নিজস্ব প্রতিবেদক

  ০৮ জুলাই, ২০২৪

‘বাংলা ব্লকেডে’ অচল রাজধানী, দুর্ভোগ

* শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, নীলক্ষেত, কারওয়ানবাজার, বাংলামোটর, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের মোড় ও চানখারপুলে সড়ক অবরোধে তীব্র যানজট, ভোগান্তি * বিক্ষোভে উত্তাল বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

কোটা বাতিল করে ২০১৮ সালে সরকারের জারি করা পরিপত্র পুনর্বহালসহ চার দফা দাবি আদায়ে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এতে তীব্র যানজটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী।

গতকাল রবিবার বিকেল ৩টায় রাজধানীতে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেন কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীরা। এরপর একে একে শাহবাগ, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের মোড়, বাংলামোটর ও কারওয়ানবাজার মোড়, হাতিরঝিল, হাতিরপুল, নীলক্ষেত, সায়েন্সল্যাব মোড়, চানখারপুল অবরোধ করেন তারা। এতে এসব এলাকা দিয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে পুরো রাজধানীতে দেখা দেয় তীব্র যানজট। চরম ভোগান্তিতে পড়েন অফিস শেষে ঘরমুখো মানুষ। এর আগে বিকেল ৩টায় শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হন। প্রতিটি হল ও বিভাগ থেকে মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারীরা গ্রন্থাগারের দিকে আসতে থাকেন। আন্দোলনকারীরা গ্রন্থাগারের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ভিসি চত্বর-টিএসসি হয়ে শাহবাগে গিয়ে জড়ো হন। এরপর তারা সেখানে অবরোধ করেন।

এদিকে আজিমপুর-নিউমার্কেট মোড়ও অবরোধ করেন ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা। অবস্থানের কারণে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। রাস্তা বন্ধ করে চানখারপুলে আন্দোলনকারীরা রাস্তার ওপর ক্রিকেট-ফুটবল খেলেন। মিছিল ও অবরোধের সময় শিক্ষার্থীরা ‘অবরোধ-অবরোধ, সারা বাংলা অবরোধ’; ‘এক দফা এক দাবি, কোটা নট কামব্যাক’; ‘বাধা দিয়ে আন্দোলন, বন্ধ করা যাবে না’; ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’; ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’; ’১৮-এর পরিপত্র, পুনর্বহাল করতে হবে’; ‘কোটাপ্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক’; ‘সারা বাংলায় খবর দে, কোটাপ্রথার কবর দে’; ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’; ‘জেগেছে রে জেগেছে, ছাত্রসমাজ জেগেছে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন তারা।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ও ছাত্র ধর্মঘট কর্মসূচিও পালন করছেন কোটাবিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের পাশাপাশি আরো তিনটি দাবি জানান। এগুলো হলো- ২০১৮ সালের পরিপত্র বহালসাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুতসময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দিতে হবে, সেক্ষেত্রে সংবিধান অনুযায়ী শুধু অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে; সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না ও কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোয় মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হবে এবং দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানায়, সোমবারও (আজ) বাংলা ব্লক নামে অবরোধ করবেন।

এদিকে রাজধানী ছাড়াও কোটাবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের ২ নম্বর গেট এলাকায় দুপুর থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে ২ নম্বর গেট থেকে মেডিকেল, মুরাদপুর, বায়েজিদ সড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ এ মোড়ের চার সড়কে দীর্ঘ যানজট দেখা যায়। এতে শত শত যাত্রী গাড়ি আটকা পড়ে। অনেককে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। ব্যক্তিগত গাড়ি করে বাসায় ফিরছিলেন এক নারী সঙ্গে ছিল তার এইচএসসি পরীক্ষার্থী মেয়ে। তিনি বলেন, এ জ্যাম ধানমন্ডি পর্যন্ত ছড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের খুব ভোগান্তি হচ্ছে। দুপুর ২টা থেকে রাস্তায় বসে আছি, এখন সাড়ে ৩টা বাজে। সাভার পরিবহনের এক বাসচালক বলেন, গাড়ি নিয়ে সায়েন্সল্যাব আসতেই দেখি রাস্তা বন্ধ। এখানেই প্রায় ১ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি। কখন ছাড়বে জানি না।

