কাইয়ুম আহমেদ

  ১৫ জুন, ২০২৪

গরু বেশি, দামও বেশি

* দাম শুনে চমকে উঠছেন ক্রেতা, বিক্রিও কম * কোরবানির জন্য ৭০-৮০ হাজারের মধ্যে গরু চান * এ হাট-ও হাট ঘুরে ক্লান্ত ক্রেতা, দামে মেলে না * তেজগাঁও কলোনিবাজার হাটে সেরা ৩৫ মণ ওজনের ‘মুন্নাভাই’ দাম ১৫ লাখ টাকা

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল ও তার দুই ছেলে মিলে কয়েকদিন ধরে পছন্দের গরু দেখছেন রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার ঐতিহ্যবাহী অস্থায়ী মেরাদিয়া পশুর হাটে। গতবার হাট থেকে ৭৮ হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছিলেন। এবারও তিনি কাছাকাছি দামের পশু কিনতে চান; কিন্তু যেটি পছন্দ হয়েছে, সেটি দামে মেলেনি। তাই কেনা হয়নি।

গতকাল শুক্রবারও কামাল এসেছিলেন হাটে। সেখানেই কথা হয় মোহাম্মদ কামালের সঙ্গে। তিনি জানান, এবার ৭০-৮০ হাজার টাকায় গরু কিনতে চান; কিন্তু এ দামে মেলাতে পারছেন না। দাম শুনলে মনে হয়, তারা বিক্রির জন্য দাম চাচ্ছে না। এত বেশি দাম চাচ্ছেন, পাল্টা দামও বলা যাচ্ছে না। যে গরুর দাম ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে, তা বড়জোর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা হতে পারে বলে ধারণা এ ক্রেতার। এ কারণে খামারগুলো ঘুরে দেখছেন। আরো কয়েক দফা ঘুরে দামে মিলে গেলেই কিনে নেবেন। কামালের মতো অসংখ্য ক্রেতা দাম শুনেই চমকে উঠছেন। দরকষাকষি তো দূরের কথা, পেছনে আর ফিরেও তাকাচ্ছেন না তারা। গরু বিক্রেতা কুতুব উদ্দিন অবশ্য বলছেন, তিনি বেশি দাম চাননি। অল্প লাভ হলেই ছেড়ে দিচ্ছেন। এ হাটে আসা ক্রেতাদের মনোভব এবার কেমন যেন হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শুক্রবার বিকেলে এ হাটে দেখা যায়, দাম শুনে পাল্টা দাম না বলে চলে যাওয়া ক্রেতার সংখ্যা বেশি। বিকেল ৩টা পর্যন্ত ক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। বিকেল ৪টা থেকে হাটে ক্রেতা আসতে শুরু করেছেন। তবে দাম বেশি হওয়ার কারণে বিক্রি হচ্ছে কম। ক্রেতারা বলছেন, তারা অপেক্ষা করছেন দাম কমে কি না। তাই পাল্টা দাম না বলে অপেক্ষা করছেন। আজ (শুক্রবার) রাত পর্যন্ত কেমন বিক্রি হয়, তা দেখেই বোঝা যাবে কাল-পরশু (শনি ও রবিবার) দাম কমবে নাকি বাড়বে। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ড থেকে দুটি গরু নিয়ে এ হাটে এসেছেন শরিফুল আলম। এর মধ্যে বড় গরুটির দাম চাচ্ছেন ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ক্রেতারা অবশ্য ১ লাখ ৮০ হাজার পর্যন্ত বলছেন, কিন্তু তিনি দিচ্ছেন না। একান্ত আলাপে এ বিক্রেতা বলেন, ২ লাখ টাকা হলে তিনি গরু বিক্রি করে দেবেন। বেশি দামের কারণে বিরক্ত হয়ে বাসাবো এলাকার বাসিন্দা মাহমুদ হোসেন বলেন, আজ (শুক্রবার) আর গরু কিনব না। দাম কমে কি না, সেজন্য অপেক্ষা করব।

রাজধানী ঢাকায় এবার কোরবানির পশুর ২০টি হাট বসেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এসব হাটে পশু বিক্রি শুরু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার থেকে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে হাজার হাজার পশু আনা শুরু হয়েছে এ হাটে। কুষ্টিয়ার ‘কালাবাবু’, জামালপুরের ‘কালাপাহাড়’ ও মধ্য মেয়াদিয়ার ‘সাদাবাবু’ নামের বড় আকারের গরু তোলা হয়েছে। এবারের ঈদে হাট কাঁপাচ্ছে বড় আকারের গরু। মেরাদিয়া হাট ঘুরে দেখা যায়, কোরবানির পশু কিনতে ক্রেতারা হাটে আসা শুরু করেছেন। তবে বেশিরভাগ ক্রেতার অভিযোগ দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, গবাদিপশু লালন-পালনে খরচ বেড়েছে, তাই তাদের বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। হাট ঘুরে দেখা যায়, ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি। ৮০ হাজার থেকে আড়াই লাখের মধ্যে গরু বিক্রি হচ্ছে বেশি।

