নিজস্ব প্রতিবেদক

  ২০ জুন, ২০২৪

প্রধানমন্ত্রী ভারত যাচ্ছেন কাল

গুরুত্ব পাবে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি

দিল্লি-বেইজিং সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কও স্পষ্ট হতে পারে * আলোচনা হতে পারে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দুদেশের অবস্থান নিয়ে * প্রাধান্য পেতে পারে অমীমাংসিত ইস্যুর সমাধান * লক্ষ্য দুদেশের সম্পর্ক আরো দৃঢ় করা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামীকাল শুক্রবার দুদিনের জন্য ভারত যাচ্ছেন। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো প্রতিবেশী এ দেশ সফর করছেন তিনি। এবারের আনুষ্ঠানিক এ সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো দৃঢ় করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতা ও আলোচনা, অমীমাংসিত বিষয়ের সমাধান, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দুদেশের অবস্থানসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত ৯ জুন ভারত সফরে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। নরেন্দ্র মোদি টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় তার শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে এবার আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, ভূরাজনীতি, বিশেষ করে চীনের অবস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিকরা। তাদের মতে, দিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যে অস্বস্তিকর সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের মাত্রা কী হতে পারে, সে বিষয়ে ভারত তাদের অবস্থান পরিষ্কার করবে।

এ বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার মো. শহীদুল হক বলেন, ‘আমার মতে, প্রধানমন্ত্রীর এবারের দিল্লি সফরকে বৃহৎ ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিবেচনা করা দরকার। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় উপাদানের ওপর নির্ভর করে না। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের ব্যাপ্তি ও গভীরতাও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।’

এদিকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় উন্নীত করার ক্ষেত্রে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশে যেমন একটি নতুন সরকার গঠিত হয়েছে, তেমনি ভারতেও নতুন করে নরেন্দ্র মোদি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন। কাজেই দুদেশের সম্পর্ক ঝালাই করে নেওয়ার জন্য এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুদেশের সরকারই তাদের নবযাত্রার শুরুতে প্রতিবেশীই প্রথম- এই অঙ্গীকার নিয়ে নতুন করে সম্পর্ককে এগিয়ে নেবে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

নানা কারণেই বাংলাদেশ এবং ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর। বিশেষ করে গত ১৫ বছরে এই সম্পর্ক নতুন মাত্রায় উন্নীত হচ্ছে। দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবিশ্বাস এবং সন্দেহের দেয়াল উপড়ে ফেলা হয়েছে। দুদেশ কিছু বিষয়ে অভিন্ন নীতিতে কাজ করে যাচ্ছে। আর এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর এবারের দুদিনের ভারত সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতে গত এক দশকে নরেন্দ্র মোদির জয়জয়কার ছিল। ভারত জুড়ে তার একক ইমেজ এবং প্রাধান্য ছিল সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু এবারের নির্বাচনের পর পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে গেছে। এখন নরেন্দ্র মোদিকে একটি জোট সরকারের নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে। জোটের সবাইকে সামাল দিতে হচ্ছে। তা ছাড়া এবার বিরোধী জোট অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা সংসদে বিজেপিকে ছাড় দেবে না। আর এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর এবারের দ্বিপক্ষীয় সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক মহল। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলো নতুন করে শুরু করার ব্যাপারে বিবেচনা করা এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ভারত সফরের আলোচ্যসূচিতে থাকবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে দুদেশের কূটনৈতিক সূত্রে।

বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেমন গত ১৫ বছরে অসাধারণ কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তেমনই রয়েছে কিছু অস্বস্তি। যেমন তিস্তার পানি চুক্তি এখন পর্যন্ত সম্পাদিত হয়নি। বাংলাদেশ এখন তিস্তার পানি চুক্তি সম্পাদন নিয়ে আগ্রহ দেখাবে- এটা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিকল্প প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে। আর এই বিকল্প প্রস্তাবে চীনের আগ্রহ সর্বজনবিদিত। ভারতকে তাই সিদ্ধান্ত নিতেই হবে- তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে তারা কী করবে? এখন প্রধানমন্ত্রীর হাতে তিস্তা নিয়ে অনেক বিকল্প রয়েছে। তা ছাড়া অভিন্ন নদীর পানিপ্রবাহ নিয়েও দুদেশের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হবে বলে অনেকেই মনে করছেন।

