পাবনায় পাটের দাম নিয়ে সংশয়

বিজেএমসির কাছে বকেয়া টাকা পাওয়া নিয়ে শঙ্কা

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

খালেকুজ্জামান পান্নু, পাবনা

চলতি মৌসুমে পাবনায় পাটের ‘বাম্পার’ আবাদ হলেও মৌসুমের শুরুতেই দাম নিয়ে সংশয়ে আছেন চাষীরা। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) নিয়ন্ত্রিত পাটকলগুলোর উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় এই সংশয়ে আছেন তারা। গত কয়েক বছরের বকেয়া কয়েক কোটি না পেয়ে ব্যবসা বন্ধ করেছেন পাবনার বহু ব্যবসায়ী।

পাবনা কৃষি বিভাগের দাবি, জেলায় এবার লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, আশানুরুপ ফলন পায়নি। সেই সঙ্গে সরকারের পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ায় পাট বিক্রি নিয়ে বেকায়দায় পড়তে হতে পারে এমন দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। বর্তমানে পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আগাম পাটের আঁশ ছাড়ানো শুরু করেছে পাবনার কৃষকরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, চলতি বছর পাবনায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪৪ হাজার ২৫৪ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে তোষা জাত ৪৩ হাজার ৪০০, দেশি ১৭৪ হেক্টর এবং মেছতা ৬৮০ হেক্টর জমি। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৪৪ হাজার ২৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মতে লক্ষ্য মাত্রার শতভাগ আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে তোষা জাত ৪৩ হাজার ৭১০, দেশী জাত ২২৫ হেক্টর ও মেছতা জাত ৩১০ হেক্টর।

পাট চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছর পাটের ফলন ও দাম ভালো ছিল। তাই লাভের মুখ দেখতে এ বছর অনেকেই আবাদের পরিমাণ বাড়িয়েছিল। পাট কাটার সময় আশানুরূপ বুষ্টি হওয়ায় পাট জাগ দেওয়ায় কোন সমস্য হচ্ছে না। তবে পাট আবাদের শুরুতে বৃষ্টি হওয়ায় ফলন ভাল হয়নি।

আটঘরিয়া উপজেলার বাওউখোলা গ্রামের পাট চাষী আজিজুল। এবার তিনি ১ বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছে। তিনি বলেন, সাধারণত ১ বিঘায় ১২ থেকে ১৪ মণ করে পাটের ফলন হয়ে থাকে। কিন্তু এবার তা হবে না। পাট আবাদের শুরু থেকে জাগ দেওয়া ছাড়ানো পর্যন্ত যে খরচ হবে, পাট বিক্রি করে সেই খরচ উঠবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে আছে। তারপরে আবার সরকারী পাট কল বন্ধ ঘোষণা করেছে। যদি বেসরকারি পাটকলগুলো সিন্ডিটেক করে পাটের দাম কমায়, তাহলে আরো বেকায়দায় পড়তে হবে তাদের।

একই গ্রামে পাট চাষী সোবহান মোল্লা বলেন, ৫ বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছে তিনি। ফলন ভাল হয়নি। আবার পাট বাজারে ওঠার আগেই যে অবস্থা তাতে মনে হচ্ছে দাম পাবো না, যে কারণে তিনি আগামীতে পাট আবাদ করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সাঁথিয়া উপজেলার কালাইচারা গ্রামের ফোরকান আলী জানান, ৩ বিঘা জমিতে পাট আবাদ করেছি। শুরুতে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পাট বড় হতে বিলম্ব হয়েছিল। পরে যখন বৃষ্টি হয়েছে তখন শুধু পাট গাছ বড় হয়েছে আঁশ মোটা হয়নি। জমিতে পাট আবাদ করতে যে ব্যয় হচ্ছে ন্যায্য দাম না পেলে উৎপাদন খরচ নিয়েও শংকায় রয়েছি আমরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপপরিচালক আজাহার আলী। প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি জানান, চৈত্রের শুরুতে পাটের বীজ রোপন করতে হয়। যারা সঠিক সময়ে পাট চাষ শুরু করেছিল তাদের পাট পরিপক্ক হয়েছে, ফলে আবাদও ভাল হয়েছে। দামের বিষয়ে তিনি বলেন, দাম নিয়ে কৃষকের দুঃচিন্তার কোন কারণ নাই, কৃষকেরা ন্যায মূল্য পাবেন।

এদিকে পাবনার বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ৩৫ জন ক্ষুদ্র পাট ব্যবসায়ী বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) আওতাধীন বিভিন্ন পাট কলের কাছে ৩০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। যে টাকা না পেয়ে তাদের অনেকে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে।

পাবনার চাটমোহর উপজেলার রেল বাজার এলাকার পাট ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস সরকার। প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি জানান, পাট এখনো বাজারে উঠতে শুরু করেনি। পাট উঠলে বোঝা যাবে দাম কেমন হবে। কৃষকদের কাছ থেকে পাট কিনে বিজেএমসি আওতাধীন সিরাজগঞ্জস্থ জাতীয় জুটমিলের চাটমোহরস্থ ক্রয় কেদ্রে গেল ২০১৭-১৮ অর্থ বছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থ বছর পর্যন্ত তিনি পাট সরবরাহ করেছেন। তবে কোন টাকা পায়নি। জাতীয় জুটমিলের কাছে তিনি প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা পাওনা রয়েছেন। এ অবস্থায় পাট কল বন্ধ ঘোষণা করায় তিনি পাওনা টাকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন যাপন করছেন। টাকা না পেলে এ বছর কৃষকদের কাছ থেকে পাট কিনতে পারবে না।

সাঁথিয়া উপজেলার অপর পাট ব্যবসায়ী শ্রী কার্তিক চন্দ্র সাহার একই অবস্থা। তিনি বলেন, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ডেমরা লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস লিমিটেড ও ইউএমসি জুট মিলে পাট সরবরাহ করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন টাকা পাইনি। এই দুইটি জুট মিলের কাছে তার পাওনা রয়েছে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা। এই বিপুল অংকের টাকা না পেয়ে বন্ধ হয়ে গেছে তার ব্যবসা। বর্তমানে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

 

"