ভাঙন

অলোক আচার্য

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

সাইনবোর্ডে লেখা ‘সু মিয়ার টি স্টল’। আসলে নাম নসু মিয়ার টি স্টল। নসুর ‘ন’ বর্ণ মুছে গিয়ে এখন শুধু ‘সু’ আছে। বহুদিনের পুরোনো সাইনবোর্ড দোকানের পাশের বটগাছের সঙ্গে আটকানো। কোনো এক ঝরে সাইনবোর্ড হেলে কাত হয়ে পড়ে আছে। সেটি আর সোজা করা হয়নি। তাতে নসু মিয়ার কিছু যায় আসে না। তার খরিদ্দারের অভাব হয় না। কারণ ওসমানপুর গ্রামের ভেতরে চায়ের দোকান বলতে এই একটাই। গ্রামের ছেলে-ছোকরারা চায়ের দোকানে খুব একটা আসে না। বড় কেউ থাকলে তো আরো না। মধ্যবয়সি থেকে বুড়ো সবার আড্ডা দেওয়ার জায়গা বলতে এই সু মানে নসু মিয়ার চায়ের দোকান। দোকানে চায়ের সঙ্গে সঙ্গে কয়েক পদের বিস্কুট আর পানও রাখা হয়েছে।

ওসমানপুর গ্রাম বেশি বড় নয়। হাতে গোনা মানুষের বসবাস। একপাশের মোল্লাবাড়ি থেকে শুরু করে শেষ দিকের পাগলা মতিনের বাড়ি পর্যন্ত একদমে বলে দেওয়া যায়। মূলত নদীভাঙা মানুষ সব হারিয়ে ওসমানপুরে এসে বসতি গড়ে তুলেছে। সবার কাহিনিই মোটামুটি একই রকম। এ গ্রামে একজন আরেকজনকে চেনে। মুখে মুখে চলে আসা কাহিনিতে শোনা যায়, ওসমান নামে কোনো একজন নদীতে সব হারিয়ে প্রথম মেঘনার বুকে জেগে ওঠা এই চরে বসতি গড়ে তোলে। তার দেখাদেখি একে একে সবাই এসে নতুন করে বাঁচতে শেখে। এই চর থেকে মূল ভূখ-ে যেতেও কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। গ্রামের বেশির ভাগই মাছ ধরে। কৃষিকাজও করে কেউ কেউ। ব্যবসা বলতে নসু মিয়ার চায়ের দোকান। আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকান।

এই গ্রামের একজন মাথা আছে। তার নাম শুকুর আলী। তাকে সবাই শুকুর আলী মেম্বার বলে ডাকে। এতে শুকুর বেশ খুশি হয়। কারণ সে মেম্বার না। টাকাপয়সা থাকায় তার কিছু চ্যালা আছে। তারাই শুকুরকে মেম্বার করে দেওয়ার ভূমিকা নেয়। তার জায়গা-জমি বিস্তর। দুই নম্বরি ব্যবসার কথাও গোপনে শোনা যায়। তাই প্রভাব-প্রতিপত্তিও বেশি এ গ্রামে। বেশির ভাগ দিনই তার এ-বাড়ি ও-বাড়ি বিচার-আচার থাকে। আজও আছে। আজ লতিফার বিচার। গ্রামের মানুষের চোখে নষ্ট মেয়েমানুষটার বিচারের খোশগল্পে নসু মিয়ার দোকানে তাই বেশি ভিড় জমে দুপুর থেকেই। রসের কথা জমতে থাকে এর-ওর মুখে।