এ হাটে বিশালাকৃতির গরু দুটির চলন এবং আয়েশি খাবার খাওয়ার জন্যই তাদের এ নাম রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন খামারি ও বিক্রেতারা। তবে ক্রেতারা এখনো বিক্রি করার মতো দাম বলছে না। ক্রেতারা যে দাম বলছেন, তাকে সন্তুষ্টও হতে পারছেন না তারা। খাবারের দাম বৃদ্ধি এবং উন্নত জাত ভেদে গরুগুলোর দাম চাওয়া হচ্ছে। তাই ভালো দামের অপেক্ষায় আছেন ‘কালাবাবু’, ‘কালাপাহাড়’ ও ‘সাদাবাবু’ বিক্রেতা। কুষ্টিয়ার মিরপুরের খামারি শেখ সাইদুর রহমান বলেন, নিজ খামারের শাহীওয়াল ক্রস জাতের ষাঁড়টি বিক্রির জন্য এ হাটে আনা হয়েছে। শখ করে নাম দেওয়া হয়েছে ‘কালাবাবু’। ৪ বছর ধরে আদর যত্নে লালন-পালন করা গরুটির ওজন প্রায় ৩৫ মণ। দাম হাঁকানো হয়েছে ২০ লাখ টাকা। ভালো দাম পেলে শখের কালো রঙের গরুটি ক্রেতার হাতে তুলে দিতে চান তিনি।

সাইদুর রহমান বলেন, এখনো ক্রেতাদের থেকে ভালো দাম পাইনি। ভালো দামের অপেক্ষায় আছি। খাবারের খরচ বাড়তি তাই এবার গরুর দাম একটু বেশি চাওয়া হচ্ছে। গরুটির প্রতিদিন খাবার বাবদ খরচ হয় ১ হাজার টাকার বেশি। ষাঁড়টির দৈনিক খাদ্য তালিকায় থাকে কাঁচা ঘাস, গম, ছোলা, ভুট্টার ভুসি। প্রতিদিন দুই থেকে তিন বেলা গোসল করানো হয় একে। রাখা হয় ফ্যানের নিচে। কিন্তু হাটে গরুর তেমন যত্ন নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান ষাঁড় ‘সাদাবাবু’ মেরাদিয়া হাটে এনেছেন স্থানীয় মেরাদিয়া মধ্যপাড়া এলাকার খামারি মোহাম্মদ মূসা। প্রায় ৩২ মণ ওজনের সাদা রঙের গরুটির দাম ১৩ লাখ টাকা চেয়েছেন। মূসা বলেন, অনেকেই দাম বলেছেন। আরেকটু দাম বাড়ালে দিয়ে দেব। প্রতিদিন হাজার টাকার উপরে খাবার খায় আমার ‘সাদাবাবু’। গরুটি দেখার জন্য ক্রেতার চেয়ে দর্শনার্থীই ভিড় করছেন বেশি।

মেরাদিয়া ছাড়াও শুক্রবার শনির আখড়া, শ্যামপুর, গাবতলী, ভাটারা, হাজারীবাগ, বছিলা, সারুলিয়া, আমুলিয়া ও তেজগাঁও কলোনিবাজার অস্থায়ী পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, সব হাট কোরবানির পশুতে ভরে উঠেছে। তেজগাঁও কলোনিবাজারের মূল হাটে জায়গা না হওয়ায় পশু রাখা হয়েছে আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সড়কেও। এখানেও দাম অন্যবারের চেয়ে বেশি বলে জানালেন ক্রেতারা। এ হাটে নাটোরের সিংড়া থেকে ‘মুন্নাভাই’ এনেছেন সুলতান মিয়া। দাম হেঁকেছেন ১৫ লাখ টাকা। সুলতান মিয়া জানান, তার আদারের গরু ‘মুন্নাভাই’র ওজন ৩৫ মণ। খামারিরা বলছেন, শেষ সময়ে এসে ক্রেতারা ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার মধ্যে গরু খুঁজছেন। অনেক পরিবারে দু-তিনজন মিলেও গরু কিনেছেন। তবে এ বাজেটে গরু মেলাতে গলদঘর্ম অবস্থা হচ্ছে। কারণ গরু পালনে খরচ বেড়েছে। খাবারের দাম বাড়তি। গত বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম খামারেই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি পড়ছে। খামারে শাহীওয়াল, দেশি, ফ্রিজিয়ানসহ বিভিন্ন জাতের গরু পাওয়া যাচ্ছে।

