তানিউল করিম জীম

  ২৬ এপ্রিল, ২০২২

অনুকরণীয় নারী মালিহা

সময়ের সঙ্গে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে। ঘরে-বাইরে কাজ করছেন সমানতালে। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যবসা সবক্ষেত্রেই আজ নারীর সাফল্যের গল্প। সমাজে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও যারা সেই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে অর্জন করেছেন কাক্সিক্ষত সাফল্য, সত্যি তারা অনুকরণীয় অন্য নারীদের জন্য। অবসরপ্রাপ্ত বিচারক মো. আজিজুল হক এবং মোছা. নূরজাহান বেগমের মেয়ে মাশশারাত মালিহা তেমনি এক অনুকরণীয় নারী। যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি অনুষদের পঞ্চম বর্ষে পড়াশোনা করছেন। সব প্রতিবন্ধকতা পাশ কাটিয়ে তিনি অর্জন করেছেন বিভিন্ন বিষয়ে দুই বছরে প্রায় বিশটি পুরস্কার। সর্বশেষ বাকৃবির উইমেন সাইক্লিং ক্লাব থেকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নারী শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দানকারী এবং অনুকরণীয় নারীদের জন্য প্রদানকৃত ‘স্পার্কেল অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন। বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি জেলা করেছেন ভ্রমণ। তার গল্প শুনেছেন তানিউল করিম জীম। আজ মালিহার মুখেই শুনব তার গল্প।

ঢাকায় জন্মের পর কয়েক বছর কাটিয়ে ২০০৬ সালে বাবার চাকরি সূত্রে পাড়ি জমায় খুলনায় ভৈরব নদীর কোলঘেঁষে সবুজ ক্যাম্পাসে। তখন ব্যাডমিন্টন, আবৃত্তি, ড্রয়িংয়ে পার হচ্ছিল শৈশব। তৃতীয় শ্রেণিতে সরকারি স্কুলে ভর্তির পর বলা যায় পুরো সময়টা ছিল এক অজানা আমি কে আবিষ্কারের সূচনা। চতুর্থ শ্র্রেণির বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অঙ্ক দৌড় আর বার্ষিক মিলাদের কিরাত প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার মাধ্যমে যার শুরু। পঞ্চম শ্র্রেণিতে পেলাম এক নতুন অভিজ্ঞতা গণিত উৎসবে প্রথম রানারআপ হওয়ার। ষষ্ঠ শ্রেণিতে হলাম চ্যাম্পিয়ন। বিজয়ী হলাম অ্যাস্ট্রোনমি অলিম্পিয়াডেও। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রতি বছর ব্যাডমিন্টন, কিরাত, রচনা, আবৃত্তি, গজল/হামদ নাতে প্রথম বা দ্বিতীয় পুরস্কারটি একদম যেন নিজের করে নিয়েছিলাম। স্কুলজীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে দশম শ্রেণিতে পড়াকালীন সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে বছরের সেরা মেধাবী নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে। জাতীয় পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণের স্মৃতি কখনো ভুলবার নয়। আর এতসব সহশিক্ষা কার্যক্রমের ভিড়ে ঠিক রেখেছিলাম ছাত্রজীবনের প্রধান কর্তব্য পড়াশোনাটাও। বিভিন্ন বৃত্তির পাশাপাশি এসএসসিতেও জুটেছিল গোল্ডেন জিপিএ ৫। বড় আপুদের বিদায় দিতে দিতে ছোট মাশশারাত থেকে বিদায়বেলায় সিক্ত হলাম ছোটবোনদের ভালোবাসায়। সবাই এসে জড়িয়ে ধরছিল আর বলছিল, মাশশারাত আপু, চলে যাবেন আপনারা? স্কুলের বাইরেও আমার খুলনার ক্যাম্পাসের কথা আজীবন স্মরণীয়। শৈশবের দিনভর খেলাধুলা, কতশত গল্প-কথা, ছোট মালিহা থেকে সবার মালিহা আপু হয়ে ওঠা, আজও আমায় অনেক বেশি স্মৃতিকাতর করে তোলে। আমি হারিয়ে যাই সেই ভৈরবের ঢেউয়ে, আমার উদাস মন আকুল হয় সেই সবুজের মায়ায় আরো একবার মিশে যেতে।