লতিফার ঘর থেকে গতকাল ভোরে এক পুরুষ মানুষকে বের হতে দেখা গেছে। গ্রামের কারো চোখে পড়েনি লোকটাকে। তবে দেখেছে শুকুর আলী মানে শুকুর মেম্বার। যেহেতু শুকুর মেম্বার দেখেছে তাই বিশ^াস না করার কারণ নেই! তা ছাড়া লতিফা থাকে একা গ্রামের এক কোণে। পাগলা মতিনের বাড়ির কাছে। তিন কুলে কেউ নেই। স্বামী ছিল কিন্তু নদীর ভাঙনে সব হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তাকেও হারিয়ে ফেলেছে। বউকে ছেড়ে সেই যে কাজের খোঁজে শহরে গেল, আর ফিরল না। তারপর থেকে লতিফা একাই আছে এ গ্রামে। এর-ওর বাড়িতে কাজ করে পেট চালিয়ে নেয়। একা জোয়ান মেয়ে মানুষ আর কয়দিন ভালো থাকে! গ্রামের অনেকেরই চোখ লতিফার ওপর পড়েছে। অনেকেই লতিফাকে আগ বাড়িয়ে সাহায্য করতে চেয়েছে। লতিফা সেসব সাহায্যের অর্থ বোঝে। পুরুষ মানুষের দৃষ্টি চিনতে লতিফার অসুবিধা হয় না। শরীর, সবই শরীরের খেলা। স্বামী পরিত্যক্তা লতিফা কাউকে সে সুযোগ আজ পর্যন্ত দেয়নি। দিতেও চায় না। সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করছে শুকুর মেম্বার। গ্রামের মানুষ তাকে খুব মান্য করে। তাই বলে কোনো লাভ হবে না ভেবে কারো কাছে কিছু বলেনি। বহু দিন বহুভাবে শুকুর আলী তাকে কু-প্রস্তাব দিয়েছে। গ্রামের অনেকেই বিষয়টি জানে। কিন্তু কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। সেদিন মাস্টারবাড়ি কাজ করতে যাওয়ার পথে খালের পাড়ে শুকুর আলীর সঙ্গে দেখা। লতিফা মানুষটাকে এড়িয়ে যেতেই চাচ্ছিল। কিন্তু গায়ে পরেই ডাক দিল লোকটা। ‘কই যাও লতিফা?’ কথা শুনে পিত্তি জ্বলে লতিফার। ধাইড়্যা ব্যাটা সব জানে। তাও আগ বাড়িয়ে কথা বলতে চায়। কিন্তু লতিফার কিছু করার নেই।

জি চাচা, কাম করবার যাই। ‘সে তো করবাই। এদিকে আসো। দুইটা সুখ-দুঃখের খবর নিই।’ গরিবের আবার সুখ-দুঃখ। বাদ দেন চাচা। ‘আরে বাদ দেব ক্যান? আসো এদিকে। মন খুলে দুইটা কথা কইলেই মনটা হালকা হয়া যায়।’ মন হালকা করনের কাম নাই চাচা। আগে প্যাট ভরার চিন্তা করি। ‘বারবার চাচা ডাকো ক্যান। আমার বয়স তো অহন বেশি হয় নাই। এই ধরো...।’ আমি যাই চাচা। ‘তা যাও। সন্ধ্যার পর বাড়িত আমুনে। ম্যালা দিন সুখ-দুঃখের গল্প করা হয় না তোমার লগে। আইজ করুমনে।’ লতিফা আর কথা না বাড়িয়ে মাস্টারবাড়ির পথ ধরে। শুকুরের মতলব সে বেশ ভালোই বোঝে।

সন্ধ্যার পর শুকুর মেম্বারের বাড়িতে বিচার বসে। বিচারে তার সাথে আট-দশজন মুরব্বিগোছের লোক বসে। বাকিরা গ্রামবাসী। সারা বাড়িতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। লতিফার বিচার দেখার জন্যই হোক আর শুকুর মেম্বারের মুখে সেই রসের কাহিনি শোনার জন্যই হোক, মানুষের ভিড় যেন ঠেলে সরানো যাচ্ছে না। লতিফা এক কোণে মাথা নিচু করে বসে আছে। সে জানে প্রত্যেক মানুষের চোখ তার ওপর। কারো চোখে কৌতূহল, কারো চোখে আদিম ইচ্ছা। অপবিত্রতেও রুচির অভাব নেই এ সমাজে। তার তো অনেক কিছুই বলার আছে। কিন্তু কেউ তার কথা শুনবে না। আর যদিও শোনে, বিশ্বাস করবে না।

