reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ০৬ জুলাই, ২০২১

হার না মানা ভাস্কর প্রিয়ভাষিণী

জন্ম ও শৈশব

দেশভাগের প্রাক্কালে ১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর জন্ম খুলনায় নানার বাড়িতে। তার বাবার নাম সৈয়দ মাহবুবুল হক এবং মায়ের নাম রওশন হাসিনা। বাবা-মায়ের ১১ সন্তানের মধ্যে প্রিয়ভাষিণী ছিলেন সবার বড়। খুলনায় তার জন্মস্থান নানা বাড়ির নাম ছিল ‘ফেয়ারী কুইন’ বা ‘পরীর রাণী’। প্রিয়ভাষিণীর ব্যক্তি ও শিল্পী জীবনে এই নানা বাড়ির প্রভাব অপরিসীম। এই নানা বাড়িতেই কেটেছে তার শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো। এখানেই প্রকৃতির সঙ্গে মিলে-মিশে একাত্ম হওয়ার প্রথম সুযোগ ঘটে তার। খুব ছোটবেলা থেকেই অনেক বিখ্যাত মানুষের সান্নিধ্যে আসতে পেরেছিলেন তিনি।

শিক্ষা ও বৈবাহিক জীবন

তিনি খুলনার পাইওনিয়ার গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি এবং খুলনা গার্লস স্কুল থেকে এইচএসসি ও ডিগ্রি পাস করেন।

১৯৬৩ সালে তিনি প্রথম বিয়ে করেন। কিন্তু সেই সংসার টিকেনি। পরে ১৯৭২ সালে প্রিয়ভাষিণী দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। তার দ্বিতীয় স্বামী আহসান উল্লাহ আহমেদ ছিলেন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। জীবন-সংগ্রামে তার সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিলেন স্বামী। তাদের ছয় সন্তান। তিন ছেলে ও তিন মেয়ে।

কর্মজীবন

১৯৭৭ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। মাঝে কিছুদিন স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। তিনি ইউএনডিপি, ইউএনআইসিইএফ, এফএও, কানাডিয়ান দূতাবাস প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। শেষ বয়সে এসে শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেন এবং তা অবিরামভাবে অব্যাহত রাখেন।

তিনি বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ভাস্কর। তার শিল্পকর্ম বেশ জনপ্রিয়। মূলত ঘর সাজানো এবং নিজেকে সাজানোর জন্য দামি জিনিসের পরিবর্তে সহজলভ্য জিনিস দিয়ে কীভাবে সাজানো যায় তার সন্ধান করা থেকেই তার শিল্পচর্চার শুরু। নিম্ন আয়ের মানুষ কীভাবে অল্প খরচে সুন্দরভাবে ঘর সাজাতে পারে সে বিষয়গুলো তিনি দেখিয়েছেন। ঝরা পাতা, মরা ডাল, গাছের গুঁড়ি দিয়েই মূলত তিনি গৃহের নানা শিল্পকর্মে তৈরি করতেন।

একাত্তর ও প্রিয়ভাষিণী

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর জীবনের সঙ্গে মিশে আছে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস, মিশে আছে বীরাঙ্গনাদের দুর্বিষহ জীবন কাহিনি। তিনি একাত্তরের ভয়াবহ ধর্ষণ সম্পর্কে একমাত্র জবানবন্দি-দানকারী। ট্রাইব্যুনালে রাজাকার ও তাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

সাহসী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী তার সাক্ষাৎকারে (একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতি, সম্পাদনা শাহরিয়ার কবির) জানান, ‘রাতে ফিদাইর (উচ্চ পদস্থ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা) চিঠি নিয়ে ক্যাপ্টেন সুলতান, লে. কোরবান আর বেঙ্গল ট্রেডার্সও অবাঙালি মালিক ইউসুফ এরা আমাকে যশোরে নিয়ে যেত। যাওয়ার পথে গাড়ির ভেতরে তারা আমাকে ধর্ষণ করেছে। নির্মম, নৃশংস নির্যাতনের পর একপর্যায়ে আমার বোধশক্তি লোপ পায়। ২৮ ঘণ্টা চেতনাহীন ছিলাম।’

