প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ০১ আগস্ট, ২০২১

বৈরী আবহাওয়া

দামে ফিকে ইলিশের রুপালি ঝিলিক

সাগরে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে রুপালি ইলিশ। ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা ইলিশ শিকারে নেমে পড়েছেন। তবে দাম চড়া হওয়ায় ইলিশের রুপালি ঝিলিক যেন ফিকে হয়ে এলো এবার। তাছাড়া বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগরে মাছ ধরতেও পারছেন না জেলেরা।

চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাটের আড়তদার ও জেলেরা জানিয়েছেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে মৌসুমের শুরুতে ইলিশ শিকারিরা হোঁচট খেয়েছেন। ৩ নম্বর সতর্কসংকেত থাকায় অনেক জেলে প্রস্তুতি নিয়েও মাছ ধরতে যেতে পারেননি। এর মধ্যে যারা সমুদ্রে গেছেন তারা মাছ পেয়ে খুশি। প্রচুর ইলিশ জালে পড়ছে, যার বেশির ভাগই বড় আকারের। চট্টগ্রাম নগরীর ফিশারিঘাট, রাসমণিঘাট, পতেঙ্গা ১৫ নম্বর ঘাটসহ বিভিন্ন ঘাটে সকাল ও রাতে একের পর এক ভিড়ছে ইলিশবোঝাই নৌকা। জেলেপাড়ায় এখন শুধুই উৎসবের আমেজ। জেলে ও ব্যাপারীদের হাঁকডাকে জেলেপাড়াগুলো মুখরিত।

ফিশারিঘাটের একাধিক জায়গায় ট্রলার নোঙর করা। মাথায় ঝুড়ি থেকে ইলিশ, পোয়া, লইট্টা, ছুরি, চিংড়িসহ নানা প্রজাতির মাছ নামাচ্ছেন শ্রমিকরা। কেউ কেউ আবার সামনের সড়কে রাখা ভ্যানে ইলিশ এনে ফেলছেন। সেই ভ্যানে বিশেষ কায়দায় দৃষ্টিনন্দন করে সাজানো হচ্ছে ধরা পড়া ইলিশ। ভ্যানে সাজানো ইলিশ নিয়ে চালক ছুটে চলছেন আড়তে। খাজা বাবা ট্রলারের মাঝি রমিজ উদ্দিন বলেন, এখানকার ট্রলারগুলো আনোয়ারা, বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, সেন্টমার্টিন, নোয়াখালী, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, ভোলা এসব জায়গায় মাছ ধরে। আমরা বাঁশখালী ও কুতুবদিয়া উপকূলে মাছ ধরেছি, সকালে ইলিশ নিয়ে ঘাটে এলাম, দামও পাব বলে আশা করছি।

আড়তদার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, মূলত চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটে ৬০ শতাংশ মাছই সমুদ্রের। তাই সমুদ্রে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলে ফিশারিঘাট জমজমাট থাকে না। অনেক দিন পর শ্রমিকরা কাজ করছেন। ইলিশ ও সামুদ্রিক মাছ কিনতে ক্রেতারা আসছেন। অনেক ভালো লাগছে।

চট্টগ্রাম ফিশারিঘাট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাবুল সরকার বলেন, চট্টগ্রাম থেকে প্রায় দুই হাজার ইঞ্জিন নৌকা ইলিশ শিকারে গেছে। বড় আকারের এসব নৌকার প্রতিটিতে ৮-১৬ জন জেলে রয়েছেন। তারা তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত সাগরে থাকবেন। এবার কক্সবাজার, সন্দ্বীপ চ্যানেল, মেঘনার মোহনা এবং মহীপুর এলাকায় সমুদ্রে বেশি মাছ ধরা পড়ছে। তাই জেলেরা ওই সব এলাকায় ভিড় করছেন। এরই মধ্যে এই ঘাটে ইলিশ বেচাকেনা জমে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকাররা ট্রাকবোঝাই করে ইলিশ নিয়ে যাচ্ছেন। এই ঘাটের জেলে ও ব্যাপারীরা জানান, মাত্র ইলিশ ধরা শুরু হয়েছে। তাই দাম কিছুটা বেশি। বড় আকারের ইলিশ পাইকারিতে (এক কেজি ও এর বেশি) প্রতি কেজি ৬০০-৭০০ টাকা এবং ছোট ইলিশ আকারভেদে ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বরগুনার জেলেরা সাগরে যেতে পারছেন না। আবহাওয়া ভালো হলে তাদের জালে রুপালি ইলিশ পাওয়ার আশা করছেন জেলে, মৎস্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা।

