শাহানারা স্বপ্না

  ২১ মার্চ, ২০২৩

বি-আম্মা বেগম

মহীয়সী সংগ্রামী নারী

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলীর বীর জননীর প্রকৃত নাম আবিদা বানু হলেও তিনি বি-আম্মা নামেই বেশি পরিচিত। মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসসহ তখনকার নেতারা তাকে ‘আম্মা’ সম্বোধন করতেন। তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাকামী একজন মহীয়সী নারী, যিনি স্বাধীনতার জন্য নিজেকে এবং নিজ সন্তানদের উৎসর্গ করেছিলেন। তার মধ্যে কোনো জাতিভেদ ছিল না। সারা জীবন দুঃখীজনের ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষের দুুঃখ দূর করার সাধ্যমতো চেষ্টা করে গেছেন।

যুগে যুগে দেশের স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর কত জীবন অকালে প্রাণ দিয়েছেন, কারাবরণ করেছেন, নিঃশেষে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন অত্যাচারীর খঞ্জর তলে। মহাকাল নানা উত্থান-পতন, ভাঙাগড়ার প্রবল প্রবাহ নিয়ে জমা করছে ইতিহাসের গহ্বরে। তারই দু-একটি ঢেউ মাঝে মাঝে প্রবল প্লাবনে দেশ-কাল-সময়কে প্লাবিত করে দেয়। তেমনি ছিল ইংরেজের এ দেশে ক্ষমতা দখল এবং তার বিরুদ্ধে প্রথম দিন থেকেই প্রতিবাদী লড়াই। বিদেশি শাসনের জোয়াল, আমাদের শ্যামল মাটি ও মন চৌচির করে অশান্তির বীজ বুনেছিল সক্রোধে। সেদিনের সেই মহা-অন্যায়ের চরম দুর্দিনে বিবেকি মানুষরা ফুঁসে উঠেছিল। জীবন বাজি রেখে শত্রুর গতি রোধ করতে চেয়েছিল। নিজেদের জান-মাল ঝুঁকিতে ফেলে গর্জে উঠেছিল প্রতিবাদে। ইংরেজের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার মরণপণ যুদ্ধে মেতে সৃষ্টি করেছিল এক ঘূর্ণির আবর্তন। সেই বীর আত্মত্যাগী আপাত ব্যর্থ বিপ্লবী যোদ্ধারা কালের জাদুঘরে ধূলি-ধূসরিত অবহেলায় পড়ে আছে।

ধূলি-ধূসরিত ইতিহাসের কিংখাব মোড়ানো বাক্সের হীরে-মোতি-পান্নাগুলো আলোয় প্রকাশের আগ্রহে উম্মুখ। তেমনি একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র আবিদা বানু ওরফে বি-আম্মা বা বেগম আম্মা।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলীর বীর জননীর প্রকৃত নাম আবিদা বানু হলেও তিনি বি-আম্মা নামেই বেশি পরিচিত। মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসসহ তখনকার নেতারা তাকে ‘আম্মা’ সম্বোধন করতেন। তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাকামী একজন মহীয়সী নারী, যিনি স্বাধীনতার জন্য নিজেকে এবং নিজ সন্তানদের উৎসর্গ করেছিলেন। তার মধ্যে কোনো জাতিভেদ ছিল না। সারা জীবন দুঃখীজনের ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষের দুুঃখ দূর করার সাধ্যমতো চেষ্টা করে গেছেন। সমাজসেবায় উদারহস্ত ছিলেন। যে কারো প্রয়োজনে মুক্তহস্তে দান করতেন। সবস্তরের মানুষের প্রতি ছিলেন সমান দরদি। সেজন্যই সবাই তাকে বি-আম্মা বা বেগম আম্মা বলে ডাকতেন।

অভিভক্ত ভারতের এক সম্ভ্রান্ত ও বিশিষ্ট পরিবারের সন্তান মৌলবি আবদুল আলী ছিলেন বি-আম্মার স্বামী। তাদের তিন ছেলে জুলফিকার আলী, শওকত আলী ও মোহাম্মদ আলী। তিনজনই ছিলেন কীর্তিমান ও সুসন্তান।

মোহাম্মদ আলীর জন্মের খুব অল্প কিছুদিন পরেই তাদের বাবা ইন্তেকাল করেন। শোকে মুহ্যমান স্বামীহারা বি-আম্মা বেগম ছেলেদের মানুষ করার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। তখন ভারতের মুসলমান সমাজ শিক্ষার ঘোরবিরোধী ছিল। কিন্তু স্বশিক্ষিতা বি-আম্মা জানতেন শিক্ষার মর্ম, তাই যেকোনো মূল্যে তিনি তার সন্তানদের সুশিক্ষাকেই সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।

