আবদুর রহমান রাসেল, রংপুর

  ১৫ জুন, ২০২৪

২০ জুন মিলবে হাঁড়িভাঙা আম

স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় জিআই পণ্য স্বীকৃত রংপুরের সুস্বাদু হাঁড়িভাঙ্গা আম আগামী ২০ জুন থেকে গাছ থেকে পাড়া শুরু হবে। এরপরই শুরু হবে আনুষ্ঠানিক বাজারজাত। প্রথমে ১৮ জুন করা হলেও ঢাকা থেকে নির্দেশ আসার পরে দুদিন বাড়িয়ে দেওয়া হয় আম পাড়ার দিনক্ষণ। এ বছর প্রায় দুই হাজার হেক্টর বাগানে হাঁড়িভাঙার ফলন হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে দেড়শ কোটি টাকার ওপরে হাঁড়িভাঙ্গা আম বিক্রি হবে বলে জানিয়েছে চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

কৃষি বিভাগ ও আমচাষিরা বলেছেন, হাঁড়িভাঙার প্রকৃত স্বাদ পেতে জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে। এর আগে বাজারে হাঁড়িভাঙ্গা আম পাওয়া গেলেও তা অপরিপক্ব হবে।

এদিকে হাঁড়িভাঙা আম সংরক্ষণে গবেষণা জরুরি বলে দাবি করে চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এ আম পরিবহনের জন্য বিশেষ বাস ও ট্রেন সার্ভিস চালু করা দরকার। হাঁড়িভাঙা আমের রাজধানী খ্যাত পদাগঞ্জ হাটের রাস্তাঘাটের সংস্কার এবং হাটে আম বিক্রির শেড নির্মাণ, ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ানো, পাবলিক টয়লেট স্থাপন ও বৃষ্টির সময় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার জোর দাবি তাদের।

হাঁড়িভাঙা পাকলে এ আম ৩-৪ দিনের বেশি রাখা যায় না। তাই এ আম সংরক্ষণের সুবিধা পেলে চাষিরা পেলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করার সম্ভাবনা তৈরি হতো বলে মত আমচাষিদের। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সংরক্ষণের সুযোগ পেলে রংপুরের অর্থনীতিতে হাঁড়িভাঙা ভালো অবদান রাখতে পারবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সচেতন মহল মনে করছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো আরো বেশি তৎপর হলে হাঁড়িভাঙা আম সংরক্ষণের প্রচেষ্টা দ্রুত সময়ের মধ্যে আলোর মুখ দেখবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন বলেন, রংপুরের ঐতিহ্য হাঁড়িভাঙা আম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ আম সংরক্ষণ করতে পারলে চাষিরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি এ সুস্বাদু আমের স্বাদ আরো অনেকে নিতে পারত। আমাদের পিছিয়ে পড়া রংপুরের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধ হবে।

জানা গেছে, হাঁড়িভাঙা আমের গোড়াপত্তন করেছিলেন খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানি গ্রামের আমজাদ পাইকার নামে এক বৃক্ষপ্রেমিক মানুষ।

মাতৃগাছটির সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে ইমরান বলেন, ঝড় কিংবা বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আমের ফলন ভালো হবে। হাঁড়িভাঙা আমের জনক হিসেবে তার বাবার স্বীকৃতি দাবি করেন তিনি। হাঁড়িভাঙার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন আবদুস সালাম। ৭৫ বছর আগের হাঁড়িভাঙা আমের যাত্রা শুরু হলেও ১৯৯২ সাল থেকে রংপুরে হাঁড়িভাঙা আমের সম্প্রসারণ শুরু হয়। তার হাত ধরেই রংপুর অঞ্চলের মানুষ এখন অন্যান্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভের আশায় জেলার উঁচু-নিচু ও পরিত্যক্ত জমিতে প্রতি বছর হাঁড়িভাঙা আম চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

আবদুস সালাম সরকার বলেন, আমি প্রায় ৩২ বছর ধরে হাঁড়িভাঙা আমের চাষ করছি। আমার দেখাদেখি এখন রংপুরে কয়েক লাখ হাঁড়িভাঙা আমের গাছ রোপণ করেছে আম চাষিরা। আমার ২০টির বেশি বাগান রয়েছে। তিনি আরো বলেন, টেকসই অর্থনীতির জন্য আমি শুরু থেকেই হাঁড়িভাঙা আমের সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপন, আধুনিক আমচাষ পদ্ধতি বাস্তবায়ন, গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনসহ হাঁড়িভাঙাকে জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণার দাবি করে আসছিলাম। নির্বিঘ্নে আম বাজারজাত করতে দুর্যোগকালীন দুশ্চিন্তা তাড়াতে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষি বিপণন ও পরিবহন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দাবি জানান আবদুস সালাম সরকার।

পদাগঞ্জের তরুণ উদ্যোক্তা ও আমচাষি পলাশ বলেন, পড়ালেখা করে অনেক দিন ভাবছি কি করব। প্রথমে পরীক্ষণমূলকভাবে আম চাষ শুরু করেছিলাম। লাভবান হওয়ার পর থেকে এখন বাণিজ্যিকভাবে হাঁড়িভাঙা আমের চাষাবাদ ও ব্যবসা করছি। তিনি বলেন, প্রতিটি আমের ওজন হয় ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম। মৌসুমের শুরুতে হাঁড়িভাঙার চাহিদা বেশি থাকায় এর দাম কিছুটা বেশি হয়ে থাকে। এ বছর হাঁড়িভাঙা আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ও চাহিদা বেড়েছে। রংপুর সদর, মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার বিস্তৃত এলাকার ফসলি জমি, বাগানসহ উঁচু-নিচু ও পরিত্যক্ত জমিতে চাষ হচ্ছে এ আম।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন জানান, চলতি বছর জেলায় ৩ হাজার ৩৫৯ হেক্টর জমিতে আমের চাষাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাঁড়িভাঙার চাষাবাদ করা হয়েছে ১ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে। এ বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৯ হাজার ৭১০ টন। শুরুর দিকে প্রতি কেজি আম ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হয়ে থাকে। তবে আমের আকার ও পরিস্থিতির অনেক সময় দামের হেরফের হয়। রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান বলেন, হাঁড়িভাঙা আমের বাজারজাত করতে যাতে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয়, তা মনিটরিং করা হবে। বিশেষ করে পরিবহনে ব্যবসায়ীদের কোনো হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সরকারি পরিবহন সুবিধার বিষয়টিও দেখা হবে। এদিকে রংপুর অঞ্চলে হাঁড়িভাঙা আমের ফলন বেশি হলেও ফজলি, সাদা ল্যাংড়া, কালা ল্যাংড়া, মিশ্রিভোগ, গোপালভোগ, আম্রপালিসহ আরো নানা প্রজাতির আম উৎপাদন হয়ে আসছে। এসব আমের ভিড়ে এখন সবচেয়ে বেশি চাহিদা হাঁড়িভাঙার।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close