ফারুক হোসেন সজীব

  ২২ জুন, ২০২৪

ভৌতিক রাত

শীতের রাত। চারদিকে কুয়াশাচ্ছন্ন। এক ফুট দূরে কে আছে কী আছে কিচ্ছুুটি বোঝা যাচ্ছে না। সোহেল আর সুমনের মাথা ভেজা। শরীরও ভিজে একদম জবজবে হয়ে গেছে। কিন্তু তবু একটু ভরসা শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে ওদের। এই ঘাম অবশ্য ভয়ের জন্য নয়। কায়িক পরিশ্রমের জন্যই। আসলে ওরা দুজনই পালা করে সাইকেল চালাচ্ছিল। পেছনে বসে আছে সোহেল। সুমন সাইকেল চালাচ্ছে। ওরা এখন বাড়ি ফিরছে। দুজনে গিয়েছিল প্রায় তিন গ্রাম দূরে। একটি মেলা দেখতে।

কিন্তু কে জানত বাড়ি ফিরতে এত রাত হবে?

আসলে রমরমা মেলা আর বাহারি খাবারের পসরা দেখে ওরা যেন কিছুতেই লোভ সামলাতে পারেনি। সন্ধ্যা থেকে রাত বারোটা অবধি দুই বন্ধু টোটো কোম্পানির ম্যানেজারের মতো ঘুরেছে। মেলার এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। এটা-সেটা খেয়ে দুজনের পেটের অবস্থাও কাহিল।

সুমন বলল, পেটের অবস্থা ভালো ঠেকছে না বন্ধু! চল বাড়ি যাই।

শুনে সোহেল বলল, কী বলছিস তুই? এখন বাড়ি যাওয়া মানেই ভূত-জিনের খপ্পরে পড়া। যখন মেলা শেষ হবে। রাস্তায় মানুষজন থাকবে। তখন যাওয়া যাবে। তখন ভয়-ডর কাজ করবে না।

সুমন বলল, তা ঠিক বলেছিস! কিন্তু মেলা শেষ হতে তো আরো অনেক দেরি রে! এত সময় আমরা কীভাবে থাকব? শরীরের যা অবস্থা! আমার অবস্থাও ভালো না রে! এত সব হাবিজাবি খেয়েছি যে পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। হাবিজাবি খাওয়া একদম ঠিক হয়নি বন্ধু।

ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না সামনে কী আছে। তবু ওরা পথ চলছে। মেঠোপথ। সুমন সাইকেল চালাচ্ছে। শরীর দিয়ে ওর দরদর করে ঘাম ঝরছে। সাইকেল চালাতে বেশ কষ্ট হচ্ছে ওর। কিন্তু উপায় নেই কোনো। মাঝে মাঝে রাস্তা ছেড়ে সাইকেল চলে যাচ্ছে অন্যদিকে। কৃষকের খেতের ভেতরে। উপুড় হয়ে পড়ে যাচ্ছে দুজনেই! আবার ওরা সাইকেল টেনেটুনে তুলছে।

সোহেল বলল, এবার আমি চালাই বন্ধু। তুই সাইকেলের পেছনে চুপচাপ বসে থাক। কিছুদূর যেতেই সোহেলও হাল ছেড়ে দিল। ধপাস! করে পড়ে গেল। ঢালু একটা জায়গায়। ছোট ভাই-বোনদের জন্য যে খাবার ওরা কিনেছিল। সেগুলোও আছড়ে পড়ল মাটিতে। ভাগ্যিস! পলিথিনটা শক্ত ছিল।

তাই তেমন কিছুই হয়নি। আবার উঠে দাঁড়াল ওরা। সোহেল বলল, আমিও খুব ক্লান্ত হয়ে গেছি-রে!

সুমন বলল, আমার পেটেও কেমন মোচড়-মোচড় দিচ্ছে। আমি এখন কিছুতেই সাইকেল চালাতে পারব না বন্ধু! তাহলে কী হবে এখন?

কী আর হবে। দুজনেই একটু জিরিয়ে নিই বরং। সোহেল আর সুমন রাস্তার মাঝখানে বসে আছে। বারবার ওরা পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে। যদি ওরা কোনো মানুষ দেখতে পায়! সেই আশায়। কিন্তু চারদিকে যা ঘুটঘুটে অন্ধকার। এই বিলের মধ্যে কোত্থেকে আসবে মানুষ? তাও এই মধ্যরাতে? সুমনের বুকটা দুরুদুরু করছে। সোহেল বলল, আমারও খুব ভয়-ভয় করছে। এই বিলকে কেন্দ্র করে কত রকমের যে কিচ্ছা-কাহিনি আছে তার ইয়ত্তা নেই। একটু সামনেই আবার সেই বটগাছ। বটগাছটির বয়স কত কে জানে? তবে বুড়ো বটগাছটির শাখা-প্রশাখাগুলো প্রকাণ্ড। দিনের বেলাতেই কেউ গাছটির কাছ দিয়ে যায় না। দুজনেই ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল।

সুমন বলল, উঠে পড় জলদি। কষ্ট করেই আমাদের যেতে হবে। সুমন সাইকেল চালাচ্ছে। সাইকেলটা অদ্ভুত শব্দ করছে। ক্যাচণ্ডক্যাচণ্ডক্যাক-ক্যাক!

