অনুবাদ গল্প

উপদেশ

প্রকাশ | ০৬ মার্চ ২০২০, ০০:০০ | আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২০, ০৩:২০

মিরন মহিউদ্দীন

-হুম, এখন বুঝছ তো?

ম্যাজিস্ট্রেট মারিক খুব নরম সুরে বললেন অ্যাডেমেককে।

অ্যাডেমেক এক যুবতী, যথেচ্ছভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর অপরাধে পনেরো দিনের জন্য সাজা হয়েছিল। আজ ও ছাড়া পাবে।

 শোনো অ্যাডেমেক, ম্যাজিস্ট্রেট মারিক কথার খেই ধরেন, তুমি যদি ওই বাউ-ুলে র‌্যাকের সঙ্গে দিনের পর দিন এমনি উ™£ান্তের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে, তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে হতো তোমাকে, বলত? তোমার ছাড়পত্র তৈরি। ভুলে যেও না, এখনো তোমার বয়েস আছে। বর্তমান অবস্থাটাকে পাল্টাতে পারো ইচ্ছা করলে। থাক ওসব কথা। বলত, র‌্যাকের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কি?

 আমি ওকে ভালোবাসি স্যার।

Ñ তুমি র‌্যাককে ভালোবাসো? বেশ বেশ। খুব সুবিবেচকের মতো ব্যাপারটাকে দেখেছ দেখছি। গম্ভীরভাবে বললেন ম্যাজিস্ট্রেট।

Ñ তবু সব অবস্থাটাকে আরো একবার ভালো করে ভেবে বলছি। ও নিশ্চয়ই তোমাকে বিয়ে করতে যাবে না। কেননা তোমার বয়স প্রায় ত্রিশ আর হলো মাত্র কুড়ি বছর। এ ছাড়া অন্যদিকেও অনেক কিছু ভাবার আছে। আচ্ছা, র‌্যাক কী ধরনের লোক, তা কখনো কি ভেবে দেখার চেষ্টা করেছ? ডাকাতি করবার অপরাধে এরই মধ্যে দ’বছরের সাজা হয়েছে তার। এ কথা তুমি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবে, ওর মতো মানুষের সঙ্গে জীবন জড়িয়ে কারোর ভবিষ্যৎ কখনো উচ্ছল হতে পারে না। আমি তোমার প্রতি একটু বেশিই স্নেহপ্রবণ, তুমি জান, যদিও তুমি তিন তিনবার জেল খেটেছ, এই বয়েসেই। তবু যতটুকুন সম্ভব আমি তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, কোনো কিছুই নষ্ট হয়ে যায় না। সত্যিই যায় না। তবে র‌্যাকের সঙ্গে জীবন গাঁথলে সেটা একেবারেই ভিন্ন ব্যাপার। আর এ কথা জানতে তোমার নিশ্চয়ই বাকি নেই যে, র‌্যাকের ব্যাপারটা আমরা কিছুতেই ভালো চোখে দেখব না। দুজনেই তোমরা এখানে এসেছ একসঙ্গে। নিশ্চয়ই তুমি বুঝতে পারছ আমি তোমার ব্যাপারে একটু বেশি রকমই সদয়। তবু তোমাকে সাবধান করছি, র‌্যাকের সঙ্গে আর কোনো রকম ভাব মেশার চেষ্টা করো না। তুমি কাজ করতে পার, পরিশ্রম করতে পার। জানতো, শ্রমই মানুষকে সত্যিকার সুখ দিতে পারে। রাস্তায় একবার নামো, দেখবে কত শত কাজ ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। মানুষের প্রয়োজন সর্বত্র। জীবনকে গড়ে তোলার প্রয়োজন যে কতখানি, তা খুব সহজেই বুঝতে পারবে। মনে রেখো, প্রত্যেক মানুষই এক দিন বুড়ো হবে। তুমিও হবে। তখন যদি তুমি কারোর বোঝা হয়ে দাঁড়াও, কি করবে ভেবে দেখেছ কি? আর লোকেইবা তোমাকে কী বলবে?

