্র ন-দিনে ৩৩টি কবিতা মুখে মুখে রচনা করে গেছেন তিনি।

সৈয়দ হকের যাপিত জীবন ছিল নিরন্তর শব্দ জগতে। কি কবিতা, ছড়ায়, গল্প উপন্যাসে, প্রবন্ধে, কলাম লেখায়, অনুবাদ সাহিত্যে, শিশু সাহিত্য, চলচ্চিত্র, কাব্যনাট্য, নাটক, চিত্রনাট্যে, গানে, উপস্থাপনা আবৃত্তিতে; কি সাংবাদিকতায়। জীবনময় সাহিত্যের আরাধনায় সৃষ্টিতে সৈয়দ হক দেশকে ভরিয়ে দিয়ে গেছেন। তার শেষ দিনগুলোতে শব্দ হয়ে উঠেছে দ্যুতিময়। শব্দের সাধনা করে গেছেন যন্ত্রণাকাতর শয্যায় থেকেও। অন্তিম সময়েও জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়েছেন তিনি। যতক্ষণ পেরেছেন ততক্ষণ শব্দ সৃজন ছিল তার ব্রত। বাংলার রাজপথ, শহর, নগর ও গ্রাম-বাংলার মেঠোপথের আজন্ম প্রেমিক বুদ্ধিদীপ্ত ও স্মার্ট বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দ হক।

কর্কট রোগ সৈয়দ হককে থামাতে পারেনি। জীবনবোধের আধুনিক বুদ্ধিদীপ্ত শব্দ দিয়ে কাব্য মালঞ্চ সাজিয়েছেন। তার ‘শব্দই চিকিৎসিত করে’ কাব্যগ্রন্থের এমন সুনিশ্চিত ধারণা প্রকাশকারী তেজি নামকরণ নিঃসন্দেহে অপূর্ব! চিকিৎসিত শব্দটির ব্যবহার আমরা কমই দেখেছি। অথচ হাসপাতালে শয্যায় থেকে তার অপূর্ব শব্দবোধ গোটা কর্কট রোগের বিদ্যমান চিকিৎসাব্যবস্থার অসহায়ত্বকে ইঙ্গিত করে। সত্যিই তো, এ ব্যাধির চিকিৎসার উপকরণ রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি আক্রান্ত রোগীকে উপযুক্ত চিকিৎসিত করতে ব্যর্থ!

৬২ বছরের সুদীর্ঘ সাহিত্য জীবন তার। লেখালেখিতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হকের দুটি স্থানে সাদৃশ্য রয়েছে। সাহিত্যের শাখা-প্রশাখায় রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা সাহিত্যে তার মতো সৃজনশীল কোনো লেখককে সক্রিয়ভাবে আমরা পাইনি। কবিগুরুর মতো সৈয়দ হকের আয়ুষ্কাল ৮০!

মননকে উপযুক্ত ভাষা দেওয়ার অনুকরণীয় ক্ষমতা তার। চিরন্তন সত্য ও সুন্দরের মতো শব্দ দিয়ে মৃত্যুর পাশে শুয়ে আর কোনো কবি আমাদের মুঠো মুঠো কবিতা তো দেননি। সেসব সৃজন যুগ দর্শন। জীবন মহাকাব্য! ব্যাধি শনাক্ত হওয়ার পর প্রথম যেদিন তিনি কলম তুলে নিলেন, সেদিন কাগজে প্রকাশ হলো যাওয়ার প্রসঙ্গই। প্রথম পঙ্ক্তিই হলো‘মৃত্যুপরে মৃত্তিকায় এই দেহ প্রোথিত যখন...’। কাফনের চাদর ঢেকে দিতে চাইল কবিতাকে, শব্দে ভরে উঠতে চাইল লোবানের গন্ধ; নিঃশব্দে ধ্বনিত হলো কবর-সন্নিহিত ‘চল্লিশ কদম’। চিকিৎসার একাধিক ধাপ পেরিয়ে কবি স্বদেশে ফিরলে তার কবিতায় উঠে আসে নানা রকমের ভালোবাসার কথা। তার ভালোবাসা হলো স্বদেশ, সহধর্মিণী ও শব্দ-সহযাত্রী, মানে কবি। মাঝে-মাঝে কবিতায় এলো কর্কট প্রসঙ্গ। কর্কটের বৃক্ষডালে কর্কশতার সুরে পাখির ডাক শোনা গেল। ‘কর্কটের বিষবৃক্ষের ছায়ায়’ কবি লিখলেন ‘কর্কটের পুষ্পডালে সবুজ শব্দের/আবার উত্থান দেখে/আমিও উত্থিত প্রসন্ন এ ভোরে/এবার ঘুমোও তুমি শব্দফলে কর্কটের সবুজ শাখায়।’

