ফারুক হোসেন সজীব

  ০৬ জুলাই, ২০২৪

গভীর রাতে ভয়

গভীর রাত। চারদিকে সুনসান নীরবতা। কিছুক্ষণ আগেই এক পসলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। এখন অবশ্য আবার দমকাণ্ডঝড় বাতাস শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে আশপাশ থেকে ব্যাঙ ডাকছে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ। অদ্ভুত শব্দ করে ডাকছে ব্যাঙগুলো। ভালো করে শুনলে মনে হয় ব্যাঙের ডাক তো নয় যেন অন্যকিছু। ঘরের মধ্যে কয়েকটি জোনাক পোকাও সেই কখন থেকে মিটিমিটি আলো দিচ্ছে। এত রাতে জোনাক পোকার আলো? তার মানে ভূতের আলো? রাফি ভয় পেল। দুরুদুরু মনে বলল, ওরে বাবা- রে গেলাম রে!

রাফি কাথা মুড়ি দিয়ে উঁকি দিল। দেখতে চেষ্টা করল গভীর রাতে সত্যি সত্যি ভূত এসে হাজির হলো কি না! যদি সত্যি সত্যি ভূত চলে আসে, তাহলে তো ঘাড় মটকাবে! ভূতের কথা ভাবতেই রাফি ভয়ে একেবারে জড়সড় হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকলে যা হয় আরকি। সবকিছুকেই ভূত বলে মনে হয়। সামনে রাফির পড়ার টেবিল। টেবিলের ওপরে হারিকেন আলো দিচ্ছে সেই সন্ধ্যা থেকেই। আস্তে আস্তে আলোটাও কমে এসেছে। তার মানে হারিকেনের তেল বুঝি শেষ! তবু আলোটা একটু বাড়িয়ে দিতে রাফি হাত বাড়াল। হঠাৎ টেবিলের ওপর জ্বল জ্বল করা দুটি আলো দেখতে পেল। আলো তো নয় নির্ঘাত পশুর চোখ! না হলে ভূত?

রাফির বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। ওরে বাবা-রে! রাফি ভয়ে চড়ুই পাখির মতো চুপসে গেল। ভয়ে চোখ দুটি সঙ্গে সঙ্গেই সে বন্ধ করে ফেলল।

হঠাৎ জানালার একটি পাল্লা খুলে গেল। হয়তো দমকাণ্ডঝড়ো বাতাসেই হবে হয়তো। রাফি নিজের মনকে বোঝাল। কিন্তু পরক্ষণেই আবার জানালার পাল্লায় শব্দ হলো খট খট খটাস! অমন শব্দ শুনে রাফির শরীরটা অদ্ভুত হীম হয়ে গেল। মনে হলো কে যেন সারা শরীর আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। আর একটু হলেই সে জ্ঞান হারাত। কিন্তু তবু খুব সন্তপর্ণে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

ভয়ে রাফি কাথার নিচে কাঁপছে। গলা দিয়েও কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না তার। মাকে ডাকবে তার উপায় নেই। আর এত রাতে মা কি জেগে আছেন? মা তো সেই সন্ধ্যা হওয়ার পরপরই ঘুমিয়ে পড়েন। সারা দিন মাকে অনেক খাটাখাটুনি করতে হয়। রাফি শুয়ে থেকে টের পাচ্ছে ঘরের মধ্যে কী একটা নড়াচড়া করছে। ইঁদুর নাকি বিড়াল? পরে ভাবল, বিড়াল থাকলে তো ইঁদুর থাকার কথা নয়।

তাহলে কি অন্যকিছু?

রাফি নিজের ঘরেই নিজেকে বন্দি মনে হলো। হঠাৎ সে বুকে সাহস আনার জন্য দম টেনে নিঃশ্বাস নিল। এবার সে হারিকেনের আলোটা একটু বাড়িয়ে দিতে টেবিলের দিকে হাত বাড়াল। দেখতে পেল সবুজ দুটি আলো তখনো জ্বলজ্বল করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। রাফি কোনো তোয়াক্কা করল না। যেই না সে হারিকেনটা ধরবে অমনি ম্যাও! ম্যাও করে ডেকে উঠল কেউ! রাফির বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। ভয়ে সে বিছানায় ছিটকে পড়ল! তার মানে ওটা বিড়াল ছিল? হ্যাঁ ঠিক তাই। বিড়ালের চোখ রাতের অন্ধকারেও অদ্ভুতভাবে জ্বলজ্বল করে জ্বলে।