নিজের ওপর হওয়া অত্যাচারের বিবরণ দিতে গিয়ে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘পাকিস্তানি সৈন্যরা কত তারিখে আমার বাসায় এসেছিল তা আমার মনে নেই কারণ আমি যখন ডায়েরি লিখতে শুরু করেছিলাম কিন্তু সেটা আমাকে ফেরত দেওয়া হয়নি ফলে আমি মনে করতে পারছি না। তবে সম্ভবত এটা অক্টোবরের প্রথম দিকে হয়েছিল। ২৮ ঘণ্টা বন্দি ছিলাম ক্যাম্পে।’

তিনি আরো বলেন, ‘...তারা আমাকে এক ঘণ্টা ধরে গালাগালি করে, শারীরিক নির্যাতন করে গাড়িতে করে নিয়ে চলল। আসলে এগুলো বলতে ইচ্ছে করে না।’

আমি যখন নোয়া পাড়ার ওদিকে যাই তখন হোটেল আল-হেলাল ছিল। একটা কফি দোকান ছিল। আমাকে ওখানে নিয়ে গিয়ে বলল কফি খাবে? তখন আমার ভেতরটা কলঙ্কিত তখন আমি নিজের সঙ্গে নিজেই দেখা করতে ভয় পেতাম। অন্ধকারের সঙ্গে দেখা করতেও ভয় পেতাম, আলোর সঙ্গেও দেখা করতে ভয় পেতাম। সব সময় আমার মধ্যে সংকোচ কাজ করত। পেছনে দাঁড়ানো ছাড়া আর সামনে দাঁড়াতাম না। এমনই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম।

এরপর তারা হুইস্কি কুলি করে আমার মুখে ছিটিয়ে দিচ্ছিল। আর বলছিল ‘she should co-operate us otherwise puts on dick on her private parts’ এই উক্তিটা আমার এখনো মনে আছে। এই কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমি অনেক ভয় পেয়েছিলাম। তখন আমি বললাম প্লিজ তোমরা আমাকে একটা উপকার কর আমি তোমাদের সব সহযোগিতা দেব শুধু তোমরা আমাকে হত্যা কর। আমি উর্দুতে একবার ইংরেজিতে একবার বলছিলাম প্লিজ আমাকে হত্যা কর। তোমাদের সব সহযোগিতা করব। আমাকে রেপ কর আমার আপত্তি নেই তবে আমাকে হত্যা কর। তবু আমাকে ক্যাম্পে নিয়ে যেও না। তার পরও ক্যান্টনমেন্টে তারা আমাকে নিয়ে গেল।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী নিজের স্মৃতিকথায় জানান, সে সময় তার বাবার কলিগ অফিসার ভূঁইয়া হত্যায় তাকে সন্দেহ করছিল পাকিস্তানি সেনারা। এমনকি ওই এলাকায় যেসব হত্যা হচ্ছে সবগুলোর পরিকল্পনাও প্রিয়ভাষিণীই করছেন এমন ধারণা থেকেই তারা তাকে ৯ মাস তাড়া করে বেড়ান, এমনকি তার কর্মস্থলেও নজরদারি শুরু করে। তার ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করায়ও তাকে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

পাকিস্তানি ক্যাম্পে নির্যাতন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এই লড়াকু নারী বলেন, ‘প্রথম পর্যায়ে আমি দুই থেকে তিনজন অফিসার দ্বারা রেপ হয়েছি এবং আমি কিছু বলতে পারিনি। আমি যেন নির্বোধ একটা জীব-জন্তুতে পরিণত হয়েছিলাম। এখানে আমার কোনো শক্তিও ছিল না আমার কোনো সাহসও ছিল না’।

অবশেষে মুক্তি ও ফিরে আসা

পরে এক মেজরের সহায়তায় সেই ক্যাম্প থেকে মুক্তি পান ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। কিন্তু সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে পরিবারের কাছে ফিরে আসাটা কি খুব সহজ ছিল?

