এম এ মাসুদ, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা)

  ২৩ নভেম্বর, ২০২২

সুন্দরগঞ্জের দুঃখ ঘোচাবে তিস্তা সেতু

ওপারে কুড়িগ্রামের চিলমারী, এ পারে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ এবং মাঝপথ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে দেড় কিলোমিটার প্রশস্ত তিস্তা নদী। বর্ষা এলেই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে এ নদী। ভেঙে তছনছ করে একের পর এক বসতভিটা ও ফসলি মাঠ। নিঃস্ব হয়ে পড়ে এ জনপদের মানুষ। দুই উপজেলার লাখ লাখ মানুষের পারাপারের একমাত্র উপায় ছিল খেয়া। দিনে খেয়াতে নদী পাড়ি দিতে পারলেও সন্ধ্যে নেমে এলেই বন্ধ হয়ে যেত সেই খেয়া। দূরত্ব মাত্র দেড় কিলোমিটার হলেও দেরি কিংবা যে কোনো কারণে খেয়া ধরতে না পারলে উপোষ করে রাত কাটাতে হতো নদী পাড়ি দিতে না পারা অপেক্ষারত মানুষদের। রাত পোহালে তবেই হতো বাড়ি ফেরা।

যুগযুগ ধরে যাতায়াতের সেই দুর্ভোগ নিরসনে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে নির্মিত হচ্ছে এক দশমিক ৪৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে স্বপ্নের তিস্তা সেতু। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কুড়িগ্রাম, উলিপুর, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী ও চিলমারী থেকে সড়কপথে ঢাকার দূরত্ব কমে আসবে প্রায় ১০০ কিলোমিটার। দূরত্ব কমবে বিভাগীয় শহর রংপুরেরও। এতে বাঁচবে সময় ও অর্থ। পাল্টে যাবে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান। ঘুচবে দুঃখ এবং ঘটবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।

স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র বলছে, হরিপুর ঘাটে তিস্তা নদীর ওপর এক দশমিক ৪৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে। স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন এ সেতুটির নির্মাণের দায়িত্ব পায় চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন। নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে। ভূমি অধিগ্রহণ, মূল সেতু, সংযোগ সড়ক নির্মাণ, সম্প্রসারণ এবং নদী শাসনসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন খরচ বাবদ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৩০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ২৯০টি পাইল, ১৫৫টি গার্ডার, ৩০টি পিলার, ২৮টি স্প্যান, সেতুর দুই পাশে এক কিলোমিটার করে সংযোগ সড়ক এবং দেড় কিলোমিটার করে নদী শাসনের মাধ্যমে সেতুটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে ব্যয় হবে ৩৬৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে প্রায় ১৩৩ একর।

সেতুটির পূর্ব প্রান্তের সুন্দরগঞ্জ অংশের দুই কিলোমিটার সড়কসহ চিলমারী-ধর্মপুর-মণ্ডলের হাট-লক্ষ্মীপুর-সাদুল্যাপুরের ধাপের হাট (ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক) পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় ৮৬ কিলোমিটার সড়ক পথ। এর মধ্যে ৫০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন করছে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর। যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা। বাকি ৩৬ কিলোমিটার সড়কের কাজ বাস্তবায়ন করছে গাইবান্ধা ও সাদুল্যাপুর এলজিইডি। দীর্ঘ এ সড়কে বন্যার পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে ১১-১২টি সেতু এবং ৫৮টি বক্স কালভার্ট।

সরেজমিন দেখা যায়, সেতুটির ২৯০টি পাইলের মধ্যে বসানো হয়েছে ১৭৫টি, গার্ডার ১৫৫টির মধ্যে বসানো হয়েছে ৭৪টি এবং ৩০টি পিলারের মধ্যে ইতোমধ্যেই কাজ সম্পন্ন হয়েছে ১৪টির। আর ৩০টি পিলারের ওপর স্প্যান বসানো হবে ২৮টি। তারমধ্যে স্প্যান বসানো সম্পন্ন হয়েছে আটটি এবং আরো দুটি স্প্যান আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেতুর ওপর বসানো হবে বলে জানিয়েছে এলজিইডি। ২০২৩ সালের জুন নাগাদ সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হলে অবহেলিত এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য হবে সুপ্রসন্ন। যার ইতিবাচক ফল ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

সেতু নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখতে ভিড় করছে নানা বয়সের নারী-পুরুষ। আর সেতুর উভয় দিকে এরই মধ্যে পসরা সাজিয়ে বসেছে ৪০-৫০টি দোকান। দোকানিরা জানালেন, সেতুটি হওয়ায় ভাগ্য ফিরেছে তাদের। স্থানীয়রা বলছেন, যাতায়াত ও কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে। নিশ্চিত হবে ফসলের ন্যায্য মূল্য। নদী শাসন করায় কমবে নদী ভাঙন। বাড়বে এ অঞ্চলের শিক্ষার হার।

নির্মাণ কাজ সমাপনান্তে সেতুটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হলে তা এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মানের পুরো চিত্রই পাল্টে দেবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে উপজেলা প্রকৌশলী সামসুল আরেফিন খান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ৪০ ভাগ। আর কাজ যেভাবে এগুচ্ছে তাতে আশা করি আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে এর নির্মাণ কাজ শেষ হবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close