সানজিদা আকতার আইরিন

  ০৭ নভেম্বর, ২০২০

স্নেহের দান

এ বাড়ি, ও বাড়ির কার্নিসে ঝোলা দস্যি কালো বিড়াল হনুর চাপে পাড়ার অধিকাংশ বাড়ির জানালা থাকে বন্ধ। ইলিশের টুকরো, রুই-এর মাথা কিংবা সদ্য আনা চিংড়ির থলে কখন চলে যায় হনুর থাবায়, রুখতে পারে না কেউ। এত দস্যি বলেই বিড়াল হওয়া সত্ত্বেও সবাই ওকে হনু বলে ডাকে। এর ওর গালি, লাঠির বাড়ি, খুন্তির মার বাদ পড়ে না কিছুই। তবু হনুর স্বভাব বদলায় না। দস্যির দামে শোধ করে নেয় পুরোটাই। কোনো বাড়ির যতেœ সাজানো টেবিলের খাবার কিংবা চুলার হাঁড়ির দুধ চেখে নিতে হনুর জুড়ি নেই। তাই এ পাড়ার সব গৃহিণীর আতঙ্কের নাম হনু।

হনুর ঘোলাটে চোখের রোগা দেহখানি পুরো কালো লোমে ঠাসা। যতেœ সাজানো খাবার তার জোটেনি কোনো দিন। চেহারা দেখেই সবাই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। এটা-ওটা ছুড়ে তাড়িয়ে দেয়। কাছে ডেকে কেউ কিছু খেতে দেয় না কোনো দিন। তাই ক্ষুধার জ্বালায় কিশোর হনুর লোলুপ দৃষ্টি সবার রান্নাঘরের জানালায়। ডাকাতি করেই দেয় ছুট। তাকে ধরে সাধ্যি কার। তবে এর, ওর বাড়ির লুণ্ঠিত খাবারে পেট ভরে না তার।

------
পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানের আড্ডায় নিয়মিত আলাপ হনু আজ কার কী নিয়ে পালিয়েছে। সফিক সাহেব তার স্ত্রীর পায়রাগুলোর যতেœ হাত লাগায়। এতে স্ত্রী মোমেনার সময় বাঁচে। তার স্ত্রীর শখ যেখানে আছে, সেখানেই তার নিবিড় পরিচর্যা। প্রতি সকালে ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় খুব সতর্কতার সঙ্গে বাড়ির গেট বন্ধ করতে ভুল হয় না তার। তবু কী করে যেন দস্যি হনুর বুদ্ধির কাছে হার মেনে গেলেন তিনি। তার এই ভুলের খেসারত দিতে মোমেনাকে হারাতে হয়েছে সদ্য ফোটা দুটি পায়রার শাবক। অনেক দিন ধরে হনুর তীক্ষè দৃষ্টি ছিল পায়রার খাঁচায়। তার এই লোলুপ চাহনি চোখ এড়ায়নি মোমেনার। তাই খাঁচার চারদিকে রেখেছে শক্ত বেড়া। একমাত্র সিঁড়িঘর থেকেই যেতে পারে। কিন্তু সে পথেও থাকে কড়া নজরদারি। সেদিনের পায়রা শাবক হারানোর গ্লানি সফিক সাহেবের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। হাতের কাছে পেলে ব্যাটা হনুর আর রক্ষে নেই।

কদিন পরেই হনুকে আবার দেখা যায় মোমেনার সিঁড়িঘরে। লাঠি হাতে সফিক সাহেব দাঁত খিচিয়ে হামলে পড়েন হনুর ওপর। অতর্কিত হামলায় দিশাহারা হয়ে দস্যি হনু লাফ মারে পাশের বাড়ির নির্মাণাধীন ছাদের ওপর। পেরেক মারা বাঁশ আর কাঠের ফাঁকে আটকে যায় ছোট্ট হনুর পা। টেনেটুনে জোড়াজুড়ি করে ছাড়াতে গিয়ে ভীষণ চোট লেগে যায় হনুর পায়ে। সে সারা দিন লাফালাফি করে কিছু হয় না। আজ তার কপাল খারাপ। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হনু কার্নিশে নামে। ব্যথায় পা ঝুলিয়ে ম্যাঁও ম্যাঁও করে কাতরাতে থাকে সে কেউ ফিরেও তাকায় না। হনুর কান্নায় মন গলে গেল মোমেনার। বারবার তাকিয়ে দেখে দস্যি হনুর চরম পরাজয়। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যে নামে হনু কেঁদেই চলছে। কেন যেন নড়ছে না সে। আজ সারা দিন পেটে জোটেনি কিছুই। খিদে আর ব্যথায় ক্লান্ত হনুর কষ্টে মোমেনার রাগ গলে জল। মাছ-ভাত মেখে কাগজে রেখে হনুকে ডাকে আয় খেয়ে নে। হনু ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না। অভিমানী হনু মুখ ফিরিয়ে নেয়। মোমেনা বুঝতে পারে। এবার আদরমাখা সুরে ডাকতে থাকেÑ আয় হনু খেয়ে নে সোনা, আয় আয়। পশুও বোধ হয় আদর বোঝে। ক্ষুধায় কাতর ক্লান্ত হনু দেরি না করে চটপট গোগ্রাসে গিলে ব্যথা পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সটকে পড়ে। মোমেনা বুঝতে পারে হনুর পেটের ক্ষুধার চেয়ে স্নেহের ক্ষুধার জ্বালা অনেক বেশি।