রাফি বুকে থু থু নিল। মনে মনে ভাবল, যাক বাবা বড্ড বাঁচা বেঁচি গেছি। তারপর সে হারিকেনের আলোটা একটু বাড়িয়ে দিল। মুহূর্তেই ঘরময় একেবারে আলোয় আলোকিত হয়ে গেল। কিন্তু ঘরের মধ্যে দমকা ঝড় বাতাস এসে মুহূর্তেই হারিকেনের আলোটা নিভে গেল। এখন উপায়?

তারপর শুরু হলো জানালায় আবার সেই শব্দ খট খট খটাস। সেই সাথে কে যেন মৃদুস্বরে রাফি রাফি বলেও ডাকছে। এত রাতে কে ডাকে রাফিকে?

রাফি মনে মনে চিন্তা করতে লাগল কে ডাকতে পারে! নাহ্ তেমন কাউকে সে খুঁজে পেল না। তার মানে ভূতপ্রেত ডাইনিই কী মানুষের মতো অমন আওয়াজ করে তাকে ডাকছে? হতেও পারে! যদি সত্যি সত্যি ভূত হয় তাহলে তো রাফিকে গলা টিপে ধরবে। তারপর ঘাড় মটকাবে। রাফি ভূতের অনেক গল্পে শুনেছে ভূতদের হাত নাকি ইয়া বড় হয়। তারপর হাত দুটি লম্বা হতে হতে একেবারে দশ ফুট বিশ ফুটের মতোও হয়। এত বড় হাত দিয়ে তো ভূতরা খুব সহজেই তাকে ধরে ফেলতে পারবে। রাফি ঘরের এদিক-ওদিক তাকাল, না কোথাও লুকানো কিংবা পালানোর জায়গা পর্যন্ত নেই। পাশের রুমেই অবশ্য মা ঘুমিয়ে আছেন। রাফি একবার ভাবল, মাকে ডাকবে কি না!

জানালায় আবারও শব্দ হচ্ছে। এই শব্দটি অবিকল কোনো মানুষের মতো। কিন্তু এত রাতে মানুষ আসবে তাও আবার দরজায় না টোকা দিয়ে তার জানালায় টোকা মারবে? এত রীতিমতো অবিশ্বাস্য!

জানালায় আবারও শব্দ হচ্ছে। আর চাপাস্বরে রাফি রাফি বলে ডাকছে। রাফি শুনেও না শোনার মতো করে কাথা মুড়ি দিয়ে চুপচাপ শুয়ে আছে। মনে মনে ভাবছে, যে করেই হোক ভূতকে কিছুতেই বুঝতে দেওয়া যাবে না যে, সে এখনো জেগে আছে। হঠাৎ রুমের দরজা খুলে গেল তার মানে মা চলে এসেছেন।

রাফি একবার মা বলে ডাকল। মা বললেন, তুই এখনো জেগে আছিস?

হ্যাঁ মা জেগে আছি। রাফি মনে মনে ভাবল, সন্তানের বিপদ হয়েছে এটা জেনে কি কোনো মা ঘুমাতে পারেন? তাই হয়তো অদৃশ্য কোনো সংকেত পেয়ে মা উঠে এসেছেন!

রাফি বলল, মা তুমি এখনো ঘুমাওনি! ঘুমিয়েই ছিলাম বাবা। হঠাৎ তোর বাবার ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। সেই কখন থেকে তিনি নাকি তোকে ডাকছে। একবার দরজায় শব্দ করল। কেউ খুলল না দেখে তোর জানালায়ও শব্দ করল! কেন তুই বুঝি কিচ্ছুুটি শুনতে পাসনি?

রাফি আমতা আমতা করে বলল, তার মানে বাবাই জানালায় শব্দ করছিলেন এতক্ষণ? তার মানে কোনো ভূত-প্রেত নয়? শুনে রাফির মা অবাক হয়ে বললেন, ছিঃ কী বলে ছেলেটা! বাবা কী কখনো ভূত হতে পারেন? রাফি শুনে অবাক হয়ে মায়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল!

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close