Ñ স্যার, আপনার এই উপদেশের জন্য ধন্যবাদ। আপনার অশেষ দয়া।

-তাহলেই দেখতে পাচ্ছ, কোনো কিছুই নষ্ট হয়ে যায় না। আবার কাজকর্ম শুরু করো। দেখবে কিছু না কিছু ফল পাবেই। ... তুমি গ্রাম থেকে এসেছ, তাই না?

Ñ হ্যাঁ, স্যার আমার জন্ম একটা ছোট্ট গাঁয়ে।

Ñ বেশ। তাহলে তো তুমি চাষাবাদ মানে খেতখামারে বিভিন্ন ধরনের কাজের ব্যাপারে মোটামুটি কিছু জান। এ ছাড়া গাই-বাছুর চরানোর কথাও ধরা যেতে পারে। না, না, এতে লজ্জা পাবার মতো কিছু নেই। রাস্তায় রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে এ অনেক ভালো। র‌্যাকের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক তো একটা মামুলি ভালো লাগার ব্যাপার। ইচ্ছার জোরে মানুষ সব কিছুকে উপেক্ষা করতে পারে, কথাটা মনে রেখো। আর কাজ করার ইচ্ছা যার প্রবল, তার কাছে সব কাজই সমান। কাজের সন্ধান যদি তুমি করো তো নিশ্চয়ই এক দিন কাজ পাবে তুমি।

তাছাড়া বেশ শক্ত সামর্থ্য যুবতীয় তুমি। খুব সহজেই একটা কাজ জুটিয়ে নিতে পারবে। অ্যাডেমেক, তোমাকে আগেও একবার বলেছি, কাজই মানুষের মধ্যে একবারে ডুবে যাবে, তখন দেখবে, তোমার আগের দিনের উড়নচন্ডী জীবনটার কথা একেবারেই ভুলে গ্যাছো; আর তুমি নিজেই নিজেকে বোঝাচ্ছেÑ আগের সেই নিরর্থক দিনগুলোকে আমি এখন পেরিয়ে এসেছি। কি ঠিক বলিনি?

Ñ এর চেয়ে সত্যি আর কী হতে পারে স্যার?

অ্যাডেমেক নড়েচড়ে বসল।

Ñ চমৎকার! চমৎকার! ম্যাজিস্ট্রেট উৎফুল হয়ে বললেন, আমি খুব খুশি হয়েছি। আজ আমার হাতে বিশেষ কোনো কাজ ছিল না, তাই তোমার সঙ্গে বেশ প্রাণ খুলে কথা বলে সময়টুকুর সদ্ব্যবহার করতে পারলাম। দ্যাখো অ্যাডেমেক, অপরাধীকে পাল্টানোর ব্যাপারে শাস্তি দেওয়ার চাইতে সৎ পরামর্শ ও আন্তরিক প্রচেষ্টা অনেক বেশি কার্যকরী হয়। আমি জানি, তুমি কী ভাবছ। তোমাকে আমি সাহায্য করতে চাই। আচ্ছা, তুমি কি একটুখানি ভাবতে পারছ না যে, তোমাকে বোঝাতে পেরে আমি কত খুশি হয়েছি। বারের অন্যান্য ম্যাজিস্ট্রেট কিন্তু দীর্ঘদিনের শাস্তি ফরমান জারি করেই সন্তুষ্ট হন। অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে আত্মিক সংস্কার সাধন নিশ্চয়ই করা যায়, তবু মিষ্টি কথায়, সদয় ব্যবহারে কোনো অপরাধীকে পাল্টানোর ব্যাপারটি আরো বেশি হতে পারে। আমি এই পদ্ধতিতেই বিশ্বাসী। তোমার ব্যাপারটাই ধরো না কেন। আমি তো বলতেই পারতামÑ ঠিক আছে, ওর শাস্তি পাওয়াই দরকার। এর বেশি আমি ওর ব্যাপারে আর কিছুই করতে পারি না। সেটা কি ঠিক হতো? ভালো করে তোমার সমস্ত জীবনটার ওপর চোখ বুলিয়ে নাও একবার। আজ এ মুহূর্তে তুমি তোমার কৃত অপরাধের জন্য এই কোর্টে দাঁড়িয়ে আছো। অথচ তোমার সামনে অপেক্ষা করছে এক সুন্দর নতুন জীবন। সেখানে কাজ আছে, পথচলার একটা সত্যিকারের লক্ষ্য আছে, যে লক্ষ্যে তোমার সব অশুভ চিন্তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্তম্ভ স্বরূপ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আরে, ওই বাউ-ুলে নিষ্কর্মা র‌্যাকটার সঙ্গে জীবন জড়িয়ে কী পাবে তুমি? ছাড়া পেলে র‌্যাক আবার লুটেরাদের দলে যোগ দেবে। শুধু একবার ভাবো তো অ্যাডেমেক। যে মানুষটার সঙ্গে এখানে এসেছ তুমি, ইতোমধ্যে চুরির অপরাধে সে দুবছরের জেল খেটেছে। তুমি ওরই সঙ্গে যদি একবার পথচলা শুরু করো, কিছু আঁচ করার আগেই দেখবে ও তোমাকে ওর দলে টেনে নিয়েছে। ব্যাপারটাকে ছোট করে দ্যাখো না কিন্তু!

