দ্বীপরাজ্যের হীরামন

আবদুস সালাম

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

অনেক দিন আগের কথা। সাগরের মাঝে ছোট্ট একটা দেশ ছিল। দেশটির নাম ছিল দ্বীপরাজ্য। রাজ্যটি ধনসম্পদে পরিপূর্ণ ছিল। রাজ্যটির এক পাশে ছিল ছোট্ট একটা বন। দ্বীপরাজ্যের রাজা ছিল একটি মাত্র কন্যাসন্তানের জনক। রাজকুমারী যেমন ছিল রূপবতী, তেমন ছিল বুদ্ধিমতী। দেশভ্রমণ ছিল তার একমাত্র শখ। এক দিন রাজকুমারী সঙ্গী-সাথিদের নিয়ে নৌকায় প্রমোদভ্রমণে বের হলো। সে যখন বনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তার মনে বাসনা জাগল বনের সৌন্দর্য উপভোগ করার। মাঝি বনের এক পাশে নৌকা ভিড়ালে রাজকুমারী সঙ্গীদের নিয়ে বনের মধ্যে প্রবেশ করল। বনের পাশ দিয়ে তারা হাঁটতে থাকে। গাছে গাছে ফুটে থাকা কুসুমকলি, পাখপাখালির ওড়াউড়ি দেখে তারা সবাই মুগ্ধ হলো। এমন সময় রাজকুমারীর নজরে পড়ল একটি পাখি বিক্রেতার। পাখি বিক্রেতার খাঁচার মধ্যে ছিল ছোট্ট একটা হীরামন পাখির ছানা। ছানাটি দেখে তার খুব মায়া হলো। উপযুক্ত মূল্য দিয়ে রাজকুমারী ছানাটি কিনে নিল। ভ্রমণ শেষে রাজকুমারী ছানাটিকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেল। সুন্দর একটা খাঁচায় ছানাটিকে রাখার ব্যবস্থা করল। এরপর রাজকুমারী পাখিটি যতœসহকারে পুষতে শুরু করল। সবার আদরযতœ পেয়ে ছানাটিও ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। একসময় হীরামন বড় হয়ে গেল। তার নজরকাড়া রূপে প্রাসাদের লোকজন খুব মুগ্ধ হলো। হীরামন রাজকুমারীর খুব প্রিয় ছিল। সেসব সময় রাজকুমারীর সঙ্গে থাকত। হীরামন তার সঙ্গে কথা বলত। রাজকুমারী কোথাও গেলে তাকে সঙ্গে রাখত।

দ্বীপরাজ্যের সৈন্যের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। তবে সৈন্যরা খুব দক্ষ ছিল। আর রাজা ছিল প্রজাবৎসল, জনদরদি ও যুদ্ধ পরিচালনায় খুব পারদর্শী। রাজা নিজেই যুদ্ধের নেতৃত্ব দিত। আশপাশের রাজ্যগুলো দ্বীপরাজ্যের ধনসম্পদ লুট করার জন্য আক্রমণ করতে এলে তারা কোনো সুবিধা করতে পারত না। তারা পরাজিত হয়ে ফিরে যেত। এক দিন হঠাৎ দ্বীপরাজ্যের রাজা অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাজ্যের বড় বড় চিকিৎসক তার চিকিৎসায় মনোনিবেশ করল। কিন্তু রাজা সুস্থ হলো না। কিছুদিন পর মারা গেল। রাজার মৃত্যুতে রাজ্যে শোকের ছায়া নেমে এল। রাজাকে হারিয়ে সবাই খুব কষ্টে দিনাতিপাত করতে থাকল। রাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী রাজকুমারী রাজ্যের হাল ধরল অর্থাৎ রানি হলো। রানি বয়সে ছোট হওয়ায় অনেকেই তার প্রতি আস্থা রাখতে পারল না। কারণ আগের রাজার মতো সে দক্ষ যোদ্ধা ছিল না। তাই সৈন্যবাহিনীর মনোবল ভেঙে গিয়েছিল। শক্তিশালী রাজ্য যদি এই দ্বীপরাজ্য আক্রমণ করে তাহলে তারা কীভাবে জিতবে? সব সময় তাদের মনে একটা আতঙ্ক কাজ করত। মৃত্যুভয় তাদের তাড়া করে বেড়াত। নতুন রানি বিষয়টি বুঝতে পারলেও সে ঘাবড়াত না। তার মনোবল অটুট ছিল। বাবার কাছ থেকে রাজ্য পরিচালনার যেটুকু শিক্ষা নিয়ে ছিল, তা দিয়েই সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে।