অনলাইনেও সরব খামারিরা : হাটবাজারের বাইরে অনলাইনে গরু-ছাগল বেচাকেনা জমে উঠেছে। করোনাকাল থেকে অনলাইন বাজার বড় হতে শুরু করে। এবারও বড় খামারগুলো অনলাইনে বেশ সক্রিয়। ক্রেতারা ভিডিও দেখে গরু পছন্দ করছেন। খামারে গিয়ে কিনে নিচ্ছেন। অবশ্য শহরের ক্রেতারা গরু কিনতে অনলাইনের ব্যবহার বেশি করেন। গ্রামে এখনো প্রথাগত হাটের ওপর নির্ভর করেন কোরবানিদাতারা। গবাদিপশুর খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) তথ্যানুযায়ী, আকারভেদে এবার জীবিত গরু প্রতি কেজি (লাইভ ওয়েট) ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনলাইনে জীবিত পশুর (গরু) কেজি পড়ছে ৬৩০ টাকা পর্যন্ত। বিডিএফএ বলছে, গত বছর লাইভ ওয়েটে প্রতি কেজি গরুর দাম ছিল ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা। লাইভ ওয়েটে একটি গরুর যে ওজন হয়, কোরবানি দেওয়ার পর মাংস ও হাড়ের পরিমাণ হয় তার প্রায় ৫৫ ভাগ।

এদিকে আমুলিয়া মডেল টাউনের অস্থায়ী পশুর হাটে কথা হয় মেন্দিপুরের হাজি বাছেদের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রথমে গিয়েছিলেন সারুলিয়া হাটে। সেখানে দামে মেলেনি। এরপর যান মেরাদিয়া হাটে। সেখানেও গরুর দাম শুনে বিরক্ত হয়ে যান তিনি। এ দুই হাট ঘুরে কম দামের আশায় আসেন বাড়ির কাছেন এ হাটে। ২ ঘণ্টা ঘুরে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় পছন্দের গরু কিনেন তিনি। গরু নিয়ে বাসায় যাওয়ার পথে তাকে ক্ষুব্ধ দেখা গেল। বললেন, বিক্রেতারা অস্বাভাবিক দাম চাচ্ছেন। এ হাটে ছোট গরু বেশি উঠেছে। গরুতে হাট ভরে উঠলেও বিক্রি জমেনি। স্বল্প পরিসরে কিছু বিক্রি হচ্ছে।

এবার চাহিদার চেয়ে কোরবানির পশুর সংখ্যা বেশি : অন্যদিকে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে এবার চাহিদার চেয়ে কোরবানির পশুর সংখ্যা বেশি। তবু রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার হাটে পশুর দাম বেশ চড়া। এরই মধ্যে হাটে পশু কিনতে গেছেন এমন ক্রেতাদের ধারণা, গত বছরের চেয়ে পশুর দাম এবার অন্তত ৩০ শতাংশ বেশি। যদিও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মো. আবদুর রহমান বলছেন, কৌশলে কিংবা ছলচাতুরী করে যারা কোরবানির পশুর দাম বাড়াচ্ছেন, শেষ পর্যন্ত তাদের ‘মাথায় হাত’ পড়বে। মন্ত্রী বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এবার কোরবানির পশুর চাহিদা ১ কোটি ৭ লাখ। সেখানে গরু-ছাগলসহ কোরবানির জন্য পশু প্রস্তুত আছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। ২২ লাখের বেশি পশু বাড়তি আছে। বাজারে যেকোনো পণ্যের দাম নির্ধারিত হয় সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে। দেশে প্রয়োজনের চেয়ে পশুর উৎপাদন ও সরবরাহ বেশি আছে।

প্রাণিসম্পদ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি রেকর্ডসংখ্যক কোরবানিযোগ্য পশু মজুদ থাকত, তাহলে দাম অন্য বছরের তুলনায় কম হওয়ার কথা; কিন্তু সেটি বাস্তবে ঘটছে না। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে কোরবানিযোগ্য পশু আছে ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি। এর আগে কখনো দেশীয় উৎস থেকে এতসংখ্যক কোরবানিযোগ্য পশুর জোগান ছিল না। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এ এইচ এম সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, পশুর সরবরাহ বেশি থাকলে দাম বাড়ার কথা নয়; বরং কমে যাওয়ার কথা। সরকারি পরিসংখ্যানে যে সরবরাহের কথা বলা হচ্ছে, তা কতটা সত্য, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close