ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি

  ২২ জুন, ২০২৪

একজন আদর্শ শিক্ষকের অকাল প্রয়াণ

ঢাকার ধামরাইয়ে সুয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন আদর্শবান ও মহৎ শিক্ষক মো. তোফাজ্জল হোসেন। আপাদমস্তক তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক। অকালে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

গত ৭ জুন সকালে, কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে, লাকড়ি ঘরের মাচা তৈরির জন্য বাড়ির পাশে বাঁশ কাটতে যান তিনি। কয়েকটি বাঁশ কেটে ক্লান্ত ও ঘর্মাক্ত হয়ে পড়েন। অন্যদের বাঁশটি টেনে বের করতে বলে তিনি চলে যান ঘরে। তারপর সবাই মিলে নাশতা করেন। পরে বিশ্রাম নিতে বিছানায় শয্যা গ্রহণ করলেন। সেই শয্যাই হলো তার শেষ শয্যা, তার হাতে কাটা সেই বাঁশই হলো তার কবরের চাঙ্গাড়ি। তিনি হলেন কবরের চির বাসিন্দা। এমন মানবতাবাদী শিক্ষকের বিদায় মেনে নিতে পারছেন না তার শিক্ষার্থীরা।

তোফাজ্জল হোসেন ১৯৯৩ সালে সুয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ইতিবাচক মানসিকতার অধিকারী ও দায়িত্বশীল শিক্ষক ছিলেন তিনি। তোফাজ্জল হোসেন ১৯৬৭ সালে ধামরাই উপজেলার সুতিপাড়া ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামে মরহুম মোজ্জাফর মাস্টারের ছেলে। তার বাবাও ছিলেন একজন আদর্শবান শিক্ষক। সেই জন্য তাদের বাড়ির নামকরণ হয়েছে মাস্টারবাড়ি।

একজন আদর্শবান শিক্ষকের প্রধান বৈশিষ্ট্য জ্ঞানচর্চা বা পড়াশোনা করা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি সম্পর্কে সাধারণ ও সাম্প্রতিক বিষয়ে গভীর জ্ঞান ছিল শিক্ষক তোফাজ্জল হোসেনের।

তিনি ছিলেন যুগোপযোগী নিষ্ঠাবান ও জ্ঞানী শিক্ষক। তার গ্রন্থাগারে অনেক দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে। তিনি বই পড়তেন ও পড়ুয়াদের বই উপহার দিতেন। স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের কিশোর অপরাধমূলক কার্যকলাপ, নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধি দিয়ে সমাধান করতেন।

শিক্ষার্থীদের প্রতি অপরিসীম দরদ ছিল তার। অবহেলিত গ্রামীণ জনপদের অতি সাধারণ মানুষের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে সুয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এসব শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার অকৃত্রিম তাগিদ অনুভব করতেন তিনি। এ কর্মই ছিল তার জীবনের ব্রত। তার মানসে তৈরি হয়েছিল এক দায়বদ্ধতা।

শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের মানুষ রূপে গড়ে তোলার জন্য নিজেকে নিমগ্ন রাখেতেন। শুধু পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ থাকেননি। একই সঙ্গে তিনি ধার্মিক ও বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন।

শিক্ষক তোফাজ্জল হোসেন সকাল, সন্ধ্যায় ও রাতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াশোনার খোঁজ নিতেন। অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। চেষ্টা করতেন যাতে শিক্ষার্থীরা পরিপূর্ণ মানবিক হয়ে গড়ে উঠে। সহকর্মীদের প্রতিও ছিল তার আন্তরিক ভালোবাসা। শিক্ষক কর্মচারীদের সুখে দুঃখে, বিপদে আপদে তিনি অংশীদার হতেন। শিক্ষকদের যেকোনো সমস্যা তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে মিমাংসা করার জন্য এগিয়ে আসতেন।

তোফাজ্জল হোসেন উদার চিন্তার একজন সমাজ কর্মী ছিলেন। তিনি নিজ গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের সভাপতি ছিলেন। প্রতিবেশী হিন্দু মুসলিম সব মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। খেলাধুলার ব্যবস্থা, মসজিদণ্ডমাদরাসা নির্মাণ, রাস্তাঘাট সংস্কারসহ এলাকার উন্নয়ন কর্মে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতেন। এসব গুণাবলির জন্য ২০২৩ সালে তার কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সম্মাননা প্রদান করেন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close