ওদিকে রাজার মৃত্যুর খবর দ্বীপরাজ্যের পার্শ্ববর্তী রাজ্যে পৌঁছে গেল। তারা মনে করল এখনই দ্বীপরাজ্য আক্রমণ করার উপযুক্ত সময়। অনেকে দ্বীপরাজ্য আক্রমণ করার নীলনকশা করল। এ খবরটি একসময় দ্বীপরাজ্যে পৌঁছে গেল। রাজ্যের সৈন্যরা সতর্ক হয়ে গেল। হীরামন পাখি সবকিছু জানার পর রানিকে অভয় দিল। সে রানিকে বলল, ‘তোমার রাজ্যটি দ্বীপাঞ্চল হওয়ায় অনেকটাই সুরক্ষিত। রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে তুমি মোটেও ভয় পাবে না। সৈন্যরা সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করলে অবশ্যই জয়ী হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন শত্রুদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। তুমি চিন্তা করো না। এ বিষয়ে আমি সৈন্যদের সাহায্য করব। আমি দ্বীপরাজ্যের সীমানা পাহারা দেব। আমি দ্রুত একস্থান থেকে অন্যস্থানে উড়ে বেড়াতে সক্ষম। আকাশ থেকে আমি দ্বীপরাজ্যের চারদিকটা সুন্দরভাবে দেখতে পাই।’ রানি হীরামনের সাহস দেখে মুগ্ধ হলো। এক দিন সত্যি সত্যিই দ্বীপরাজ্য আক্রমণ করার জন্য নৌকাবোঝাই কয়েক দল সৈন্য এগিয়ে এলো। সৈন্যরা ছিল সশস্ত্র। তারা দ্বীপরাজ্যের আশপাশে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে অবস্থান গ্রহণ করে। তাদের সঠিক অবস্থানের খবরটা দ্বীপরাজ্যের সৈন্যরা জানতে পারল না। কিন্তু হীরামন শত্রুরা কোথায় অবস্থান নিয়েছে তা জানতে পারে। সে শত্রুদের অবস্থানের গোপন তথ্য দ্বীপরাজ্যের সৈন্যদের জানিয়ে দেয়। এর ফলে দ্বীপরাজ্যের সৈন্যরা তাদের খুব সহজেই পরাজিত করে। সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সব আক্রমণকারী নির্মমভাবে নিহত হয়। হীরামনের সাহায্য পেয়ে দ্বীপরাজ্যের সৈন্যরা খুব খুশি হলো। তারা যেকোনো সময় যে কারোর সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত থাকে। এভাবে কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার অন্য একটি রাজ্য দ্বীপরাজ্য আক্রমণ করল। তারাও একইভাবে পরাজিত হলো। তাদের পরাজিত হওয়ার কথাটি আশপাশের রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ল। তারা এটাও জানল যে দ্বীপরাজ্যের হীরামন পাখি সৈন্যদের সাহায্য করার কারণে তাদের পরাজিত করা যায় না। হীরামনের জন্য তারা আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। এ কারণে আশপাশের রাজ্যগুলো আর কখনো দ্বীপরাজ্য আক্রমণের সাহস দেখাত না। এর ফলে নতুন রানির প্রতি প্রজারা যেমন খুশি হলো তেমনি হীরামনের প্রতিও সন্তোষ প্রকাশ করল। আর প্রজারা নির্ভয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করল।

 

"