পরদিন সকালে মোমেনা লক্ষ করে হনু কার্নিশেই বসে আছে। সে দুধ দিয়ে ভাত মেখে দইয়ের পুরোনো মালসা দিয়ে হনুকে ডাকে, হনু খাবি আয়। ডাক শুনে হনু কান খাঁড়া করেÑ যেন মোমেনার ডাকের আশায়ই ছিল সে। আজ তার তাড়া নেই। ব্যথাযুক্ত ফোলা পা নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। আস্তে আস্তে সবটুকু খেয়ে নেয়। খাবার শেষে মিউ মিউ করে ডাকে আর মোমেনার পায়ে গা ঘসে। প্রশ্রয় দেয় মায়াবতী মোমেনা। আজ পালানোর কোনো ইচ্ছা নেই তার। যেন ধরা দিতে চায় সে। দুদিনের খাদ্য বিতরণের বহর দেখে সফিক সাহেব বুঝে গেলেন স্ত্রী মোমেনার স্নেহের দৃষ্টি পড়ে গেছে হনুর ওপর। সুতরাং ওকে আর কাছছাড়া করবে না। তাই তার আর রাগ পুষে রেখে লাভ নেই। চট করে তিনি বুঝে গেলেন তার করণীয় কী। পুরোনো প্লাস্টিকের গামলায় কুসুমগরম পানিতে শ্যাম্পু ও স্যাভলনের মিশ্রণ জোগাড় করতে বেশি সময় লাগেনি তার। কেউ কিছু বোঝার আগেই সফিক সাহেব চট করে রোগা হনুর ঘাড়টি ধরে ঠেসে ধরেন গামলার পানিতে। সফিক সাহেবের গায়ের জোরের সঙ্গে হনু পেরে ওঠেনি। তিনি চটকে চটকে বের করে নেন জন্ম থেকে লেগে থাকা হনুর গায়ের সব ময়লা। স্বচ্ছ পানিতে ধুয়ে পুরোনো কাপড়ে মুড়ে নিয়ে চলে যান ছাদে। পরিত্যক্ত পুরোনো চিরুনির দাঁতে আলতো করে আঁচড়াতে থাকেন হনুর গায়ের লোম। শরীর শুকিয়ে এলে ব্যথার পায়ে বেঁধে দেন মলম দেওয়া পট্টি। আর চোখ পাকিয়ে শাসিয়ে দেন পায়রার খাঁচায় চোখ দিলে খবর আছে তার। পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকার পরও পালায়নি হনু। দুবেলার অন্নের বিনিময়ে সবটুকু শাসন হজম করে নেয় সে। খানিক পরে পরিচ্ছন্ন পরিপাটি হনুকে ফিরিয়ে দেয় মোমেনার কাছে। মোমেনা অবাক হয়ে যায়। তার স্বামী কী করে যেন তার মনের সব কথা বুঝে নেয়। কৃতজ্ঞতায় মন ভরে যায় তার। গৃহকাজ সেরে মোমেনা এবার কাঁচি, সুই নিয়ে বসেন। নিজের সামান্য অবসরটুকু আজ হনুর স্নেহে খরচ করবেন। পুরোনো জামার কাপড় আর বাড়তি বেঁচে থাকা তুলার নরম তোষকে আরামে ভরপেট হনু ব্যথার শরীর কুঁচকে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে। এই বোবা প্রাণীটি বুঝে গেছে মোমেনার স্নেহের গৃহকোণে ঠাঁই মিলেছে তার।

হনুর পায়ের ব্যথা আর নেই। সপ্তাহ আন্তে পরিচ্ছন্নতায় আর বাড়তি যতেœ পাল্টে গেছে তার শরীর। কালো কুচকুচে লোমগুলো এখন চকচক করে। প্রতিবেলা ভরপেট খেয়ে বর্তমানে সে এক সুঠামদেহী তরুণ বিড়াল। তার চোখে এখন আর কোনো লোলুপতা নেই। নেই কোনো বাড়তি খাবারের চাহিদা। মোমেনা আর তার ছেলেদের সময় দেওয়াই এখন হনুর কাজ। ছেলেদের সঙ্গে সোফায় বসে টিভি দেখার নিয়মিত দর্শক সে। পায়রার খাঁচার বিশ্বস্ত পাহারাদার। চিল বা কাক যেন পায়রার দানা কেড়ে নিতে না পারে, সেদিকে তার সজাগ দৃষ্টি।

হনুর খাদ্য গুঁড়ো মাছ এ বাড়ির বাজারের তালিকায় এখন স্থায়ী পণ্য। হাঁড়ির দুধের নির্দিষ্ট অংশটুকুও রোজ বরাদ্দ থাকে হনুর জন্য। চায়ের দোকানে হনুর আলাপ থেমে গেছে বহু আগে। সে এখন কোনো নির্দিষ্ট বাড়ির শান্ত পোষা বিড়াল। মোমেনার স্নেহে বদলে গেছে দস্যি হনুর বেপরোয়া চরিত্র। নিখাঁদ ভালোবাসা ও সঠিক পরিচর্যা পোষ মানাতে পারে জংলি পশুকেও, মোমেনা তা প্রমাণ করে দিল।

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়