প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালে সৈয়দ হককে দেখতে যান ১০ সেপ্টেম্বর। তিনি জানান, সব্যসাচী লেখকের চিকিৎসার সব দায়িত্ব তার। সুনির্দিষ্টভাবে নাম বা পরিচয় না থাকলেও ১২ সেপ্টেম্বরে লেখা কবিতায় আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই দেখতে পাই। কবি লিখলেন ‘একজন আমার পাশে/এসে বসলেন/মুখে তার অপরূপ/বাংলার ছবি/আমন ধানের গন্ধ/ঝরে পড়ছিল/...তিনি বললেন/এই সবুজ দেশ/আপনার অপেক্ষায়/আমার মায়ের কোলের ভেতরে/এই বাংলার ভেতরে/এই পৃথিবীর ভেতরে/আপনাকে বিদায়/নয়, স্বাগতম...।’ চিরপ্রস্থানের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে সৈয়দ হক তার শেষ কবিতা লেখেন। নাম ‘আহা, আজ কি আনন্দ অপার’। কবিতার প্রকরণ বিষয়ে শুদ্ধতাবাদী ছিলেন সৈয়দ হক এবং প্রচলিত ছন্দের বাইরে তিনি খুব বেশি হাঁটেননি। লন্ডনে লেখা কবিতায় চতুর্দশপদীর পাশাপাশি দীর্ঘ কবিতাও রয়েছে। সবই অক্ষরবৃত্তে রচিত।

শেষ ন-দিনের তেত্রিশটি কবিতাকে আমরা একটি দীর্ঘ কবিতা মনে করি। সৃজনে কবির পূর্বসূরি ও সমকালীন অল্প কজন কবির বিষয় ঘুরে ফিরে আসে। স্বদেশের জননীরূপে নদীগুলো বয়ে চলে। নারীর ভালোবাসা জোছনা ও শক্তি নিয়ে উপস্থিত হয় এখানে। শেষ যাত্রায় পথক্লেশে মৃত্যুদূতকে থামিয়ে দিয়ে এই যে ভালোবাসার জন্য ও ভালোবেসে শব্দসৃষ্টি, সেটি শব্দঘোরগ্রস্ত মানুষের জন্য এক পরম আশ্রয়। কবিপত্নীর ডাকনাম মঞ্জু। কবিতায় তাকে বলছেন, ‘তুমি হাত ধরে থাকলেই আমার বিশ্রাম।’ জাগতিক সংসারের কী মায়াবী প্রেমময় শব্দাবলি!

সারাক্ষণ সৃজনের আনন্দে মেতে থাকতে ভালো বাসতেন সৈয়দ হক। কর্কটের বিষবৃক্ষে তার অনুপম সৃষ্টি যেমন ছিল সবুজ, তেমনি সজীব। লন্ডনের হাসপাতালে শেষ সময়গুলো কেটেছে সার্বক্ষণিক সঙ্গী মঞ্জুর সঙ্গে গল্প বলে। কবিতা লিখে। কুড়িগ্রামে তার জন্মভিটায় ছেলেবেলার তারার মা ও সোনার মার গল্পও বাদ যায়নি। অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করতেন। এ যেন সাহিত্যের সৃজন। সৈয়দ হকের বড় আক্ষেপ ছিল উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের কালজয়ী নাটক ‘হ্যামলেট’ অনুবাদ সময়মতো করতে না পারা। এজন্য তাগিদও ছিল। লন্ডনে চিকিৎসাকালে ৩০ এপ্রিল সকালে নাট্যজন সারা যাকের ফোনে আনোয়ারা সৈয়দ হকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, সৈয়দ হক অনুবাদ লিখতে বসছেন কিনা। অসুস্থতার ধাক্কাটা একটু সামলে নিয়ে বসবেন বলে জানিয়েছিলেন আনোয়ারা। ঘাতক ব্যাধি নিয়েই পরে সৈয়দ হক হ্যামলেট অনুবাদ সম্পন্ন করেন।

বাংলা সাহিত্যে এমন লেখক নেই যিনি দুরারোগ্য কর্কট রোগ নিয়ে মৃত্যুযন্ত্রণাকে পাশে রেখে অবিরাম লিখেছেন। তাও আবার শরীরের ভয়ানক আক্রান্তস্থান ফুসফুস যন্ত্রণার ভেতর। দৃঢ় এই মনোবলের কারণেই সৈয়দ হককে নিয়ে কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই লিখেছেন উপন্যাস ‘হেমিংওয়ের সঙ্গে’।

 

 

"