করোনায় মধ্যবিত্তরাও যাচ্ছেন সুপার শপে আপত্তি ভ্যাটে

প্রকাশ | ০১ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

সুপার শপে কেনাকাটা করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে রাজধানীর দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। দুর্যোগকালীন এমন পরিস্থিতিতে এখন সাধারণ ক্রেতারাও পণ্য কিনতে ভিড় জমাচ্ছেন সুপার শপগুলোতে। সুপার শপ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যারা ভ্যাট দিতে কখনোই অভ্যস্ত ছিলেন না, তাদেরও দুর্যোগকালীন সুপার শপে পণ্য কিনতে এসে ভ্যাট দিতে হচ্ছে। এ কারণে তাদের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, বাইরের দোকানগুলোর চেয়ে সুপার শপে এখন সস্তায় প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায়। যেসব পণ্যে ভ্যাট নেই, সেসব পণ্য তিনি সুপার শপ থেকেই কেনেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভ্যাটের ভয়ে অনেকে সুপার শপে যান না। তবে সার্বিকভাবে বাইরের দোকানগুলোর চেয়ে সুপার শপে জিনিসের দাম কম। যেমন, এখন এই করোনার সময়ও সুপার শপে চালের যে দাম, মুদি দোকান বা চালের দোকানে ওই একই চালের দাম কেজিতে অন্তত ৪ থেকে ৫ টাকা বেশি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, করোনার এই দুর্যোগ সময়ে শহরজুড়ে দোকানপাট বন্ধ থাকায় সাধারণ ক্রেতারাও সুপার শপ থেকে পণ্য কিনছেন। তবে ভ্যাটের কারণে তাদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। দুর্যোগের এই সময়ে ক্রেতাদের ওপর ভ্যাট থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভ্যাটের বিষয়টি সরকারের চাপিয়ে দেওয়া। তার মতে, সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে সরকার সুপার শপের ওপর আরোপ করা ৫ শতাংশ ভ্যাট স্থগিত রাখতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘ক্রেতাদের যেন অন্তত আগামী দুই মাস ভ্যাট দিতে না হয়, সে জন্য আমরা গত সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ফলাফল পাইনি। সুপার শপের বিক্রেতারা বলছেন, সাধারণ বাজারের সঙ্গে সুপার শপের দামের যে পার্থক্য রয়েছে, সেটা মূলত ভ্যাটের কারণেই। যেসব পণ্যে ভ্যাট দিতে হয় না, সেসব পণ্যের দাম সুপার শপেই কম। তবে যেসব পণ্যে সরকার ভ্যাট আরোপ করেছে, সুপার শপে সেসব পণ্যের চাহিদা এখন বেড়ে গেছে। তারা বলছেন, দুর্যোগকালীন এ সময়ে মানুষ কাঁচাবাজারে পণ্য পাচ্ছে না। তাই এখন বেশি মানুষ সুপার শপে আসছে।

সুপার শপগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগের চেয়ে সরাসরি ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। অন্তত চারগুণ বেড়েছে টেলিফোন ও অনলাইনে অর্ডার। এছাড়া কাঁচাবাজারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এড়াতেও অনেকে এখন সুপার শপের দিকে ছুটছেন।

জানা গেছে, খোলা বাজারের মতো সুপার শপগুলোতে প্রতিদিন দাম বাড়ানো-কমানোর সুযোগ নেই। কাঁচাবাজার বা মুদি দোকানে দেখা যায়, যে চালের দাম ৬০ টাকা, সেই চাল সুপার মার্কেটে বিক্রি হয় ৫৪ টাকা কেজি। সবজির দামও একই, কাঁচাবাজারে যে সবজির কেজি ১০০ টাকা, সুপার শপে তা ৬০ টাকার নিচে। সুপার শপ স্বপ্নের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির বলেন, সব শ্রেণির মানুষই স্বপ্নতে আসেন, যাদের একটি বড় অংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণির। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত যারা তাদের বুঝে শুনে খরচ করতে হয়। করোনার কারণে সাধারণ মধ্যবিত্তের অনেকেই বাধ্য হয়ে সুপার শপে আসছেন পণ্য কিনতে। কিন্তু ভ্যাট থাকার কারণে অনেকে হতাশ হন। অনেকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়াও দেখান। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভ্যাট প্রত্যাহার হওয়া জরুরি। অন্তত সংকটকালীন দুই মাস বা তিন মাসের জন্য সুপার শপের ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ ভ্যাট স্থগিত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, সাধারণ ক্রেতাদেরও তেল বা দুধ ছাড়া চলে না। এসব পণ্যে ভ্যাট থাকার কারণে তারা বিপাকে পড়েন।

এদিকে পাড়া-মহল্লার দোকান থেকে শুরু করে বড় বড় দোকানেও যে যার মতো করে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করছেন। ক্রেতারা দীর্ঘদিন ঘরে থাকার প্রস্তুতি হিসেবে গত কয়েকদিন ধরে বেশি করে পণ্য কিনছেন। অন্যদিকে সাপ্লাই চেইন কিছুটা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমছে। এতে চাল, ডালসহ অধিকাংশ পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে বাড়তি ভ্যাটের চাপে সুপার শপের ক্রেতাদের নাভিশ্বাস হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, যেসব পণ্যে ভ্যাট আরোপ করা আছে, সেসব পণ্যের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) তথ্য বলছে, গত এক বছরের ব্যবধানে খুচরা বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে লিটারে ২০ থেকে ২৫ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে চিনির ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। টিসিবির হিসেবে, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় চিনির দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ২৮ শতাংশ। গত বছরে রোজার এক মাস আগে চিনির কেজি ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। বর্তমানে সেই চিনি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকারও ওপরে। চিনি, সয়াবিন তেলসহ বেশ কিছু পণ্যের ওপর ভ্যাট আরোপ করায় এগুলোর দাম বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, জিনিসপত্রের দাম কমাতে সরকারের যা যা করা দরকার, সবই করতে হবে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো পণ্যেই ভ্যাট-ট্যাক্স থাকা উচিত না। তিনি বলেন, পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে সীমিত আয়ের মানুষেরা চাল-ডাল বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছেন না। এসব মানুষের জন্য দ্রুত সরকারের কিছু করা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, ভোক্তা যাতে তার আয় দিয়ে পণ্য কিনতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সুপার শপের পণ্যের ওপর ভ্যাট তুলে দেওয়া যেতে পারে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিত্যপণ্যের মধ্যে তরল দুধ, গুঁড়াদুধ, গুঁড়া মরিচ, ধনিয়া, আদা, হলুদ, সব ধরনের মসলার মিশ্রণের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সয়াবিন তেল, পাম ওয়েল, সানফ্লাওয়ার তেল, সরিষার তেলের আমদানি পর্যায়ের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে ভোক্তাকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভোক্তাদের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার পণ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা। কেউ যাতে খাদ্য সংকটে না পড়েন, সেদিকে খেয়াল রাখা। সে কারণে পণ্যের দাম যাতে না বাড়ে সেটা আগে দেখা দরকার। বাজারে পণ্যের সরবরাহ যাতে বাড়ে, সেদিকে বেশি নজর দিতে হবে। প্রয়োজন হলে সুপার শপের ভ্যাট তুলে দিতে হবে।

উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে। এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার একক ১৫ শতাংশ কর হার ছাড়াও ৫, ৭ দশমিক ৫ এবং ১০ শতাংশ হারে করারোপের বিধান করেছে। এতে ক্রেতা-ভোক্তা বাড়তি কর পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

 

"