তুমি এখন মাত্র পনেরো দিনের জন্য এসেছ এখানে। তখন দেখবে বছরের পর বছর গারদের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে তোমাকে। আর এরপর সত্যিই যেদিন তুমি পুরোপুরি ছাড়া পাবে, দেখবে শুধু বাঁচার তাগিদেই অন্য সঙ্গীদের দিকে তোমাকে তৃষ্ণার্তের মতো, লোভীর মতো তাকাতে হচ্ছে। কেননা, এ ছাড়া তো তুমি আর অন্য কোনো শিক্ষা পাওনি। আমি আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকেই এ কথা বলছি। এখন তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে, আজকের এই র‌্যাকই তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠবে এক দিন। অন্যদিকে দ্যাখো, আজ যখন তুমি ছাড়া পাবে, তখন যেকোনো একটা কাজ তুমি খুঁজে নিতে পারবে এবং সৎকর্মের জন্যই এক দিন এমন এক সুখের সন্ধান পাবে, যা আজও তোমার কাছে অজানা। নিজের রুটি নিজে জোগাড় করার আনন্দ আর তৃপ্তি কতখানি, তা তুমি টের পাবে। কেউ তখন তোমাকে অবজ্ঞার চোখে দেখবে না। প্রত্যেকে শ্রদ্ধার সঙ্গে তোমার ব্যক্তিত্বকে সম্মান দেবে। কেউ তখন তোমাকে অবজ্ঞার চোখে দেখবে না। প্রত্যেকে শ্রদ্ধার সঙ্গে তোমার ব্যক্তিত্বকে সম্মান দেবে। তোমার যে বিশ্রী আর নোংরা একটা অতীত ছিল, তা আর কেউ মনেও রাখবে না। তখন তুমি এমন কোনো সৎ পরিশ্রমী লোকেরও সন্ধান পেতে পারো, যে তোমার মতোই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তার আত্মসংস্থান করছে। হয়তো এমনও হতে পারে, সেই মানুষটি তার পরিচয় আর সবল দুটি বাহুর দৃঢ়তা নিয়ে তোমার পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছাও প্রকাশ করতে পারে। যেদিন তুমি এই লক্ষ্যে পৌঁছাবে, সেদিন নিশ্চয়ই মনে মনে বলবে, যাই হোক না কেন, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ঠিকই বলেছিলেন। জীবনটাকে উপভোগ করার শিক্ষাও তুমি এর থেকে পাবে। আর এদিকে র‌্যাকের সঙ্গে তুমি যে পথ চলেছ, সে পথে আছে শুধু এলোমেলো ঘুরে বেড়ানো, প্রতিটি মুহূর্তে ভিক্ষাবৃত্তি, বনজঙ্গলে রাত্রিযাপন, পুলিশের নজর এড়িয়ে চলা আর হরহামেশা হাজতবাসের ভীতি। সেজন্যই আমি তোমাকে বারবার সাবধান করছি অ্যাডেমেক, র‌্যাকের সঙ্গ ত্যাগ করো। তুমি আজই ছাড়া পাবে। কিন্তু র‌্যাককে এখনো এক হপ্তা থাকতে হবে। আমার কথা শোনো, র‌্যাককে তুমি একেবারে ভুলে যাও। মনে করো না কেন, র‌্যাকের সঙ্গে তোমার সব সম্পর্ক একটা দুঃস্বপ্ন বই আর কিছু নয়। সুখী উজ্জ্বল এক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলার আশা নিয়ে আজ তুমি এই স্থান পরিত্যাগ করো। তারপর কাজের মধ্যে নিজকে বিলিয়ে দাও। জানো, লাতিনে একটা প্রবাদ আছে, ‘প্রার্থনা করো আর কাজ করে যাও।’ কথা কটা স্মরণে রেখো। ভুলেও আর পুরোনো জীবনে ফিরে যেও না অ্যাডেমেক। এমন কাজ কখনো করো না, যাতে তোমার অপরাধের বোঝা আরো বাড়ে, আর তার জন্য তোমাকে আবার এখানে ফিরে আসতে হয়। আমি যে যে কথাগুলো এতক্ষণ ধরে তোমাকে বললাম, আশা করি বুঝেছে?

