আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি

  ২৪ জুন, ২০২৪

আমতলী ট্র্যাজেডি

শিশু সাবরিন ফিরল মৃত্যু জয় করে

থামছে না বাবার আহাজারি

বাবার কোলে অপলক দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে আছে ৭ মাসের শিশু সাবরিন। সে হয়তো জানে না, তার মা না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ছোট্ট মেয়ে সাবরিনকে নিয়ে বউভাতের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে মারা যান মা রাইতি খান (৩৫)। শিশু সাবরিনের মা মাইক্রোবাসে ছিলেন। সেতু ভেঙে মাইক্রোবাসটি যখন খালের মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল, তখন মা রাইতি খান বুঝতে পারেন তার আর বাঁচার আশা নেই, তখন তার কোলে থাকা শিশু সাবরিনকে বাঁচানোর শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে তাকে কচুরিপানার ওপর ফেলে দেন। পেছনের অটোয় ছিলেন শিশু সাবরিনের বাবা সোহেল খান। অটোটিও পানিতে ডুবে যাচ্ছিল। কোনোভাবে অটো থেকে বের হয়ে সাঁতরে ওপরে উঠে আসতেই তার চোখ পড়ে কচুরিপানার ওপর। দেখতে পান নিজের শিশুকন্যা সাবরিনকে। কালবিলম্ব না করে আদরের মেয়েকে উদ্ধার করেন বাবা। বাবা সোহেল খান মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার বাসিন্দা।

থামছে না বাবার আহাজারি : এদিকে শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানান, শিশুটির বাবা সোহেল খান আহাজারি করে বলছেন, ‘আমার ৭ মাসের সন্তান রেখে আমার মা, স্ত্রী ও শ্বাশুড়ি চলে গেলেন। এ অবুঝ শিশুর এখন কী হবে? ও মা ডাকার আগেই ওর মাকে আল্লাহ নিয়া গেল। আমি তো এটা চাইনি আল্লাহ। তুমি কেন এভাবে আমাদের ঘর খালি করলে।’ এভাবেই আহাজারি করছেন সোহেল খান। তিনি শিবচর উপজেলার ভদ্রাসন ইউনিয়নের শাহাপাড়া এলাকার মৃত ফজলুর রহমান খানের ছেলে।

৩ বছর আগে পাশের উমেদপুর এলাকার রফিকুল ইসলামের মেয়ে রাইতির সঙ্গে বিয়ে হয় মালয়েশিয়াপ্রবাসী সোহেলের। ৭ মাস আগে তাদের একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। প্রায় ১ বছর পর মালয়েশিয়া থেকে ১৫ দিন আগে দেশে ফিরেছেন সোহেল। মেয়ের জন্মের পর এই প্রথম তিনি মেয়েকে সরাসরি দেখলেন। বরগুনার আমতলীতে ব্রিজ ভেঙে গাড়ি ডুবে তাদের পরিবারের সাতজনসহ ৯ জন লোক মারা যান। দুর্ঘটনার পর রাত ১২টায় সোহেলের পরিবারের জীবিত সদস্যরা বাড়িতে আসেন। তখন কান্নার রোল পড়ে যায়।

সোহেলের বড় ভাই সাবেক সেনাসদস্য মাহবুব খান সবুজের স্ত্রী দিশা জানান, ‘ব্রিজ ভেঙে মাইক্রোবাস খালে পড়ে যাওয়ার পর আমরা জানালার কাচ ভেঙে বের হয়ে আসি। আমি ড্রাইভারকে গাড়ির গেট খুলতে বললেও তিনি গেট খোলেননি। খুললে হয়তো সবাই বেঁচে যেত।’ ড্রাইভার নিজে বের হয়ে যান, কিন্তু দরজার লক খোলেননি বলে অভিযোগ করেন দিশা। মাহবুব খান জানান, ‘ব্রিজটি ভেঙে গাড়িটি যখন পানিতে ডুবছিল, আমি গাড়ির সামনের সিটে বসা ছিলাম। কোলে ছিল আমার মেয়ে ও ভাগিনা। ওদের নিয়ে আমি বের হই। ড্রাইভার তার সাইডের গেট খুলছেন, আমি আমার সাইডের গেট খুলি। গাড়িটি আস্তে আস্তে তলিয়ে যায় পানির নিচে। অনেক চেষ্টা করেও মাকে বের করতে পারিনি। স্থানীয়রা অনেক হেল্প করেন। তারা রশি দিয়েছিলেন। রশি দিয়ে তাদের উঠিয়েছি। ঠাঁই পাইনি নদীতে। আমার কাঁধে দুজনকে উঠিয়েছি। সবাই চোখের সামনে মানুষ মরে গেল। কিছুই করতে পারলাম না।’

এদিকে স্ত্রী ও আদরের দুই শিশুসন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা আবুল কালাম আজাদ। তিনি মাহবুব খানের মামা। কোনো সান্ত¦নায়ই তার আহাজারি থামছে না। অন্যদিকে রবিবার সকাল ৯টা থেকে তিন বাড়িতে পৃথক জানাজা শেষে শিবচর উপজেলার ভদ্রাসন এলাকায় লাশ দাফন করা হয়। এর আগে রাত ৩টায় লাশ বাড়িতে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। আবুল কালামের চাচাতো ভাই বলেন, এ সাতজনই একে-অপরের স্বজন। বিয়ের আনন্দ পরিণত হলো বিষাদে। কোনোভাবেই এ মর্মান্তিক মৃত্যু কেউ মানতে পারছেন না। পুরো এলাকায় বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ‘খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি। নিহত প্রত্যকের দাফন সম্পন্ন বাবদ ১০ হাজার করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।’ উল্লেখ্য, শনিবার দুপুরে বরগুনার আমতলী পৌর এলাকায় বরের বাড়িতে বউভাতের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে চাওড়া হলদিয়া খালের ওপর লোহার ব্রিজ ভেঙে মাইক্রোবাস পানিতে পড়ে ডুবে যায়। এ দুর্ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যু হয়। নিহত সাতজনই মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার বাসিন্দা।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close