শাহেদ শুভ্র হোসেন

  ১৫ জুন, ২০২৪

লালু

আর কয়েক দিন পরই কোরবানির ঈদ। আসিফের বাবা আজ লালুকে হাটে নিয়ে যাবেন বিক্রি করার জন্য। লালু আসিফদের বাড়ির পোষা গরু। ওর গায়ের রং লাল বলে ছোটবেলায় আসিফের দাদি নতুন জন্ম নেওয়া বাছুরটির নাম রেখেছিলেন লালু। সেই ছোট্ট লালু আজ কত বড় হয়ে গেছে! গ্রামের মানুষরা প্রায়ই দেখতে আসে বড়সড় লালুকে। দূরের মানুষরাও আসে লালুকে দেখতে। লালুর দরদাম করে কিন্তু আসিফ একটু দূরে দাঁড়িয়ে এসবের কিছুই বোঝে না। লালুকে সে খুব ভালোবাসে। লালুটাও পছন্দ করে আসিফকে। আসিফ কাছে এলে লালু গলা বাড়িয়ে দেয়। আসিফ তখন লালুর গলায় আর পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে, আরাম পেয়ে দুচোখ বন্ধ হয়ে আসে লালুর। লালুকে ওদের পরিবারের একজন সদস্য বললে ভুল হবে না। আসিফের বাবা আর মা লালুর খাবার-দাবারের জন্য সারা দিন ব্যস্ত থাকেন।

এভাবেই চলছিল দিন। এমনি চলতে চলতে একসময় লালু বড় হয়ে যায়। লালুর কথা লোকমুখে প্রচার হওয়ায় বাড়িতে বাইরের মানুষের আনাগোনাও বেড়ে যায়। দরদাম হয় লালুর। আসিফের ভালো লাগে না এসব। বাবা সিদ্ধান্ত নেন লালুকে হাটে নিয়ে যাবেন, সেখানে গেলে ভালো দাম পাওয়া যাবে। বেশি দামে লালুকে বিক্রি করতে পারলে সংসারের অভাব অনেকখানি মিটে যাবে।

তাই আজ সকাল থেকেই প্রস্তুতি চলছে লালুকে হাটে নিয়ে যাওয়ার। লালুকে গোসল করানো হয়েছে, গলায় মালা পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। লাল মালা গলায় দিয়ে লালুকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। লালুও মালা গলায় দিয়ে বারবার মাথা নাড়াচ্ছে। ও হয়তো বলতে চাচ্ছে দেখ তোমরা আমাকে কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে।

সকালে ভাত খেতে বসে আসিফ বাবাকে বলল, বাবা লালুকে কোথায় নিয়ে যাবে তুমি?

বাবা বললেন, হাটে নিয়ে যাব বাবা।

আসিফ বলল, হাটে নিয়ে ওকে কি বিক্রি করে দেবে?

বাবা বললেন, ভালো দাম পেলে বিক্রি করে দেব।

আসিফ বলল, ওকে বিক্রি না করলে হয় না বাবা? বলেই আসিফ কেঁদে উঠল।

বাবা অবাক হয়ে গেলেন। আসিফকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, ওকে বিক্রি করে যে দাম পাওয়া যাবে, তা দিয়েই যে আমাদের সংসার চালাতে হবে বাবা।

আসিফ সংসার, অভাব এসবের কিছুই বোঝে না। সে কিছু না বলেই দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সে কিছুতেই ভাবতে পাচ্ছে না লালু আজ থেকে আর এ বাড়িতে থাকবে না। কোথায় না কোথায় কার কাছে বিক্রি করে দেবে তারপর ওরা ওর গলার দড়ি ধরে টানতে টানতে কোথায় যে নিয়ে যাবে। তারা কি লালুকে আদর করবে, গলায় হাত বুলিয়ে দেবে? এসব ভাবতেই আসিফের চোখ আবার পানিতে ভরে গেল।

কখন যে দাদি এসে দাঁড়িয়েছিলেন পেছনে আসিফ বুঝতে পারেনি। দাদি তাকে জড়িয়ে নেন কোলে। চোখ দুটো মুছে দিয়ে দাদি বলেন, কাঁদিস না আসিফ। মনটাকে শক্ত কর।

আসিফ কিছুতেই মনটাকে শক্ত করতে পারে না। কাঁদতে কাঁদতে দাদির কোলেই ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যে আসিফ স্বপ্ন দেখে সে আর ছোট্ট সেই লালু ওদের আঙিনায় দৌড়ে বেড়াচ্ছে। দৌড়াতে দৌড়াতে ও খুব হাঁপিয়ে গেছে। পানির পিপাসা লেগেছে খুব। তখনই ওর ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে দেখে ও ঘরে শুয়ে আছে, দাদি ওর পাশে বসে।

আসিফ দাদিকে বলল, দাদি বাবা কি লালুকে হাটে নিয়ে গেছে?

দাদি বলল, হ্যাঁ।

আসিফ আবার বলল, লালুকে কি হেঁটেই নিয়ে গেছে হাটে? ওর কষ্ট হবে না বুঝি?

দাদি আর কিছু বলেন না। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন শুধু।

সারা দিন আসিফের কিছুই ভালো লাগল না। ও বারবার লালুর থাকার ঘরে গেল। লালুর ঘরটা শূন্য হয়ে পড়ে আছে। লালু আজ আর কোথাও নেই।

সন্ধ্যাবেলা আসিফের বাবা হাট থেকে ফিরে আসেন বাড়িতে। আসিফ বারবার করে চাইছিল লালু যেন বিক্রি না হয়। কেউ যেন লালুকে না কেনে। যে কিনতে আসবে তাকে দেখে যেন লালু খুব খেপে যায়। সেই ভয়ে কেউ আর লালুকে কিনতে চাইবে না।

কিন্তু বাবা একাণ্ডএকাই ফিরে এসেছেন বাড়িতে, সঙ্গে লালু নেই। তার মানে লালু বিক্রি হয়ে গেছে হাটে। বাবা এসে সে কথাই বলছিল মাকে। ভালো দাম পাওয়া গেছে লালুর। লালুই ছিল নাকি আজকে বাজারের সেরা গরু।

আসিফ চুপচাপ বসে বসে লালুর কথা কল্পনা করে। কাউকে চিরদিন ধরে রাখা যায় না, হয়তো এটাই পৃথিবীর নিয়ম। সেই নিয়ম তো মানতেই হবে। নিজেকে সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করে আসিফ।

চোখ মুছে ও লালুর থাকার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কালকেই এখানে লালু ছিল অথচ আজকে নেই। আজ ঘর ফাঁকা। আবার নতুন কোনো লালু হয়তো আবার এ ঘরেই বড় হবে। তার সঙ্গেও আসিফের খুব বন্ধুত্ব হবে যেমন বন্ধুত্ব হয়েছিল লালুর সঙ্গে। আবার এক দিন সেও এমনি করে হারিয়ে যাবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close