গোবিন্দগঞ্জে সংস্কার কাজে ধীরগতি বাঁধ ভেঙে অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত

প্রকাশ | ৩১ জুলাই ২০২০, ০০:০০

গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে পানি বৃদ্ধির ফলে করতোয়া ও বাঙ্গালী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বোচাদহ ও বালুয়া পয়েন্টে ভেঙ্গে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রামের ঘরবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বাঁধ সংস্কার কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ধীরগতির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে বাঁধের প্রায় ৩টি পয়েন্টসহ চলমান ৪টি পয়েন্টে কাজ চললেও ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে।

এদিকে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ ৫টি পয়েণ্টে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই ভাঙন রোধে ব্যর্থ হলে বন্যার পানিতে প্রায় ১৩টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামসহ কয়েকশ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। ইতোমধ্যে করতোয়া-কাটাখালী-বাঙ্গালী নদীর একাধিক পয়েন্টে নদীর তীর ভাঙনে শতাধিক বাড়িঘর, ফসলের ক্ষেত নদীতে বিলীন হয়েছে।

গাইবান্ধায় দ্বিতীয় দফা বন্যা শেষ হতে না হতেই তৃতীয় দফা বন্যার পূর্বাভাসে গত শুক্রবার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় করতোয়া নদীর পানি ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে কাটাখালী পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রাখালবুরুজ ইউনিয়নের পার-ধুন্দিয়ায় বেলাল কন্সট্রাকসন ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পাইলিং, দরবস্ত ইউনিয়নের গোসাইপুরে রমজান আলী ঠিকাদারের প্রতিষ্ঠান ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ দিয়ে বাঁধ রক্ষা, মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নে বালুয়ায় এনসি এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ দিয়ে নদী ভাঙ্গন ও বাঁধ রক্ষার্থে কাজ করছে। এছাড়া ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে মেসার্স ইকরামুল হকের অধীনে ফুলবাড়ির রায়ের বাড়ি খেয়াপাড়ে ১১৫ মিটার বাঁধ রক্ষার কাজটি শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। এনিয়ে এ উপজেলায় ভাঙ্গনরোধে ৪টি পয়েন্টে একযোগে কাজ চলছে।

শনিবার সরেজমিনে ফুলবাড়ীর রায়ের বাড়ি পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, ফুলবাড়ি ইউনিয়নের রায়ের বাড়ি খেয়াঘাট অংশে বাঁধ এলাকায় জরুরি ৭ হাজার জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজে জিও ব্যাগ ভরানোর কাজ শুরু করেছে ঠিকাদার একরামুল হক সরকারের লোকজন। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, গত বছরের কাজের বিল এখনো পাইনি। রায়ের বাড়ির কাজের বিবরণ জানাতে চাইলে তিনি অপরাগতা প্রকাশ করলে নির্বাহী প্রকৌশলী সূত্রে রংপুর বিভাগীয় অফিসের কার্যাদেশে এ কাজটি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ধুন্দিয়া পয়েন্টে সংশ্লিষ্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, ধুন্দিয়া পয়েন্টে ৪৫৫ মিটার পাইলিংয়ের কাজে প্রায় ৩১ হাজার বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হবে। কাজটির চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেলাল কন্সট্রাকসন। কাজটি শুরুর কথা ছিল চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে। কিন্তু ঠিকাদার ২০ জুলাই কাজ শুরু করলে কাজের উদ্বোধন করেন উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ প্রধান।

এলাকাবাসী জানায়, বন্যার পূর্বে কাজটি শুরু করলে ভাঙ্গনে আমাদের এখানকার প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবারকে সহায়-সর্বস্ব ভিটে-মাটি নদীর গর্ভে হারাতে হতো না। এ ক্ষেত্রে পাউবোর উদাসীনতাকেই দায়ী করছে তারা।

এখানকার লেবার সর্দার জাম্বু জানান, বালু সংকটে তারা প্রায় ৪দিন বসে থাকার পর দুই দিন হচ্ছে কাজ শুরু করেছেন। ২৫ জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ১১টি বস্তা ডাম্পিং করার কথা জানায় সে। এ পয়েন্টে বালুর অভাবে কাজে অত্যন্ত ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। ফলে ভাঙনে গত এক সপ্তাহে আটটি পরিবারের ঘরবাড়ি, বাঁশ ঝাড়, আম-কাঁঠালের গাছসহ পল্লী বিদ্যুতের একটি পিলার নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অত্যন্ত ঝুঁকিতে রয়েছে পাকা ঘরসহ আরো কয়েকটি বসতবাড়ি। সবচেয়ে বিপজ্জনক মহিমাগঞ্জ পয়েন্টে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনসি এন্টাপ্রাইজ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। শনিবার রাতে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের বোচাদহ পয়েন্ট ও সোমবার বালুয়া গ্রামে বালুয়া পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে যায়। মঙ্গলবার উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ প্রধান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার রামকৃষ্ণ বর্মন এই এলাকা পরিদর্শন করেন।

জানতে চাইলে উপজেলা চেয়ারম্যান লতিফ প্রধান বলেন, সময়মতো সংস্কার কাজ শেষ না করায় বাঁধ ভেঙে এই ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির জন্য দায়ি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এ বিষয়ে ইউএনও রামকৃষ্ণ বর্মন বাঁধ ভেঙে যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করে জানান, ঠিকাদার দ্রুত বাঁধের মেরামত কাজ শুরু না করায় বাঁধ ভেঙে গেছে। তবে বাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশ দ্রুত মেরামত কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

গাইবান্ধা পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমানসহ একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে উদাসীনতার ব্যাপার অস্বীকার করেন তারা। নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, আমাদের অফিসের ৯ জন ব্যক্তিকে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার চারটিসহ জেলার ৬০টি পয়েন্টে কাজ দেখতে হচ্ছে। বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ঠিকাদারদের দলাদলির জন্য ডাম্পিংয়ে স্বচ্ছতাসহ কাজ করতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি দ্রুত সঠিক ভাবে কাজ বুঝে নিতে।

 

"