reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ০৭ জুলাই, ২০২৪

মো. আশতাব হোসেনের হাসির গল্প

হোংশু যায় বাঘ শিকারে

আগের দিনে গ্রামের লোকরা তেমন লেখাপড়া করত না। যারা লেখাপড়া করত তাও একেবারে দায়সারাগোছের। ক্লাস ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত পড়লেই এলাকার মানুষ তাকে খুব শিক্ষিত মনে করত। তার মধ্য থেকে কেউ যদি পুঁথিটুথি পাঠ করতে পারত একটু রসকষ লাগিয়ে, তার তো কয়েক গ্রাম জুড়ে কদরের শেষ ছিল না। তার প্রশংসায় চৈত্র মাসেও বন্যা বইত।

মেট্রিক পাস কেউ করলে তো একেবারে বড়বাবু হয়ে যেত। আর হবেই না কেন, তখন তো ফাইভ পাস করে প্রাইমারিতে চাকরি করে পণ্ডিত মশাই খেতাব জুটে যেত। মেট্রিক পাস করেই হাইস্কুলে চাকরি করতে পারত।

মিথেল বাবুর অবস্থা বেশ ভালোই, তাদের চাষের জন্য মাঠে বিস্তর জমি, গোয়ালে দুধেল গাভি ও হালের বড় বড় বলদ গরু ছিল অনেক। হালচাষ থেকে শুরু করে গরু চরানোর কাজ করার জন্য ছিল ৫ জন জোয়ান রাখাল। মিথেল বাবু আবার গ্রামের বড় মাতবর ছিল। সে এলাকার ছোট-বড় বিচার-সালিসির কাজ করত। সে জন্য সবাই তাকে খুব মান্য করত এবং ভয়ও পেত। তখনকার দিনে গিরস্থ বাড়িতে যেসব রাখাল থাকত, তারা খুব সৎ এবং মালিকের যাবতীয় কাজ নিজের কাজ মনে করে আন্তরিকতার সঙ্গে করত। মিথেল বাবুর বাড়ির রাখালরাও তেমনি ছিল। মিথেল বাবুর সংসারের কাজকামের বিষয় তেমন খোঁজখবর নেওয়ার প্রয়োজন পড়ত না। আর খবর নেবেই বা কখন, তার তো এলাকার দেনদরবার করেই সময় যায়। তার এক ছেলে হোংশু সেও ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েই বইখাতা অর্ধপাকা খেসারি কলাই আর মটর কলাই খাওয়ার জন্য আগুন ধরাতেই ভস্ম করে ফেলেছে। তখনকার দিনে গ্রামের মোড়লদের পোলাপানকেও মানুষ ভয়ে কিছু বলার সাহস পেত না। আর এরই সুযোগে মোড়লদের পোলাপান বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে দস্যিপনা করত অহরহ। হোংশুর এমন কৃতকর্মের জন্য তার বাবার কাছে অভিযোগও কম যায় না। কিন্তু তার বাবা তেমন কিছু আমলে না নিয়ে হো হো করে সব উড়িয়ে দিয়ে বলে উড়তি বয়সের পোলাপান এমন একটু-আধটু করবেই, এসব আপনারা মনে ধরে রাখিয়েন না।