উর্দু, ফার্সি, আরবি শিক্ষার পাশাপাশি তিনি ইংরেজি শিক্ষার জন্যও যত্ন নিয়েছিলেন। তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেত পর্যন্ত পাঠিয়েছিলেন। সে সময় বি-আম্মার আর্থিক অবস্থা কি খুব ভালো ছিল? মোটেই না, তিনি একটুও না দমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পণ করেন। আত্মীয়স্বজনের কটূক্তি, নিজ সমাজের বিরুদ্ধতা কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। তিনি নিজের সিদ্ধান্তে ছিলেন অবিচল।

ইসলামের স্বচ্ছ, নৈতিক ও আদর্শবাদী জীবনের মূল শিক্ষা তিনি নিজে মানতেন এবং সন্তানদেরও সেই শিক্ষাই দিয়েছিলেন। শুধু আর্থিক জৌলুশময় জীবনের জন্য নয় বরং দেশ ও জাতির সেবা করার জন্য শিক্ষা হলো হাতিয়ার- এ শিক্ষাই তিনি দিয়েছেন। অসাধারণ সংকল্প, কষ্টসহিষ্ণুতা, দৃঢ়তা, ধৈর্য ও স্রষ্টার প্রতি অস্থাশীল এই আত্মবিশ্বাসী নারী তার সন্তানদের সত্যিকার মানুষরূপে গড়ে তোলায় ছিলেন বদ্ধপরিকর। তার এ অবিচল মনোভাবের কারণে মোহাম্মদ আলী সেকালেই অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট হতে পেরেছিলেন। তিনিই ভারতের প্রথম অক্সফোর্ড সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। শওকত আলী আলীগড় থেকে বিএ পাস করে আবগারি বিভাগের বড় কর্মকর্তা হন। লন্ডন থেকে ফিরে মোহাম্মদ আলী রামপুর রাজ্যের চিফ এডুকেশন নিযুক্ত হন।

শিক্ষা সংস্কারধর্মী পরিকল্পনা কার্যকর করতে গিয়ে রাজ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ হলে তিনি বরোদা সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। কিন্তু তার অদম্য সংগ্রামস্পৃহা, অগাধ বুদ্ধিমত্তা তাকে সিভিল সার্ভিসের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বেশিদিন আবদ্ধ করে লাখতে পারল না। অবরুদ্ধ দেশের কল্যাণকর কাজে তার লেখনী তলোয়ারের মতো বিভিন্ন পত্রিকায় চলতে লাগল।

তারা দুই ভাই-ই ছিলেন উচ্চ বেতনের এবং উচ্চপদমর্যাদায় কর্মরত। কিন্তু মায়ের শেখানো স্বাধীনতার মন্ত্র তাদের জাগতিক সম্পদ অর্জন থেকে বিচ্ছিন্ন করে আনে। দেশের মানুষের অভাবনীয় দুঃখময় ইতিহাস ও জীবনযাত্রা তাদের প্রতিবাদী করে তোলে। ব্যক্তিসুখ স্বাচ্ছন্দ্য ছুড়ে ফেলে তারা দুভাই দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তারা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দুটি অগ্নিস্ফুলিং হিসেবে আবির্ভূত হন। বি-আম্মা বেগম শুধু সমর্থনই দেননি, তিনিই তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গের প্রেরণা জোগান। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? কোথা থেকে শিখলেন মাথা উঁচু করে বাঁচার এ প্রেরণা! নিজ ধর্মের অনুশীলন থেকেই তিনি শিখেছেন মানুষ স্বাধীন। আর স্বাধীনতা ছাড়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সন্তানদেরও তিনি সেই শিক্ষাই দিয়েছেন। সমাজের তিনি ছিলেন বীর-মাতার উদাহরণ।

বি-আম্মার মনে শৈশব থেকেই ছিল ইংরেজদের প্রতি তীব্র ঘৃণা। তার বাবা মোজাফফর আলীর বড় ভাই ছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের একজন ঊর্ধŸতন প্রভাবশালী কর্মকর্তা। ইংরেজদের হাতে তাদের পুরো পরিবারটি অবর্ণনীয় নৃশংসতার শিকার হয়। আবিদা বেগম বা বি-আম্মা বেগম তখন সাত বছর বয়সের শিশু ছিলেন। সেই শিশু বয়সে তিনি নিজ চোখে দেখেছিলেন তার নিরপরাধ প্রিয় বড় চাচার নির্মমভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে শহীদ করার দৃশ্য। ইংরেজদের বর্বরতায় ছিন্নভিন্ন হয়েছে পুরো পরিবার। সারা জীবনে তিনি তা ভোলেননি।

