চট্টগ্রাম ব্যুরো

  ৩০ নভেম্বর, ২০২০

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

অবৈধ দোকান ক্যান্টিন ক্ষতি অর্ধশত কোটি

২৯ লাখ ৪৭ হাজার ৬৯৬ টাকা জব্দ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ২০ বছর ধরে অবৈধভাবে সরকারি জায়গায় ক্যান্টিন, গ্রোসারি শপ, পানের দোকান এমনকি বসতঘর নির্মাণ করে বসবাস করে আসছে বলে অভিযোগ এসেছে। এতে সরকারের কমপক্ষে অর্ধশত কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগে জানা গেছে। এর আগে এ ব্যাপারে ওই হাসপাতালের চিকিৎসকসহ বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য খাতে টেন্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে ঘুষ-দুর্নীতির নতুন নতুন তথ্য।

গতকাল রোববার অবৈধ ও অনুমোদনহীনভাবে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ওই হাসপাতালের চারটি ক্যান্টিনের অগ্রণী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ শাখার ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে দুদক চট্টগ্রাম সম্মিলিত জেলা-২ এর একটি টিম।

------
দুদকের উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনের নেতৃত্বে দুদকের অভিযান পরিচালনা করে চারটি হিসাব জব্দ করেন। চারটি ব্যাংক হিসেবে রয়েছে ২৯ লাখ ৪৭ হাজার ৬৯৬ টাকা।

দুদক কর্মকর্তা জানান, সরকারি জায়গায় নির্মিত স্থাপনা উদ্ধার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ক্যান্টিন ও গ্রোসারি শপগুলো উন্মুক্ত দরপত্র দিয়ে বৈধ ঠিকাদারদের বরাদ্দের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এতে মোটা অঙ্কের সরকারি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।

দুদক সূত্রের জানা যায়, দুদক অনুসন্ধানে নেমে চমেক হাসপাতাল, আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালসহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক, জেলার সিভিল সার্জনসহ নগরীর ১৫টি বেসরকারি হাসপাতালে সংশ্লিষ্ট নথি চেয়ে চিঠি দেয় দুদক। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকেন চিকিৎসকসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও এক ডজন ঠিকাদারকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গণপূর্তসহ কয়েকটি দপ্তরের সাড়ে ৮০ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত হয় চট্টগ্রামের দুই কোটি মানুষের সরকারি চিকিৎসাসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ২০০১ সালে হাসপাতালের কর্মচারীদের স্বল্প ব্যয়ে খাবার সুবিধার জন্য ক্যান্টিন করার অনুমতি দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের অভ্যন্তরে রয়েছে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের একটি ক্যান্টিন, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের একটি ক্যান্টিন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্টাফ কো-অপারেটিভ সোসাইটির একটি ক্যান্টিন, নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের একটি ক্যান্টিন।

শুধু হাসপাতাল স্টাফদের জন্য তৈরি হলেও পরে সমিতি বানিয়ে ক্যান্টিনগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু করে প্রভাবশালী কর্মচারীরা। পরে একই কায়দায় হাসপাতালের অভ্যন্তরে কয়েকটি স্পটে খালি জায়গায় বেশ কয়েকটি গ্রোসারি শপ ও পানের দোকান বানিয়ে মোটা অঙ্কে ভাড়া দেয় কর্মচারী সমিতি। বর্তমানে একেকটি ক্যান্টিন থেকে মাসে ভাড়া আসে এক থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত। সমিতির আয় থেকে টাকা ভাগাভাগি হয় হাসপাতালের উঁচুস্তর থেকে শুরু করে চিকিৎসক নেতাদের মধ্যেও।

হাসপাতালের একটি সূত্র জানিয়েছে, ক্যান্টিনে ব্যবহৃত বিদ্যুতের বিল কিছু দিন কলেজ কর্তৃপক্ষ, কিছু দিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিশোধ করে আসছিল। পরে এসব ক্যান্টিন, গ্রোসারি শপের ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ নিয়ে গণপূর্তের বৈদ্যুতিক বিভাগ প্রত্যয়নপত্র দেয়। এরপর এসব বিল হাসপাতাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিরা পরিশোধ করেন। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই বিল সমন্বয় করে আসছে। গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াতেই কোনো স্বচ্ছতা নেই বলে দাবি করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অভ্যন্তরে গোয়াছি বাগান এলাকায় বসতগুলো স্টাফরা বিনা খরচে ব্যবহার করছে। আবার সরকারি জায়গায় ক্যান্টিন ভাড়া দিচ্ছে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতি। এসব আয় যাচ্ছে কর্মচারী সমিতির নামে। এসব অনিয়ম সব মিলিয়ে ৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি হবে।

হাসপাতালের ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকানটিও ২০১৪ সালের পর থেকে টেন্ডার হয়নি। এর অর্থও পাচ্ছে না সরকার। হাসপাতালের ক্যান্টিন বরাদ্দের নামে ব্যাংক হিসেবের মাধ্যমে যত লেনদেন হয়, তার চেয়ে বেশি লেনদেন হয় ‘আন্ডার ক্যাশে’।

এসব বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবীর জানান, ক্যান্টিনগুলো আগে থেকে অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। এসব ক্যান্টিন বরাদ্দ দেওয়া কিংবা টেন্ডার করার বিষয়ে কর্মচারী সমিতিকে অনুমোদন দেননি তিনি। সমিতির কাছে কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। যে কারণে দুদক তাদের কাছে ক্যান্টিনগুলোর বিষয়ে নথি চেয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

 

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়