নদীবেষ্টিত এই জেলার নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোর অধিকাংশ মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস মাছ ধরা। এ জেলার তিনটি প্রধান নদ-নদী বিশখালী, বলেশ্বর ও পায়রাকে ঘিরে হাজার হাজার প্রান্তিক জেলের বসবাস। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের মোহনায়ও ছোট নৌকা নিয়ে ইলিশ ধরেন কয়েক হাজার জেলে। এখানে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা সফলভাবে শেষ হয়েছে। মৎস্য বিভাগ ও জেলেরা জানান, এখন জাল ফেলার মৌসুম। ১৪ অক্টোবর থেকে এরপর আবার প্রজনন মৌসুমের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে। এরই মধ্যে ইলিশ পেতে হবে জেলেদের জালে। জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, বরগুনা জেলায় প্রায় ৪৩ হাজার জেলে রয়েছেন যাদের জীবিকার একমাত্র উৎস্য সাগর-নদীতে মাছ ধরা।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে যাওয়ার জন্য বাজার ভর্তি ধরা ট্রলার ঘাটেই বসে রয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার অবসরে বরফসহ বাজার রসদ সামগ্রী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে; এ অবস্থায় জেলেরা অসহায় সময় পার করছেন।

বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব জানান, মৌসুমে সাগর থেকে ইলিশ নদ-নদীতে বিচরণ করতে আসে। এ সময় প্রায় সব খানেই এসব ইলিশ ধরা পড়ে। আমরা আশা করি, খুব তাড়াতাড়িই সাগর, নদীতে ইলিশ ধরা পড়া শুরু হবে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলমান লকডাউনের মধ্যেও ভিড় দেখা গেছে চাঁদপুরের ইলিশের বাজারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই তিন মাস ইলিশের ভরা মৌসুম। আর এই মৌসুমকে ঘিরে সব সময় চাঁদপুর শহরের প্রধান মৎস্য কেন্দ্র তথা বড়স্টেশন ইলিশের আড়ত থাকে সরগরম। প্রতিদিন অন্তত ২০০ আড়তদার ও মাছ ব্যবসায়ীর ঘরে অন্যান্য মাছ ছাড়াও ৫০০ থেকে ১ হাজার মণ ইলিশ কেনাবেচা হয়ে থাকে। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রভাবে জুলাইতে অন্যান্য বছরের তুলনায় ইলিশের আমদানি একেবারেই কমে গেছে।

তবে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহের শুরুতে ইলিশের কিছুটা আমদানি হলেও গত তিন দিন ধরে আবারও তা কমে এসেছে বলে দাবি স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীদের।

লকডাউনের মধ্যেই ইলিশের এই বাজারে লোকজনের ভিড়। তাদের মধ্যে অধিকাংশ মাস্ক পরলেও সেখানে ছিল না কোনো সামাজিক দূরত্ব। ট্রলার বা ট্রাক থেকে ইলিশ আনলোড করে মাছ ঘাটে ভাগ বসলেই ডাক ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতারা গাদাগাদি করে ভিড় জমান।

বড়স্টেশন মাছ ঘাটের ইলিশ ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা জানান, গত তিন দিন ধরে ইলিশ খুবই কম আসছে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহের শুরুতে কিছুটা ইলিশের আমদানি দেখা যায়। যার অধিকাংশ ইলিশ ছিল নোয়াখালী, হাতিয়া ও ভোলার সাগর মোহনা অঞ্চলের। বর্তমানে বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেরা নদী বা সাগরে যেতে না পারায় এখন ঘাটে তেমন ইলিশ আসছে না। তার ওপর করোনা মহামারির কারণে চলমান কঠোর লকডাউনে কমে গেছে ইলিশের আহরণ। এ কারণে ইলিশের দামও বর্তমানে বেশি।

মাছ ঘাটের আড়তদার ও চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সভাপতি আবদুল বারী মানিক জমাদার বলেন, আমরা সরকারি নির্দেশনা মেনে তাদের দেওয়া সময় অনুযায়ী এই ইলিশের হাটে ইলিশ বেচা-কেনার কাজ চালাচ্ছি। তবুও দেশব্যাপী চাঁদপুরের ইলিশের ব্যাপক চাহিদা থাকার কারণে সকাল ৯টার পর থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত লোকজনের সমাগম থামানো যায় না। এজন্য ক্রেতা, বিক্রেতা ও শ্রমিকদের সবাই যাতে স্বাস্থ্যবিধি মানে, সেই লক্ষ্যে আমরা সার্বক্ষণিক মাইকিং করছি।

এ বিষয়ে চাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা শাহনাজ বলেন, আমরা কয়েক দিন আগে বড়স্টেশনের ইলিশের বাজারটিতে গিয়ে নির্দেশনা দিয়ে এসেছিলাম। যাতে সেখানে সব ধরনের স্বাস্থ্য নির্দেশিকা মানা হয়। কিন্তু যদি তারা সেটা না মানে তাহলে আমরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close