সোহেল পেছন থেকে বলে উঠল, ধ্যাততেরি! জীবনে কোনো দিন তেল দিসনি বুঝি?

কেমন ভূতের মতো শব্দ করছে? সুমন বলল, আ-রে কী বলিস! প্রতিদিনই তো তেল দিই। কিন্তু এমন শব্দ করছে কেন কে জানে? তবে এখন ওসবে কান দিস না একদম! তুই বরং চুপচাপ বসে থেকে দোয়া-দরুদ পড়। তা আর বলতে হবে?

দোয়া-দরুদ সেই তখন থেকে পড়ছি! আমিও পড়ছি-রে। জীবনে বেঁচে থাকলে আর কোনো দিন এত দূরে মেলা দেখতে আসব না। আমিও না। কোনো দিন না। আগে তো বাড়িতে যাই!

কিছুক্ষণ পরেই ওরা বটগাছের কাছে চলে এলো। সুমন বলল, চোখ বন্ধ করিস সামনেই কিন্তু বটগাছটি! তুই চোখ বন্ধ করিস না তাহলে কিন্তু ধপাস! সুমন তড়িঘড়ি করে বটগাছটি বিদ্যুৎ গতিতে পার হলো। পার হয়েই বলল, বেঁচে গেছি-রে!

সোহেল বলল, কিন্তু সামনে আরো একটি বিপদ আছে। আরেকটি বিপদ মানে? কেন তোর মনে নেই? পরশু দিনই তো রেললাইনে গরু কেটে পড়ে ছিল! ও-রে ভুলেই গিয়েছিলাম আমি। সুমনের বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। আজ যেন সব ভয় আমাদের দুজনকে একসঙ্গে পেয়ে বসেছে।

আজ আর রক্ষা নেই।

হঠাৎ সুমন বলল, আমার কেমন বমি-বমি লাগছে রে, আমাকে ধর। বলতে বলতেই সুমন ওয়াক! ওয়াক! হরহর করে বমি করে ফেলল! সেই সঙ্গে ধপাস করে সাইকেলসহ হুমড়ি খেয়ে পড়ল দুজনই। আহা! বেচারা বমি করে একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছে।

সোহেল বলল, তুই সাইকেলের পেছনে ওঠে বস। বাকি পথটুকু আমিই চালাই। সুমন খুব কষ্ট করে সাইকেলের পেছনে উঠে বসল। সুমনের মাথা টলছে। মনে হচ্ছে আবারও মাথা পাক খেয়ে সে পড়ে যাবে। তবু সে শক্ত করে সাইকেলটি ধরে বসে আছে। আর বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে। হঠাৎ দেখতে পেল পেছনে সাদা কী যেন একটা আসছে। সুমন বলল, দোস্ত পেছনে সাদা কী যেন একটা আসছে! সোহেল বলল, ওদিকে তাকাস না! এমনিতেই তোর মাথা ঠিক নেই। বমি করেছিস তো। তাই অমন ভুলভাল দেখছিস। সুমন চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে আছে। হঠাৎ ওরা রেললাইনের পথে চলে এলো। আর একটু সামনেই সেই বিপদ!

সোহেল বলল, চোখ বন্ধ করিস এসে গেছি সেই রেললাইনের গরু কাটা জায়গাটায়। সুমন তবু কেন যেন চোখ বন্ধ করল না। হঠাৎ দুজনই দেখতে পেল, ঠিক সেই জায়গাতেই আরো একটি সাদা গরু পড়ে রয়েছে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার হলে কী হবে! স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে।

সোহেল বলল, দেখেছিস কিছু?

হ্যাঁ দেখেছি!

কিন্তু মনে হয় ভূত ওটা কিংবা সেই মরা গরু? দুটোই হতে পারে! তুই তাড়াতাড়ি চল। সোহেল থরথর করে কাঁপছে। সুমনও কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে-উহু উহু করছে। সোহেল ধীরে ধীরে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে সাইকেল চালাচ্ছে। ওরা এখন বাড়ির কাছে চলে এসেছে। বিপদমুক্ত। ভয়ে দুজনের গলা শুকিয়ে কাঠ। সোহেল বাড়ির কাছে এসেই সাইকেলটা রাস্তার পাশেই সটান করে ফেলে দিল। তারপর ওরা রাস্তার ওপরেই চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁপাতে লাগল। পরে ওরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে শপথ নিল। কোনো দিন ওরা রাত-বিরেতে আর কোথাও মেলা দেখতে যাবে না! এমনকি রাত-বিরেতে হাটবাজারেও যাবে না। যাই হোক, দুজন দুজনার বাড়িতে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে লম্বা একটি ঘুম দিল। পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙল দুপুর নাগাদ। ঘুম থেকে উঠেই ওরা জানতে পারল বিষয়টি! গত রাতে ওরা যখন রেললাইন দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। সেই রাতেই নাকি ওখানে আরেকটি গরু কাটা পড়েছিল। তার মানে ওরা দুজনই সঠিক দেখেছে। যাহোক, বিষয়টি মনে আসতেই ওদের বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ

করে উঠল।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close