মেহেদী হাসান

  ০৭ জুলাই, ২০২৪

প্রাণ-প্রকৃতিতে বিষ ছড়াচ্ছে পার্থেনিয়াম

দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রাস্তার পাশে, ফসলের মাঠ কিংবা পতিত জমিতে ব্যাপক হারে দেখা মিলছে পার্থেনিয়াম নামক ক্ষতিকারক আগাছার। প্রাণ-প্রকৃতিতে বিষ ছড়ানো এ আগাছা মানুষ ও পোষা প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বছর তিনেক আগে পার্থেনিয়াম আগাছা নিধন কর্মসূচি পালন করে কিছুটা নিয়ন্ত্রণের দাবি করলেও বর্র্তমানে আর কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। ফলে ব্যাপক হারে বাড়ছে এ ভয়ংকর উদ্ভিদ, বাড়ছে উদ্বেগ। ঝুঁকি বাড়ছে ফসলের খেত ও মানুষের শারীরিক ক্ষতির।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয়ভাবে দেখামাত্রই উদ্ভিদটি পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এ সচেতনতা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে কৃষি বিভাগকে। তথ্য বলছে, পার্থেনিয়ামের আদি বাসস্থান মেক্সিকো। গম আমদানির জেরে আগাছার বীজ আসে উপমহাদেশে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, চীন, পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এ ভয়ংকর উদ্ভিদ। দেশে বেশি দেখা মিলছে সীমান্তবর্তী এলাকা রাজশাহী, দিনাজপুর ও খুলনায়। সীমান্ত থেকে ছড়িয়ে পৌঁছে গেছে রাজধানীতেও। ফসলি জমিতে কম হলেও অনাবাদি উঁচু জমি ও রাস্তার দুই ধারে ব্যাপকভাবে দেখা মিলছে।

তীব্র গরম কিংবা অতিবর্র্ষায় টিকে থাকার বিশেষ গুণ- যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশে বাঁচতে সক্ষম এ আগাছার স্পোর ও বীজ।

সরেজমিন রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকার রাস্তার দুই ধারে দেখা গেছে পূর্ণবয়স্ক ও চারা পার্থেনিয়াম। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের বীজ পরিবহন ধারণা ও কৃষি বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের ধারণা, গরুর গোবর, গাড়ির চাকার সঙ্গে লেপটে, সেচের মাধ্যমে এবং জুতার তলার কাদার সঙ্গে লেপটে বীজ ছড়িয়েছে পার্থেনিয়াম। এমনকি পার্থেনিয়ামের ফুলের পরাগ অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও হালকা হওয়ায় বাতাসের মাধ্যমে সহজেই জীবনচক্র চালিয়ে যেতে পারে। ভারতীয় বীজ গমের মাধ্যমে আমাদের দেশে এসেছে পার্থেনিয়াম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ বিভাগের অনেকটা উদাসীনতা ও জনবল সংকটের কারণে যাচাই না করে বীজ আমদানিতে এ উদ্ভিদের গোড়াপত্তন হয়েছে বাংলাদেশে।

আমাদের দেশে যে পার্থেনিয়াম দেখা যায়, তার বৈজ্ঞানিক নাম পার্র্র্থেনিয়াম হিস্টারোফোরাস। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৬ প্রজাতির মধ্যে এটিই সবচেয়ে বিষাক্ত উদ্ভিদ। উদ্ভিদবিজ্ঞান ফিনোটাইপিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ তথ্য বলছে, শিরাযুক্ত, নরম কাণ্ডবিশিষ্ট একবর্ষজীবী, গুল্মজাতীয় আগাছা পার্থেনিয়াম। এ উদ্ভিদ সাধারণত এক থেকে দেড় মিটার উচ্চতার হয়। বহুকাণ্ড ও শাখা বিশিষ্ট উদ্ভিদ ছোট ছোট সাদা ফুল উৎপন্ন করে। ফুল সাধারণত গোলাকার, সাদা, পিচ্ছিল। চার মাসের মধ্যে জীবনচক্র সম্পূর্ণ করে। একটি গাছ থেকে ৪-৫ হাজার গাছ জন্মাতে পারে। এটাই পার্থেনিয়ামের দ্রুত বংশবৃদ্ধির কারণ। একটি গাছ তিন-চার মাসের মধ্যে ৪ থেকে ১ লাখ বীজ উৎপন্ন করে। পুরো আগাছাটিই ক্ষতিকর।

