গাজী শাহনেওয়াজ

  ২৫ জুন, ২০২৪

জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট

খাবার বড়ির মজুদ নেই ২৮৭ উপজেলায়

কোথাও মিলছে না জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রী। এ কারণে হুহু করে বেড়ে যেতে পারে জনসংখ্যা। ধারণা করা হচ্ছে, পরিবার-পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কারসাজিতে দেশজুড়ে জননিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সামগ্রী না পাওয়ায় হতদরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারগুলো বিপাকে পড়েছে। ফলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে সরকার। অবশ্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিষয়টি তার নজরে রয়েছে। সংকট সমাধানে দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়া চলমান। সরবরাহ ঘাটতিতে যাতে কোনো সমস্যা তৈরি না হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, মা ও শিশু স্বাস্থ্য নিশ্চিত, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকার সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এ কাজটি বাস্তবায়ন করে থাকে পরিবার-পরিকল্পনা অধিদপ্তর। তবে ২০২৩ সাল থেকে জন্মনিরোধক সামগ্রীর মজুদ বন্ধ। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্যসহ ১১টি দাতা সংস্থার বিনিয়োগে রাষ্ট্রের জনগুরুত্বপূর্ণ এ কর্মসূচি চলে আসছে। মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রায় প্রতিটি জায়গায় জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রীর মজুদশূন্য। ফলে সরকারের এ সেবা খাতের অগ্রগতি হুমকির মুখে। সংশ্লিষ্টরদের তথ্যমতে, দেশজুড়ে পরিবার-পরিকল্পনার সামগ্রী কনডম, খাবার বড়ি, ইনজেকশনসহ মা ও শিশুস্বাস্থ্য ওষুধসামগ্রীর মজুদ তলানিতে ঠেকেছে। কোথাও মিলছে না জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রী। ফলে মধ্যবৃত্ত পরিবার থেকে অনগ্রসর বড় একটি জনগোষ্ঠী সেবাবঞ্চিত। এ সংকট দূরকরণে কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে আগামী আদমশুমারিতে জনসংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ সহায়ক সামগ্রীর সংকটের খবরটি তার দপ্তর অবহিত। সংকট সমাধানে দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়া চলমান। সরবরাহ ঘাটতিতে কোনো ধরনের সমস্যা তৈরি না হয়, সেজন্য সার্বিক বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, হঠাৎ কেনো জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রীর সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে শোরগোল শুরু হয়েছে। অথচ স্পর্শকাতর এ কার্যক্রম দেখভাল করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ। গত ৮ মাস ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার ওষুধের মজুদ শূন্যতায় পৌঁছানো নিয়ে নানামুখী প্রশ্নের উদ্বেগ হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার ওষুধসামগ্রী যথাযথভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সরবরাহ করতে না পারায় অধিদপ্তরের মাঠকর্মীদের মধ্যেও হতাশা বিরাজ করছে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর, যশোর ও ঢাকার মানিকগঞ্জসহ বেশকিছু এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় এক বছর ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রীর সরবরাহ করা কর্মীদের কাছে কোনো ইনজেকশন ও কনডম পৌঁছাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের চাহিদা অনুযায়ী তারা সরবরাহ করতে পারছেন না। এছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ খাবার বড়ির মজুদ ফুরিয়ে গেছে বলে কর্তৃপক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রী যথাযথভাবে বিতরণের গাফিলতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি হবে; যার মাশুল গোনা লাগতে পারে সরকারকে। কেননা নিয়ন্ত্রণের সামগ্রীর সরবরাহ না থাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু এবং জনসংখ্যা বেড়ে যাবে বহুগুণ।

স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সমস্যা কিছু নেই। সারা দেশে যতটুকু চাহিদা কতটুকু ক্রয় করব। যাতে অপচয় না হয়। সেসবসহ বিভিন্ন কারণে বিলম্ব হচ্ছে। বর্তমানে ক্রয় প্রক্রিয়াটি অনট্রাকে আছে। তিনি বলেন, নতুন ডিজি দায়িত্ব নিয়েছেন। এরই মধ্যে ওরাল পিল ও ইজেকশন ক্রয়ের জন্য দুটি লট পাঠিয়েছি, যা পজিটিভ এসেছে। আশা করছি, শিগগিরই মাঠে পাঠিয়ে দিব। আর দরদামের তারতম্যের কারণে একটি মামলা আছে। এ মামলাটিও দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।

পরিবার-পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বিভিন্ন জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিগুলোর মধ্যে খুবই জনপ্রিয় খাবার বড়ি (তৃতীয় প্রজন্ম)। সারা দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি গ্রহীতার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ সক্ষম দম্পতি এ পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। অধিদপ্তরের সাপ্লাই চেইন এর তথ্যমতে, প্রতি মাসে খাবার বড়ির চাহিদা ৬ মিলিয়ন সাইকেলের বেশি। খাবার বড়ির (তৃতীয় প্রজন্ম) বর্তমান মজুদ মাত্র ৬.৭ মিলিয়ন সাইকেল। বর্তমান যে মজুদ আছে, তা দিয়ে ১.৩ মাস চলবে। এরই মধ্যে ২৮৭টি উপজেলায় মজুদ শূন্য হয়েছে। এছাড়া ১২৭ উপজেলায় যেকোনো সময় খাবার বড়ি (তৃতীয় প্রজন্ম) মজুদ শূন্য হবে। পরিবার-পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, যেকোনো জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতির মজুদ ৬ মাসের নিচে নামলেই বিক্ষিপ্তভাবে মজুদ শূন্যতা দেখা দেয়। যেমন কনডম ২৩টি উপজেলা স্টোরে মজুদ শেষ, ৮৭টি উপজেলা স্টোরে মজুদ শেষ পর্যায়ে। দেশের প্রায়ই সব পরিবার পরিকল্পনা স্টোরে (৪৯৫ উপজেলা) জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ইনজেকশন নেই। প্রতি মাসে প্রায় ৯ লাখ ভায়ালের ওপরে ইনজেকশনের চাহিদা রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দায়িত্বশীল কিছু কর্মকর্তা বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রীর মজুদ ফুরিয়ে যাওয়া রহস্যজনক। স্বচ্ছতায় বর্তমান সরকার সচেষ্ট রয়েছে। এর মধ্যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক সামগ্রীর সংকট সামনে চলে এসেছে। এর জন্য যারা সরাসরি কাজ করেন, তাদের গাফিলতি আছে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। সরকারের অত্যন্ত সফল একটি কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করে দেশে ও বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি তলানিতে নেওয়ার চক্রান্তে জড়িতদের খুঁজে উপযুক্ত শান্তি দেওয়া জরুরি।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close