‘পরিবার বলতে; আমার মা-ও একজন প্রগতিশীল মহিলা ছিলেন। বলা চলে তিনি নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা। কারণ তিনি ছোট্ট আকারে একটা হোম খুলে ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। আমার মা আর তার বান্ধবী মিলে যশোরের রেল রোডে একটা বাড়িতে চিলেকোঠায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাশতা দিতেন। তিনি তার ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। আমার ভাই শিবলী কোনো দিন বিয়ে করেনি সেও পূর্ণদ্যোমে মুক্তিযুদ্ধ যোগ দিল টেলিফোনে চাকরি করাকালীন। তখন একটা সুবিধা ছিল অনেক কমিউনিকেশন তার ছিল। ফলে সে অনেক খবর আনতে পারব। ডিনামাইড আনা ও এগুলোতে লিড দেওয়ার মধ্যে আমার ভাই শিবলী একজন ছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লিস্টেও তার নাম আছে। যুদ্ধের বিষয়ে তারা ঠিক ছিল কিন্তু আমার বিষয়ে তারা একটু নড়ে গিয়েছিল যে; আমাকে বাসায় গ্রহণ করা যাবে না। খুব অবাধে বাড়িতে যেতে পারিনি আসলে। আমার নিজের মধ্যেও সংকোচ ছিল যে; আসলে আমি বিশাল কলঙ্কের বোঝা নিয়ে কারো সামনে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতাম না যদিও আমার মা কোনোকালেই এসব নিয়ে প্রশ্ন করেননি’ বলেন প্রিয়ভাষিণী।

কিন্তু জীবনের এত ক্লেদ, এত নিষ্ঠুরতার পরও উঠে দাঁড়িয়েছেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। মানুষের কাছ থেকে এত পাশবিক আচরণ পেয়েও ফিরে গেছেন, আবার মানুষের কাছেই, জীবনের কাছেই। তার জীবনের শত নিষ্ঠুর নির্মমতাই পরে তার জীবনের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

পুরস্কার ও সম্মাননা

শিল্পকলায় অসাধারণ অবদানের জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশের ‘সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার’ হিসেবে পরিচিত ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ দেওয়া হয় তাকে। এ ছাড়া তিনি হিরো বাই দ্য রিডার ডাইজেস্ট ম্যাগাজিন (ডিসেম্বর ২০০৪); চাদেরনাথ পদক; অনন্য শীর্ষ পদক; রৌপ্যজয়ন্তী পুরস্কার (ওয়াইডব্লিউসিএ); মানবাধিকার সংস্থা কর্তৃক মানবাধিকার পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

স্বাধীনতাযুদ্ধে তার অবদানের জন্য ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট বাংলাদেশ সরকার তাকে মুক্তিযোদ্ধা খেতাব দেয়। ৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ‘সুলতান স্বর্ণপদক’ পান ভাস্কর শিল্পী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী।

মৃত্যু

দীর্ঘদিন নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর ৬ মার্চ, ২০১৮, রোজ মঙ্গলবার, বেলা পৌনে ১টায় রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালের সিসিইউয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তিন ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন তিনি।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী বলেছিলেন, ‘সকল বীরাঙ্গনা নারী জাতির পক্ষ থেকে বলব যারা সেদিন নীরবে যুদ্ধ করেছেন, অত্যাচারের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ করেছেন, ধর্ষণের মধ্য দিয়ে, অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ করেছেন তাদেরও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত দেওয়া উচিত।’ তার সেই দাবি, তার সেই লড়াই-ই পুনঃপুনঃ উজ্জীবিত হয়ে উঠুক সব জানা-অজানা বীরাঙ্গনার কণ্ঠে।

তথ্যসূত্র : সংগৃহীত

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close