সমাজ শুকুর আলীর মতো ক্ষমতাবানদের কথাই বিশ্বাস করে, তা লতিফা এত দিন জেনে গেছে। লতিফা মনের কথাগুলো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়। চিৎকার করে বলতে চায়, ‘ওই শুকুর মেম্বার গত রাইতে আমার ঘরে গেছিল। আমারে অস্ত্রের মুখে...।’ আর ভাবতে পারে না লতিফা। গা গুলিয়ে ওঠে। গতরাতে শুকুর মেম্বার লতিফার বাড়িতে যায়। রাত তখন কত, সে ধারণা নেই লতিফার। তবে পাড়ার মানুষের তখন অর্ধেক ঘুম। লতিফা হারিকেনের অস্পষ্ট আলোয় তাকিয়ে দেখে শুকুর মেম্বার তার মুখের সামনে ঝুঁকে আছে। ঘরের দরজা হাঁ করে খোলা। চিৎকার করতে গিয়ে থেমে যায়। শুকুর মেম্বারের হাতে ধারালো চাকু ওর গলার কাছে ধরা। দাঁত বের করে খিকখিক করে হাসতে থাকে শুকুর মেম্বার। ‘এমনিতে তরে কত বুঝাইছি কিন্তু তুই কান দিস নাই। তাই জোর করা লাগল। বাধা দিলেই গলার নলি কাইটা দিমু।’ লতিফা চিৎকার করতে পারেনি। প্রাণের ভয় বড় ভয়। ভয়ে মরা কাঠ হয়ে পড়েছিল। তার শরীরটা নিয়ে শুকুর মেম্বার দলাই মারাই করে। কিন্তু লতিফা যেন অনুভূতিহীন এক জীবন্ত মৃত মানুষ। ভোর হতেই সে চলে যায়।

লতিফা বিছানা থেকে উঠতে পারে না। অনেক বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকে। খাওয়া বা কাজে যাওয়ার তাড়া দেখায় না। একসময় শুনতে পায়, আজ গ্রামে নাকি তার বিচার। শুনে প্রথমটায় বিশ্বাস করতে পারে না। তারপর সব পরিষ্কার হয়। সমাজের এই কুৎসিত চেহারার প্রতি তার ঘৃণা জন্মে।

শুকুর মেম্বারের বাড়িতে সবাই উপস্থিত হয়েছে। নষ্ট মেয়েটার বিচার। শুকুর মেম্বার গলা খাঁকারি দেয়। সবাই চুপ হয়ে যায়। তারপর সবাই মিলে লতিফার বিচার ঠিক করে। লতিফাকে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একজন খারাপ মেয়েমানুষের জন্য নাকি গ্রামের উঠতি বয়সি পোলাপান সব খারাপ হওয়ার পথে। এই রায়ে সবাই বেশ খুশি হয়। গ্রামের ছেলেগুলো তো নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেল। কেউ কেউ শুকুর মেম্বারের প্রশংসা করতে থাকে। ঠিক সময়ে সে লতিফার নষ্টামি ধরতে পেরেছিল। সে লতিফার ঘটনাটা না দেখলে কেউ জানতেই পারত না। বিচারের পর আবার কোলাহল বাড়তে থাকে। বিচারের রায় কার্যকরের জন্য সবাই লতিফার খোঁজ করে। কিন্তু সে ততক্ষণে বিচারের জায়গা ছেড়ে উঠে এসেছে।

সবাই যার যার মতো কথা বলছিল, এজন্য লতিফাকে কেউ খেয়াল করেনি। হাঁটতে হাঁটতে সে নদীর কাছে এসে দাঁড়ায়। তাকিয়ে থাকে নদীটার দিকে। এক দিন এই নদীর ভাঙনেই সে এ গ্রামে এসেছিল। আজ নদী ভাঙেনি। কিন্তু তার আজ যা ভেঙেছে তা ভিটা-মাটির থেকেও দামি। তার পরদিন লতিফাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। বিচারের রায় শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা হয়ে উঠে না।

 

"