শুরু হলো কলেজজীবনের নতুন অধ্যায়। বাবা অবসরপ্রাপ্ত হবেন, সব মায়ার বাঁধন ত্যাগ করে পাড়ি জমাতে হবে স্থায়ী ঠিকানা ঢাকায়। যদিও মিশুক আমি খুব সহজেই মিশে গেলাম নতুন বান্ধবীদের সঙ্গে। ব্যস্ত সময়েও হারিয়ে যেতে দেইনি নিজের ভালো লাগাগুলোকে। কিরাত, আবৃত্তি, রচনা, বক্তব্য প্রতিযোগিতা তো আছেই, সেই সঙ্গে ক্যালিগ্রাফিতেও প্রথম পুরস্কার পেয়ে নিজের আরো একটি প্রতিভার সন্ধান পেলাম। দুই বছরে ঘরে উঠল প্রায় বিশটি পুরস্কার। চোখের পলকেই পার হয়ে গেল আমার দুই বছরের কলেজ জীবন।

ভর্তি হলাম কৃষি শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সবাই কৃষি অনুষদ নিতে বললেও নিজের তীব্র ইচ্ছায় বেছে নিলাম ভেটেরিনারি অনুষদ। আমার কাছে ক্যারিয়ারে ভুল চয়েস বলতে কিছু নেই। আমি বিশ্বাস করি, আমি যেই সিদ্ধান্তকে ভুল ভাবছি, সেই ভুলটাই হয়তো অনেকে করতে চান, কিন্তু সুযোগ পান না। পড়াশোনার বাইরে প্রথম বর্ষেই ব্যাডমিন্টন খেলায় হলাম চ্যাম্পিয়ন, টেবিল টেনিসে রানার্সআপ। ‘বাউডিএস’-এর মাধ্যমে বিতর্কের সঙ্গে সখ্যতায় কখনো বিতার্কিক কখনোবা বিচারক হিসেবে এলো সাফল্য। ‘ইয়ুথ অপরচুনিটিস’ কর্তৃক আয়োজিত পরিবেশ বিষয়ক কন্টেস্টে পরপর দুবার সেরা দশে জায়গা করে নিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিভিন্ন সংগঠনের আয়োজনসহ দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক পুরস্কার ভাগ্যে জুটেছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হাসিমুখ’-এর মাধ্যমে পাশে দাঁড়িয়েছি দুঃখী মানুষের করেছি নানা সামাজিক কর্মকান্ড। জীবন ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে অজস্র অসহায় মানুষের অব্যক্ত ভালোবাসা।

ব্যক্তিগত জীবনে অনেকেই বলে আমি নাকি ধৈর্যশীল, অনেক পজিটিভ। আদৌ কতটুকু কী জানি না। তবে চেষ্টা করি পজিটিভ থাকার। খুব ছোটবেলা থেকেই মিথ্যা সহ্য করতে পারি না। তাই বড় বড় কাজ থেকে শুরু করে খুব ছোট কাজেও আজ অবধি সজ্ঞানে মিথ্যার আশ্রয় নেইনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, সত্যের চেয়ে বড় কোনো সত্য দুনিয়ায় নেই। এ পর্যন্ত ভ্রমণ করেছি বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি জেলা। সেই ছোটবেলা থেকেই আমার বাবা-মা আমায় ডানা মেলে উড়তে শিখিয়েছে। আর আজ তাই তাদের বিশ্বাস ভঙ্গের কথা ভাবতেও পারি না। জানি না আদৌ ভবিষ্যতে কতদূর কী করতে পারব। তবে সফলতা? সে তো বড়ই আপেক্ষিক। কারো জীবনের স্বপ্ন বড় কারোবা ছোট। আর সেই সব স্বপ্ন পূরণ করাই সফলতা।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close