-‘জি স্যার’ বিনীতভাবে উত্তর দিল অ্যাডেমেক।

-অ্যাডমেক, সত্যিই আমি খুব খুশি হয়েছি। আমার কথাগুলোর অর্থ পুরোপুরি ধরতে পেরেছ। তুমি এখন মুক্ত স্বাধীন।

যেখানে খুশি যেতে পার, যেকোনো কাজ গ্রহণ করতে পারো। তোমার নতুন জীবনটাই প্রমাণ করবে আমার পরিশ্রম বৃথা যায়নি। সেদিন আমি সত্যিই খুশি হব। তোমার কি আর কোনো অনুরোধ আছে অ্যাডেমেক, বিশেষ কিছু? না না, কুণ্ঠার কোনো কারণ নেই। এখন আর আমি তোমার কাছে একজন ম্যাজিস্ট্র্রেট নই। একেবারে আপনজনের মতো নির্ভয়ে তুমি তোমার ইচ্ছার কথা আমাকে খুলে বলতে পারো। আমার পরামর্শ চাইতে পারো।

Ñ স্যার, আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।

অত্যন্ত নম্রভাবে অ্যাডেমেক বলল।

Ñ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। বলো, বলে ফেল। যদি সম্ভব হয় আমি আনন্দের সঙ্গে তোমার আর্জি মঞ্জুর করব। ম্যাজিস্ট্রেট অ্যাডেমেককে উৎসাহ দিতে লাগলেন।

অপরাধ নেবেন না স্যার! আমি মোটেওই আপনার অবাধ্য হতে চাই না। অনুনয়ের সুরে অ্যাডমেক বলতে লাগল।

শুধু একটা অনুরোধ করছি হুজুর, দয়াকরে ওদের বলুন, ওরা যেন আমাকে আরো এক সপ্তাহের জন্য আটক করে রেখে দেয়। যাতে র‌্যাকের সঙ্গে ছাড়া পেতে পারি। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম স্যার, আমরা কেউ কাউকে কখনো ছেড়ে থাকব না। তার মানে এই নয়, আমি আপনাকে কোনো রকমভাবে উত্ত্যক্ত করতে চাইছি ...আপনার অশেষ দয়া স্যার, অসীম করুন...।

মূল গল্প : জারোসøাভ হাসেক
যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস ‘গুড সোলজার শোয়াইক’-এর জন্য তিনি খ্যাত। তার লেখনীতে ক্ষুধার ব্যঙ্গ তার অস্ত্র; সামাজিক দুর্নীতি ও বিভেদ, শোষণ ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা আর তার সৃষ্টিকর্তারা তার শত্রু। ‘ট্যুরিস্ট গাইড’ নামে গল্প সংকলন থেকে এ গল্প গৃহীত।

 

"