বিশেষ করে এর ফুলের রেণুতে থাকা সেস্কুটার্পিন ল্যাকটোন জাতীয় বিষাক্ত পদার্থ পার্থেনিন মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এর মধ্যে রয়েছে বিষাক্ত রাসায়নিক ক্যাফেইক অ্যাসিড, পি-অ্যানিসিক অ্যাসিড প্রভৃতি, ক্ষতস্থানে রক্তের সঙ্গে মিশে চর্মরোগ হতে পারে। ফুলের রেণু বা বীজ নাকে প্রবেশ করলে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও জ্বর হয়। গবাদিপশু এ আগাছা খেলে অন্ত্রে ঘা দেখা দেয়, দুধ উৎপাদন কমে যায়। এর পুষ্পরেণু বেগুন, টমেটো, মরিচের মতো সবজি উৎপাদন ব্যাহত করে। মাটিতে নাইট্রোজেন আবদ্ধকরণের প্রক্রিয়াও ব্যাহত করে।

কৃষি বিভাগ বলছে, ক্ষতিকারক এ উদ্ভিদ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন ও নিধনে নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা। গাছটি অঞ্চলভেদে কংগ্রেস ঘাস, গাজর ঘাস, চেতক চাঁদনী, হোয়াইট টপ ও স্টার উড প্রভৃতি নামেও পরিচিত। পুরো আগাছাটিই ক্ষতিকর। বিশেষ করে এর ফুলের রেণুতে থাকা সেস্কুটার্পিন ল্যাকটোন জাতীয় বিষাক্ত পদার্থ পার্থেনিন মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এর মধ্যে রয়েছে বিষাক্ত রাসায়নিক ক্যাফেইক অ্যাসিড, পি-অ্যানিসিক অ্যাসিড প্রভৃতি, ক্ষতস্থানে রক্তের সঙ্গে মিশে চর্মরোগ হতে পারে। ফুলের রেণু বা বীজ নাকে প্রবেশ করলে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও জ্বর হয়। গবাদিপশু এ আগাছা খেলে অন্ত্রে ঘা দেখা দেয়, দুধ উৎপাদন কমে যায়।