সীমান্ত হত্যার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য একটি স্পর্শকাতর এবং বিব্রতকর বিষয়। আর এই বিষয় নিয়েও দুদেশের মধ্যে কথা হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ভিসা সহজীকরণের বিষয়টি নিয়েও দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে আলোচনা হতে পারে বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র আভাস দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চলমান অর্থনৈতিক সংকট পুনরুদ্ধারে ভারতের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। এই সফরে ভারত বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক সহায়তার একটি প্যাকেজ দিতে পারে বলে কোনো কোনো মহল থেকে আলোচনা হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে এই সম্পর্ক আসলে নতুন সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্ব এগিয়ে নেওয়ার সম্পর্ক।

সফরসঙ্গী যারা : দিল্লির কূটনৈতিক সূত্র গতকাল জানায়, এই সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিনিধিদলে কারা থাকবেন, সেই তালিকাও দিল্লির কাছে পাঠানো হয়েছে। মাত্র দিন দশেক আগেই (৯ জুন) ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে টানা তৃতীয়বারের মতো শপথ নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। মোদি সরকারের এই তৃতীয় মেয়াদে প্রথম যে বিদেশি অতিথি রাষ্ট্রীয় সফরে দিল্লিতে পদার্পণ করছেন, তিনি শেখ হাসিনা। গত মাসে ভারতের নির্বাচনের মাঝপথেই ঢাকায় গিয়ে তাকে এই সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াটরা।

এর আগে নরেন্দ্র মোদির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতেও দিন কয়েক আগেই দিল্লি ঘুরে গেছেন শেখ হাসিনা, তখন প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে বৈঠকও করেছেন তিনি। ফলে একই মাসের মধ্যে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার দিল্লিতে আসছেন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এই সোনালি যুগে অস্বাভাবিক না হলেও নজিরবিহীন তো বটেই!

এই সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিনিধিদলে কারা থাকবেন, কূটনৈতিক রীতি অনুযায়ী সেই তালিকাও দিল্লির কাছে এরই মধ্যে পাঠানো হয়েছে। এতে জানা গেছে, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দিল্লিতে আসছেন। বাংলাদেশের ইকোনমিক রিলেশনস (অর্থনৈতিক সম্পর্ক) বিভাগের সচিব মহ. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকিও এই সফরের প্রতিনিধিদলে থাকছেন।

গত জানুয়ারিতে শেখ হাসিনা টানা চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর তার বর্তমান মেয়াদে ‘ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি’ যে খুবই গুরুত্ব পাবে, সে ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিবিদ এ এইচ মাহমুদ আলীকে অর্থমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেওয়ার মধ্যেও সেই পদক্ষেপেরই ছাপ ছিল। এখন দিল্লি সফরের প্রতিনিধিদের নামের তালিকা থেকেও একই ধরনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

দিল্লিতে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ডলারকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে রুপি-টাকায় বাণিজ্যিক লেনদেন আরো বাড়ানো যায়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ঋণগুলো পরিশোধের সময়সূচি ‘রিশিডিউল’ করার ক্ষেত্রে ভারত কীভাবে সাহায্য করতে পারে এবং ভারত বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ঋণ বা লাইন অব ক্রেডিট কীভাবে বা কোন শর্তে দিতে পারে, সে বিষয়গুলো নিয়ে এই সফরে আলোচনা হবে বলে তারা ধারণা করছেন।

এছাড়া বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে সিনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা থাকছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- পাওয়ার ডিভিশনের (বিদ্যুৎ বিভাগ) সিনিয়র সচিব মহ. হাবিবুর রহমান, রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মহম্মদ হুমায়ুন কবীর, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (সেনাবাহিনী) প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম, বাহিনীর অপারেশনস ও প্ল্যান ডিরেক্টরেটের কর্নেল মহম্মদ তরিকুল ইসলাম প্রমুখ। এছাড়া পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক এ টি এম রকিবুল হক ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও যথারীতি প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হবেন।

পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ছাড়াও অন্য যে মন্ত্রী বা মন্ত্রী পর্যায়ের সদস্যরা শেখ হাসিনার সঙ্গে দিল্লিতে আসছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম।

এছাড়া বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহও ‘বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে এবারের দিল্লি যাত্রায় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন। এছাড়া প্রতিবারের মতোই বাংলাদেশের সিনিয়র সম্পাদক ও সাংবাদিকদের একটি দলও প্রধানমন্ত্রীর সফর ‘কভার’ করতে দিল্লিতে আসছেন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close