হিটলার এ হালিম

  ১৯ জুলাই, ২০২২

নারী ই-কমার্স উদ্যোক্তারা যে কারণে বেশি সফল

সাবিকুন নাহার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। থাকতেন রাঙামাটির দুর্গম এলাকা লংগদুতে। ২০২০ সালে করোনার কারণে স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে চলে আসেন স্বামীর কর্মস্থল চট্টগ্রামে। শুরু হয় লকডাউন। অলস সময় কাটাতে থাকেন। এ সময় খোঁজ পান নারী ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের প্ল্যাটফরম উইয়ের। নিয়মিত উইয়ের পোস্টগুলো দেখতে থাকেন। তারও এক দিন ইচ্ছে হয় পোস্ট দিতে। ব্যতিক্রমী কিছু খুঁজতে থাকেন। পেয়ে যান দুটো আইটেম- পাহাড়ি আদা ও হলুদ। তার কর্মস্থলের আশপাশে প্রচুর হয় এসব। শুরু করেন সংগ্রহ। এরপর এক দিন উইয়ে পোস্ট দেন পাহাড়ি আদা ও হলুদ গুঁড়ার। প্রথম পোস্টেই একাধিক অর্ডার পেয়ে যান।

পাহাড়ি মসলার বিশাল চাহিদার কথা তখনই জানতে পারেন। সাবিকুন নাহারকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। স্বামীও যতটুকুু পেরেছেন সময় দিয়েছেন। লংগদুতে কুরিয়ার না থাকায় সাবিকুন নাহার কুরিয়ারের বুকিং দিতে চট্টগ্রামে যেতেন।

পরে তিনি পাহাড়ি মসলার মধ্যে হলুদ, আদা, রসুনের গুঁড়া, মরিচের গুঁড়া, ধনিয়া ও জিরার গুঁড়া তার পেজে তুলেছেন। বিক্রি করছেন উই প্ল্যাটফরমেও। এখন তিনি আগের চেয়ে আরো আত্মবিশ্বাসী বলে জানালেন।

দেশের ই-কমার্স খাত নিয়ে চারদিকে হইচই, নিন্দা, আলোচনা-সমালোচনা। এরই মধ্যে নীরব অভ্যুত্থান হয়েছে নারীদের। খালি চোখে দেখা না গেলেও বোঝা যায় দেশের লাখো নারী ই-কমার্স উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন। গ্রাহক সেবা দিয়ে নিজেদের কর্মসংস্থান করেছেন। সংসারের হাল ধরেছেন অনেকে।

ই-কমার্সে নারীরা ভালো করছেন। প্রচলিত ওয়েবসাইট ও ফেসবুক- দুই মাধ্যমেই তারা সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। নারী উদ্যোক্তা, ই-কমার্সভিত্তিক সংগঠনগুলো বলছে, ই-কমার্স খাতে নারী উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কম। প্রতারণার ঘটনাও কম। এ কারণে তারা এ খাতে ভালো করছেন।

দেশের দুটি প্রতিষ্ঠিত ই-কমার্স প্ল্যাটফরম সহজ এবং ফুডপান্ডার প্রধান হলেন নারী। তারা সফলতার সঙ্গে তাদের প্রতিষ্ঠানকে দেশের শীর্ষস্থানে নিয়ে গেছেন। সহজ-এর প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিহা এম কাদির বলেন, ‘একজন মানুষের পরিচয় তার কাজে, জেন্ডারে না। অথচ এখনো এই পুরুষশাসিত বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে আমাদের নারীদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বানানো প্রচলিত সব বাধাকে অতিক্রম করে আসতে হয়। পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন আমরা সবাই মিলে সচেতনভাবে নারী-পুরুষের ভেদাভেদকে গুঁড়িয়ে দিতে পারব। সচেতনভাবে আমাদের অবচেতন মন থেকে জেন্ডার বায়াসনেসের চর্চাকে নির্মূল করতে পারব।’ নিজের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আজ না হয় কাল তা বাস্তবায়ন হবেই। এই সম্মিলিত পরিবর্তন কারোর একার উন্নতি বয়ে আনবে না। এর মাধ্যমে পুরো সমাজ বাধাহীন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাবে।’

দেশে ফেসবুকভিত্তিক ই-কমার্স নারী উদ্যোক্তাদের (এফ-কমার্স) সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফরম উই। সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। এরমধ্যে ৪ লাখ নারী সরাসরি কাজ করছেন। এটাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। অনেকে বেশ ভালো করছেন বলে জানালেন সংগঠনটির সভাপতি নাসিমা আক্তার নিশা।

তিনি বলেন, উইয়ের বড় শক্তির জায়গা হলো, এটা দেশীয় পণ্যের একমাত্র গ্রুপ। এটা ফেসবুকভিত্তিক ই-কমার্স প্ল্যাটফরম। এখান (প্ল্যাটফরম) থেকে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে ক্রেতারা কেনাকাটা করছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা তাদের পণ্য এই প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে বিক্রি করতে পারছেন। তিনি জানান, করোনাকালে অনেকে কিছুই করতেন না, কেউ কেউ সংকটে পড়েছিলেন, অনেকের স্বামী চাকরিহারা হয়েছিলেন, সেই সময়ে অনেক নারী উদ্যোক্তা হয়েছেন। যে যা পারেন, যে বিষয়ে যিনি দক্ষ সেটা নিয়েই তারা কাজে নেমে পড়েছেন। তাদের অনেকেই এখন ভালো করছেন। তিনি জানান, নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সুগম করতে তারা বিভিন্ন ধরনের দিকনির্দেশনা, সক্ষমতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ, আর্থিক বিষয় ইত্যাদি নিয়ে প্রশিক্ষণ দেন। এসবের সুফল এখন নারী উদ্যোক্তারা ভোগ করছেন।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম শোভন জানান, ই-ক্যাবের সদস্য সংখ্যা ১৬৪৫। এরমধ্যে ২৭ শতাংশ নারী। তারা ভালো করছেন।

ভালো করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ খুবই কম। অন্য অভিযোগও তেমন আসে না। আস্থা তৈরি হওয়াই সফলতার মূল কারণ।

তবে তিনি এও জানান, করোনার সময় আমাদের অনেক সদস্য নারী উদ্যোক্তা এ খাত থেকে ছিটকে গেছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। তাদের কেউ কেউ ফিরতে শুরু করেছেন। শোভন উল্লেখ করেন, ই-ক্যাবে প্রচলিত ই-কমার্স ও ফেসবুকভিত্তিক কমার্স (এফ-কমার্স) দুই ধরনের উদ্যোক্তাই রয়েছেন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close