ডিএমপির ধানমন্ডি জোনের সহকারী কমিশনার (ট্রাফিক) নবকুমার বিশ্বাস বলেন, কলাবাগান সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি, নীলক্ষেত আশপাশের এলাকায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে পুরো সড়ক বন্ধ হয়ে আছে। কোনো গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। তবে ধানমন্ডি থেকে গাবতলীর সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। ফার্মগেট হয়ে গাজীপুরগামী এক বাসের চালক বলেন, গাড়ি নিয়ে দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি। পেছনে গাড়ির সারি। ঘুরিয়ে যে চলে যাব সেই সুযোগও নেই। যানজটে অতিষ্ঠ হয়ে অনেককেই বাস থেকে নেমে হেঁটে চলে যাচ্ছে। ডিএমপির কারওয়ান বাজার জোনের সহকারী কমিশনার (ট্রাফিক) স্নেহাশীষ কুমার দাস বলেন, কোটাবিরোধী আন্দোলনের ফলে কোনো গাড়ি কারওয়ানবাজার থেকে শাহবাগের দিকে যেতে পারছে না। ফলে এ যানজট ফার্মগেট-তেজগাঁও ছাড়িয়ে বিজয় সরণি পর্যন্ত পৌঁছেছে। সপ্তাহের প্রথম দিন সব অফিস আদালত খোলা থাকায় সড়কে গাড়ির চাপও বেশি।

উত্তাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস : তৃতীয় দিনের মতো ফের ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ফলে তীব্র যানজট দেখা দেয়। দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা। অবরোধের ফলে মহাসড়কের উভয় পাশে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয় এবং যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সাধারণ শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে একাত্মতা পোষণ করে কোটা সংস্কার ও বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন শিক্ষক। বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান করেছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা চত্বর থেকে মিছিল বের করেন তারা। মিছিলটি ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের মহাসড়কে অবস্থান নেন। ফলে দেখা দেয় তীব্র যানজট। আটকে থাকে গাড়ি।

একই দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আবারো অবরোধ করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ অবরোধে অংশ নেন শিক্ষার্থীরা। এ অবরোধের ফলে সড়কের দুই পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। বিকেল সাড়ে ৩টায় শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ৪টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এসে সড়ক অবরোধ করেন। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করেন। ফলে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।

সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। বিকেল সাড়ে ৩টায় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি নিয়ে প্রধান ফটকে অবস্থান করে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। পরে বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে সমস্বরে জাতীয় সংগীত গায় আন্দোলনকারীরা। এ সময় শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ঘোষণা দেন তারা। অবরোধের ফলে সড়কের দুই পাশজুড়ে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। এছাড়া কোটাবিরোধী আন্দোলনে ময়মনসিংহ নগরীতে জামালপুরগামী অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেন অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে যাত্রী সাধারণের মাঝে ব্যাপক ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। গতকাল বিকেল পৌনে ৪টায় নগরীর সানকিপাড়া রেলক্রসিং এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে এ ট্রেন অবরোধের ঘটনা ঘটে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ব্যানারে রাজনৈতিক দল : শিক্ষার্থীদের চলমান কোটাবিরোধী আন্দোলনে একাত্মতা পোষণ করেছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট। একইসঙ্গে দুই দফা দাবিও জানান সংগঠনটির নেতারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেয় দলটি। এছাড়া চলমান শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ‘প্রত্যয়’ ঠেকাও কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি, গণতন্ত্র মঞ্চ, জাতীয় পার্টিসহ দেশের বিরোধী দলগুলো। দলগুলোর এ সমর্থন গতকাল রবিবারও অব্যাহত ছিল।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close