এভাবেই হোংশুর বয়স বেড়ে বিয়ের বয়স হয়ে যায়। হোংশুর বাবা মিথেল বাবু ছেলের বিবাহের জন্য সালিস দরবারে গিয়ে এর-ওর কাছে বলা শুরু করে ছেলের জন্য পাত্রি খুঁজে দেওয়ার জন্য। সেই সঙ্গে ছেলে বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের কথা জাহির করতেও অলসতা করে না মিথেল বাবু। তখনকার দিনে বেশির ভাগ মানুষ সহজ-সরল ছিল এবং একে অপরের কথায় খুব বিশ্বাস করত। এর মধ্যে যারা দেনদরবার করত, তারা সবার চেয়ে বেশি চালাকচতুর ছিল। আর সরল লোকদের কাছ থেকে সুবিধা লুটে নিত। এমন করে আলাপ-আলোচনা করে মিথেল বাবু তার ছেলেকে বিবাহ করানোর জন্য কয়েক ইউনিয়ন পরে চৌদ্দকুড়ি চরের মুল্লুক যোদ্ধারের মেয়ের সঙ্গে কথাবার্তা পাকা করে ফেলে। মুল্লুক যোদ্ধারের সেই চরে অনেক জমি আর বিশাল গরু-মহিষের পাল আছে। এসব দেখে মিথেল বাবুর লোভ লেগে যায়। আর তখন চরের মানুষ বীরের মানুষদের সঙ্গে ছেলেমেয়ে বিবাহ দিতে বেশি আগ্রহী হতো। বীর বলতে বোঝায় যেখানে নদী নেই এবং বন্যার সময় পানি উঠে না। বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করে বরযাত্রী নিয়ে মিথেল বাবু ছেলে হোংশুকে বিয়ে করিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে। নববধূ ঝুমুর যোদ্ধার বেশ চালাক চতুর। সে বাসর রাতেই জামাই বাবু কী কী সাহসী কাজ করতে পারে সেসবের ইন্টারভিউ গ্রহণ শুরু করে। সুন্দরী নববধূ পেয়ে হোংশু তার অনেক বীরত্বের কাহিনি বলা শুরু করে। হোংশুদের বাড়ি থেকে প্রায় মাইলখানেক দূরে ছিল বড় এক বাঁশঝাড়, সবাই বলত তেলির ভিটার বাঁশবাগান। মুরব্বিরা বলতেন, সেই বাঁশবাগানে ভূত-প্রেত, শেয়াল, বানরসহ অনেক হিংস্র প্রাণীও নাকি থাকত। হোংশু সেই বাঁশবাগানে গিয়ে বকের ছানা, ঘুঘুরছানা- এসব ধরে নিয়ে আসত। তাই সেই বাগানটির ব্যাপারে বেশখানিকটা আইডিয়া ছিল। সেই আলোকে নববধূর কাছে তার বীরত্ব তুলে ধরতে সমস্যা হলো না। সে তার বধূ ঝুমুরের কাছে বড় এক সাহসী বীর সাজার জন্য বলে তেলির ভিটার সেই বড় বাগান থেকে অনেক প্রাণী শিকার করে করে প্রায়ই নিয়ে এসেছি। হরিণ মনে করে কত যে বাঘ শিকার করেছি, তারও কোনো ইয়ত্তা নেই।

এসব বীরত্বগাঁথা কথা শুনে তার বউ বলে তাহলে তো দেখছি এ মুল্লুকে তোমার চেয়ে সাহসী আর কেউ নেই? হোংশু খুশি হয়ে বলে আরে কে থাকবে আর যারা আছে তারা তো খরগোশ দেখেই ভয়ে তিন কলস পানি খায়! তার মধ্যে আমি হলাম এই এলাকার বড় মাতবরের বীর সন্তান! এবার তার বউ বলে আচ্ছা, তাহলে আমাকে কিন্তু বাঘ শিকার করে এনে দেখাতে হবে। কারণ আমাদের চরে প্রতি বছর বন্যায় সব ডুবে যায়, বনজঙ্গল কিছু নেই, শুধু চর আর চর। আমি কখনো বাঘ দেখিনি। তাই আমার এই দাবিটা তোমার রাখতে হবে পরানের স্বামী! নববধূর এমন আবদার শুনে হোংশু বলে, আচ্ছা আচ্ছা তাই হবে। এই বলে পরের দিন বাড়ির ছোট রাখাল টুংকুকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, সঙ্গে নিয়ে নেয় বাপদাদার আমলের তীর-ধনুক। এবার তেলির ভিটার সেই বড় বাঁশঝাড়ের ভেতরে কিছুদূর ঢুকে পড়ে বীর হোংশু। ঢোকার সময় কীসের যেন ওয়াও ওয়াও ফোঁস ফোঁস শব্দ পায়। সে শব্দটা আস্তে আস্তে খুব জোরে করতে থাকে। বীর হোংশু চিৎকার করে রাখালকে এক ডাক দিয়ে বলে ওই টুংকু, কই তুই? জলদি আমার কছে আয়! আমাকে জড়িয়ে ধর! আমি পড়ে গেলাম! পড়ে গেলাম! এই বলেই বীর হোংশু জ্ঞান হারিয়ে বাঁশবাগানের এক পাশে চিৎপটাং হয়ে যায়! এদিকে রাখাল টুংকু দৌড়ে গিয়ে দেখে পাশেই দুটি মর্দা বিড়াল ঝগড়া করছে ওয়াও ওয়াও! ফোঁসফোঁস গোঁ গোঁ ওয়াও করে!

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close