প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক আলম শাইন বলেন, গাছের পাতা গায়ে লাগলে পশুর শরীর ফুলে যায়। এছাড়া তীব্র জ্বর, বদহজমসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়। আর পশুর পেটে গেলে কেমন বিষক্রিয়া হতে পারে, তা অনুমেয়। বিশেষ করে গাভি পার্থেনিয়াম খেলে দুধ তিতা হয়। শুধু পশুই নয়, আগাছাটি মানুষের হাতে-পায়ে লাগলে চুলকে লাল হয়ে ফুলে যায়। আক্রান্ত মানুষটি ঘনঘন জ্বর, অসহ্য মাথাব্যথা ও উচ্চরক্তচাপে ভুগতে থাকে। উপমহাদেশের কৃষিবিদরা বিষাক্ত আগাছা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি শুধু বিষাক্তই নয়, যেকোনো ধরনের ফসলের ব্যাপক ক্ষতিও করে। প্রায় ৪০ শতাংশ ফসল কম ফলে, যদি কোনো খেতে পার্থেনিয়ামের বিস্তার ঘটে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গবেষণা বিভাগ বলছে, গাছটিকে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। সতর্ক না হলে যেকোনো ব্যক্তি বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন। যেমন এটি কেউ কাটতে গেলে ওই ব্যক্তির হাতে-পায়ে লাগতে পারে। পোড়াতে গেলে ফুলের রেণু দূরে উড়ে বংশবিস্তার করতে পারে। আবার ব্যক্তির নাকে-মুখেও লাগতে পারে। তাতে তিনি মারাত্মক বিষক্রিয়ায় পড়তে পারেন। এক্ষেত্রে খুব সতর্কতার সঙ্গে প্রথমে গাছটিকে কাটতে হবে। হাতে গ্লাভস, চোখে চশমা থাকলে ভালো হয়। অবশ্যই পা ভালোমতো ঢেকে রাখতে হবে। মোটা কাপড়ের প্যান্টের সঙ্গে বুটজুতা পরা যেতে পারে, সঙ্গে মোটা কাপড়ের জামাও পরতে হবে। গাছকাটা হলে গভীর গর্তে পুঁতে ফেলতে হবে। এছাড়া রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আগাছানাশক ব্যবহার করে এ গাছ দমন করা যায়। সেক্ষেত্রে ডায়ইউরোন, টারবাসিল, ব্রোমাসিল আধা কেজি ৫০০ লিটার জলে মিশিয়ে হেক্টর প্রতি প্রয়োগ করতে হবে। আবার প্রতি হেক্টরে ২ কেজি ২.৪ সোডিয়াম লবণ অথবা এমসিপি ৪০০ লিটার জলে মিশিয়ে স্প্রে করেও এ আগাছা দমন করা যেতে পারে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে গবেষণা ও পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আগ্রাসী আগাছা পার্থেনিয়াম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের। তাই এ বিষয়ে তারা স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষাক্ত আগাছা পার্থেনিয়ামের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি এবং বাতাসের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়ায়। আগাছাটি জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও কৃষির জন্য নীরব ঘাতক। পৃথিবীর অনেক দেশেই পার্থেনিয়াম থেকে বায়োগ্যাস, বায়োফার্টিলাইজার ও আগাছানাশক তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ উদ্ভিদের ব্যাপারে মানুষ সচেতন নন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সময় থাকতে পার্থেনিয়াম আগাছা নির্র্মূল করতে হবে। মানুষ ও প্রাণীর জন্য মারাত্মক এ আগাছা নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে মাঠে নামতে হবে। জুন-জুলাই মাসে এ আগাছার বিস্তার হয়। ফুল আসার আগে মূলসহ উপড়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। রাসায়নিক দিয়ে আগাছা দমন করা সঠিক পদ্ধতি নয়। অন্যান্য আগাছা রেখে মানুষকে এ আগাছা চেনাতে হবে। দেখামাত্র উপড়ে ফেলতে হবে। সবাই মিলে চেষ্টা করলে এখনো নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

২০১১-২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় পার্থেনিয়াম নিয়ে গবেষণা করেছেন বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট যশোর আঞ্চলিক কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. ইলিয়াছ হোসেন। তিনি বলেন, একটি পার্থেনিয়াম থেকে ৬০ হাজার গাছের জন্ম হতে পারে। আশপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাতাসের সাহায্যে এর বীজ ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় সীমান্তবর্তী রাজশাহী ও যশোর এলাকায় এ আগাছার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। এটি মানুষ, গবাদিপশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া ফসলের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। ফলে এর বিস্তার খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ভারত থেকে পণ্যবাহী ট্রাক বা গরু-মহিষের বিষ্ঠার সঙ্গে হয়তো এর বীজ চলে এসেছে। রাজশাহীর চারঘাট-বাঘাসহ বিভিন্ন এলাকায় খুব দ্রুত এ আগাছা ছড়িয়ে পড়েছে। ফসল ও পরিবেশ রক্ষায় এ আগাছা নিধনে আমাদের সবারই কাজ করা উচিত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অদিপ্তর পার্থেনিয়াম নিধনে কাজ করেছে। বছর তিন-চারেক আগে আমরা নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলাম। বর্তমানে খুববেশি যে দেখা যাচ্ছে, এমনটি মনে হয় না। যদি বেশি হয়, তাহলে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমে নির্মূল করা হবে। ক্ষতিকারক পার্থেনিয়াম সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে ও নিধনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close