তাই তো তিনি ইংরেজ বিতাড়নের সক্ষোভে শামিল হয়েছিলেন। মনেপ্রাণে ব্রিটিশ শক্তির উৎখাতে সবটুকু সামর্থ্য ব্যয় করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যদি আমার সাত পুত্র থাকত তবে সবাইকেই খেলাফতের জন্য উৎসর্গ করে দিতাম।’ দেশের স্বাধীনতা জন্য তার মনের এ জোশেই হাজির থাকতেন আন্দোলনের সব ফ্রন্টে। তিনি তার সন্তানদের এমনভাবে বড় করেছেন, যাতে জাতির সেবায় জীবন দিতে পারে। তাদের সব কাজের সঙ্গে তিনিও থাকতেন ছায়ার মতো।

মায়ের উৎসাহে তাদের নেতৃত্বে ভারতের মুক্তি আন্দোলনে অপ্রতিহত গতি সৃষ্টি হয়। সর্বত্র দুর্বার হয়ে ওঠে স্বাধীনতার আন্দোলন। মাওলানা মোহাম্মদ আলী পরিণত হন এ উপমহাদেশের ইতিহাসে অপরিসীম কর্মতৎপর, অনলবর্ষী বাগ্মী, ক্ষণজন্মা, স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা বিরল এক স্বাপ্নিক পুরুষে। তার মতো চৌকশ, ব্যক্তিত্ববান, জ্ঞানী, উদারচেতা মানুষ তখন ভারতীয় রাজনীতির অঙ্গনে খুব বেশি ছিল না।

স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ আলী ভারত উপমহাদেশের মহান দেশপ্রেমিকদের মধ্যমণি। ঊনবিংশ শতাব্দীর দুই যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা। একনিষ্ঠ ধর্মানুরাগ, বলিষ্ঠ চারিত্রিক দৃঢ়তা, গতিশীল ব্যক্তিত্ব সমসাময়িক রাজনীতির অঙ্গনে তাকে দিয়েছিল উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের সম্মান। সুপ্তিমগ্ন জাতিকে তারা জাগিয়ে তুলেছিলেন। সাহস ও বিশ্বাসের চেতনায় বলীয়ান করে দিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা। শিশুকাল থেকে তাদের মনে মায়ের জ্বালানো আলোকেই গোটা দেশকে প্রজ্বালিত করেছিলেন। তিনি নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও সাধনায় ভারতের জনমনে রাজনৈতিক চেতনা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

তখন সর্বত্র জনরবের মতো মানুষের মুখে মুখে ফিরত- ‘মোহাম্মদ আলীর মা কা নির্দেশ : বেটা, স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ কর’।

১৯১২ সালে বলকান ও ত্রিপোলী যুদ্ধ শুরু হয়। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমাশক্তি তুরস্কের ইসলামি খিলাফতের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগে। এ সময় আলী ভ্রাতৃদ্বয় ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘোষণা করে মহা-হুঙ্কারে ফুঁসে ওঠেন। বি-আম্মা বেগমও তাদের সঙ্গে একজন সেনাপতির মতো অগ্রভাগে এসে যুক্ত হন। মোহাম্মদ আলী লন্ডন থেকে দুটি ইংরেজি পত্রিকা সম্পাদনা করে সাড়া জাগান এবং বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেন। ১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হলে একদিকে ব্রিটেন, ফরাসি, ইতালি অন্যদিকে জার্মানি। তুরস্ক তখনো কোনো পক্ষে যোগ দেয়নি। ব্রিটেন তুরস্ককে নিজেদের সপক্ষে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করলে মোহাম্মদ আলী এর প্রতিবাদে লন্ডনের টাইমস পত্রিকায় ‘দ্য চয়েজ অব দ্য তুর্ক’ নামে একটি বিশ্লেষণধর্মী জ্বালাময়ী প্রবন্ধ লেখেন।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ইংরেজ সরকার তার পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করে তাকে জেলে আটক করে। বিনা বিচারে সাত বছর ধরে বন্দি করে রাখে। আলী ভ্রাতৃদ্বয়কে জালিম সরকার অনেকবারই জেলে বন্দি করে রেখেছিল। জালিম সরকারকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে এ সময় বি-আম্মা বেগম তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তিনি অকুতোভয়ে ছেলেদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন। বিভিন্ন সংগঠনে ছেলেদের প্রতিনিধির ভূমিকা রাখতে উপস্থিত থাকতেন।

১৯২৩ সালে আলী ভ্রাতৃদ্বয় জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর পরই বি-আম্মার শরীর ভেঙে পড়ে। ঝটিকাপূর্ণ জীবনের প্রদীপটি নিভু নিভু হয়ে আসে। অবশেষে ১৯২৪ সালের ১৪ নভেম্বর এই অসম সাহসী স্বাধীনচেতা মহীয়সী নারী ইন্তেকাল করেন। অমৃতসরের প্রাচীন কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close