আবেদীন জনী

  ০৪ ডিসেম্বর, ২০২১

কুয়াশা কুয়াশা খেলা

হিমলুর প্রিয় খেলা হচ্ছে কুয়াশা কুয়াশা খেলা। শুধু হিমলুর নয়, ওর বন্ধু হিম, হিমি, হিমিকা ও হিমেলের কাছেও খেলাটি প্রিয়। কারণ, ওরা সবাই শীতের ছানাপোনা। ওরা সবাই লিকলিকে। ওদের মধ্যে হিমলুটা বড্ড বেশি চিকনা-চাকনা। ঠ্যাং দুটো বকের ঠ্যাংয়ের মতো চিক্কণ চিক্কণ। শরীরে শুধু হাড়গোর। মাংসের বালাই নেই। বাঁকাত্যাড়া দাঁতগুলো বরফের মতো সাদা এবং ঠা-া। আর এই হিমলুটা দুষ্টুর বিচি। ও হচ্ছে হাড়-কাঁপানো শীতবুড়ো ও কলিজা কাঁপানো শীতবুড়ির ইঁচড়ে পাকা ছেলে।

পৌষ আর মাঘে বড্ড রকম জমে ওঠে হিমলুদের কুয়াশা কুয়াশা খেলা। বিকালে যখন সূর্যি মামার রোদের তেজ কমতে থাকে, তখন ওরা কুয়াশা-রঙের ধবল জামা গায় জড়াতে থাকে। থালার মতো গোল হয়ে টুকটুকে লাল সূর্যি মামা পশ্চিমে ডুব দিলেই হিমিকাণ্ডহিমলুরা হইচই করে মাঠে নেমে পড়ে। ওরা আসে হাওয়াগাড়িতে চড়ে।

তারপর মনের ইচ্ছেমতো দৌড়াদৌড়ি, লাফঝাঁপ আর ডিগবাজিতে মেতে ওঠে। কখনো উড়ে বেড়ায়। ঘুরে বেড়ায়। কুয়াশার নদীতে খেলতে থাকে ডুবসাঁতার। কখনোবা ঠা-া শিরশির শব্দ-সুরে নেচে নেচে গান গায়। তখন কাউকে সামনে পেলেই হলো, চক্ষের পলকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। কেউ তার নাকের ফুটো দিয়ে, কেউ বা কানের ফুটো দিয়ে, আবার কেউ কেউ পশমের গোড়া দিয়ে হুড়মুড় করে ঢোকার চেষ্টা করে। কিংবা চিক্কণ চিক্কণ ঠা-া ঠা-া দাঁত দিয়ে কুট্টুস করে কামড় মারে। যাকে বলে শীতের কামড়। খালি গায়ে কাউকে পেলে তো কথাই নেই, একেবারে হাড়-কলিজা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয় তার। এ কারণেই শীতের সময় খালি গায়ে বাইরে বেরোনো মানা।

কুয়াশা কুয়াশা খেলাগুলোর মধ্যে একটা মজার খেলা হচ্ছে, ফুঁ দিয়ে কুয়াশা ওড়ানো। শীতছানাদের ফুঁয়ের ভেতর থাকে শীতের গুঁড়ো। বরফের মতো ঠা-া অজস্র শীতের গুঁড়ো ফুঁ মেরে কুয়াশার ভেতরে ঢুকিয়ে উড়িয়ে দেয় ওরা। শীতের গুঁড়ো মেশানো কুয়াশা যেদিকে যায়, সেদিকেই জেঁকে বসে শীত। ওরা যতবেশি শীতের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিতে পারে, যতবেশি হাড়-কাঁপানো শীত শুরু হয়, খেলাধুলায় ততবেশি আনন্দ পায়।

হিমলুরা একটানা সারারাত মেতে থাকে কুয়াশা কুয়াশা খেলায়। ভোরের সূর্যকেও ঢেকে রাখতে চায়- এমনই পাজির পোকা ওরা! রোদ ঝলমল করে উঠলে সূর্যের সঙ্গে আর পেরে ওঠে না। তখন ওরা হি হি হি হাসতে হাসতে হাওয়াগাড়িতে করে পালায়। যেদিন সারাবেলাই ধবল কুয়াশার ভিড় লেগে থাকে, সেদিন ওরা ভীষণ খুশি হয়। কারণ, সেদিন পালানোর চিন্তা নেই। খালি খেলা আর খেলা। শিরশির গান। ডিগবাজি, যা ইচ্ছে তাই।

মেঘপাহাড়ের খাঁজে খাঁজে, হিম বরফের ভাঁজে ভাঁজে ওদের বাড়ি। ওদের কারো কারো আদি নিবাস হিমালয়। কারো বা পৃথিবীর শেষ সীমানাঘেঁষে, মেরুর দেশে।

শীতের ছানাপেনারা যতই দুষ্টুমি করুক, কিচ্ছু বলা যায় না। তাই নিজ থেকেই সাবধান থাকতে হয়, যেন বিপদে ফেলতে না পারে।

এক দেশে একবার হাড়-কাঁপানো শীতছানারা তাণ্ডব শুরু করল। পথের শিশুরা শীতের কামড়ে একেবারে কোঁকড়ে গেল। কারণ, ওদের তো মা-বাবা নেই। শীতের জামা-জুতোও নেই। ওদের করুণ হাল দেখে সহ্য হলো না কারো। সবাই ইচ্ছেমতো বকে দিল শীতের ছানাপোনাদের। ওরা রেগেমেগে চলে গেল দেশ থেকে।

পরের বছর পৌষ গেল, মাঘ গেল। কিন্তু শীতের ছানাপেনারাও এলো না। তারপরের বছরও শীত এলো না। সারা বছর গরমে পুড়তে লাগল সবাই। শুধু কি তাই? খেজুরগাছে রস ঝরা বন্ধ হলো। রসের হাঁড়ি খালি। শীতের পিঠাপুলি খাওয়ার মজাও রইল না। জন্মাল না শীতকালীন শাকসবজি। শীতের পোশাক বেচাকেনাও নেই। বন্ধ হয়ে গেল শীতের পোশাক বানানোর কারখানাগুলো। দেশের অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়ল। চারদিকে শুধু হায়-হাহাকার! হায়-হাহাকার!

সবাই বুঝতে পারল, শীতের ছানাপোনাদের বকাঝকা করা একদম ঠিক হয়নি। ওরা ক্ষতির চেয়ে অনেক বেশি উপকার করে। তাই ওদের ফিরিয়ে আনতে হবে। যাদের শীতের জামা-কাপড় নেই, কেনার পয়সাও নেই, সেসব দুঃখী মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে শীতের কাপড়।

তারপর সবাই একসঙ্গে কাকুতিমিনতি করে ডাকতে লাগল শীতের ছানাপোনাদের-

আয়রে শীতের ছানাপোনা

শীত দিয়ে যা

মায়ের হাতের ভাপা-পুলি

সাথে নিয়ে যা।

এই ডাক হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে গেল মেঘপাহাড়ের দেশে। অভিমান ভুলে গিয়ে হাওয়ার গাড়িতে চড়ে ফিরে এলো শীতের ছানাপোনা- হিম, হিমিকা, হিমলুরা সব্বাই। আবার শুরু হলো কুয়াশা কুয়াশা খেলা। শুরু হলো শীতের আমেজ। পিঠেপুলির ধুম পড়ে গেল সবখানে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close