বদরুল আলম মজুমদার

  ৩০ নভেম্বর, ২০২২

বিএনপির সমাবেশ পল্টনে না কি সোহরাওয়ার্দীতে

আগামী ১০ ডিসেম্বর বিএনপি রাজধানী ঢাকায় বড় সমাবেশের আয়োজন করতে যাচ্ছে। এ সমাবেশের স্থান নির্ধারণে বিএনপি তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দেয় মহানগর পুলিশের কাছে। প্রথমে পুলিশের পক্ষ থেকে বিএনপির সমাবেশটি টঙ্গী ইজতেমা মাঠ বা পূর্বাচলে করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিএনপির দ্বিতীয় পছন্দ সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশের পক্ষে মত দেয় প্রশাসন। দ্বিতীয় পছন্দের জায়গায় বিএনপি সমাবেশের মৌখিক অনুমতি পাওয়ার পরও এখন বেঁকে বসে দলটি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি নয়াপল্টনে সমাবেশ করার ঘোষণা দেন।

এদিকে বিএনপির গণসমাবেশ ঘিরে আপাতত বাগ্যুদ্ধে লিপ্ত প্রধান দুই দল। ১০ ডিসেম্বর রাজপথে শক্তির খেলায় মুখোমুখি হওয়ার ঘোষণা আছে দু-দলের পক্ষ থেকেই। এর আগে সমাবেশের ভেন্যু ঘিরে দু-দলে চলছে কৌশলগত খেলা। কিন্তু হঠাৎ করেই বিএনপি নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে অনড় অবস্থান নিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি কেন নয়াপল্টনে অনড়? আর পুলিশইবা কেন সোহরাওয়ার্দীতে আগ্রহী? এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা আলোচনা। বিশ্লেষকদের মতে, কৌশলগত সুবিধার বিষয়টি মাথায় রেখেই ভেন্যু পছন্দ করেছে বিএনপি। আর এ বিষয়টি বুঝতে পেরে পাল্টা কৌশল এঁটেছে ডিএমপিও (ঢাকা মহানগর পুলিশ)।

বিএনপি নেতারা চান সেদিন ঢাকার রাজপথ দখলে রাখতে। তাই সমাবেশ রাজপথেই করতে হবে। পল্টনে সমাবেশ হলে নেতাকর্মীদের সুবিধা হচ্ছে রাজধানীর প্রায় সবদিক থেকেই সহজে সমাবেশে যোগ দিতে পারবেন। উৎসুক সাধারণ মানুষও আসবেন। সে ক্ষেত্রে সমাবেশে শোডাউন ভালো হবে। তা ছাড়া পরিস্থিতি সংঘাতময় হয়ে উঠলে এক জায়গায় আটকে না থেকে নেতাকর্মীরা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হতে পারবেন। প্রয়োজন হলে পালানো সহজ হবে। নয়াপল্টনের চারপাশে অনেকগুলো গলি আছে। অতীতে দেখা গেছে, আগে বিএনপি নেতাকর্মীরা ওইসব গলি ব্যবহার করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। অন্যদিকে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দেয়ালঘেরা হওয়ায় নেতাকর্মী ছাড়া সাধারণ মানুষ সেখানে যেতে আগ্রহী হবেন না। উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার মাত্র দুটি গেট থাকায় এক রকম অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে থাকতে হবে। তা ছাড়া ভেন্যুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হওয়ায় ক্যাম্পাসে সেদিন ছাত্রলীগের শক্ত অবস্থান থাকবে। এ বিষয়টিকেও হুমকি মনে করছেন বিএনপি নেতারা।

এদিকে বিএনপির ‘ছক’ ধরেই পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে ডিএমপি। পুলিশের আশঙ্কা, সেদিন ঢাকায় বড় জমায়েত করতে পারলে রাজপথের নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করবে বিএনপি। সরকার পক্ষ মনে করছে, সমাবেশের নামে রাজধানী দখলের চক্রান্ত করেছে বিরোধী পক্ষ। বিএনপি নেতা আমানের কথায় এমনই আভাস ছিল। যদিও সেই অবস্থান থেকে সরে আসার কথা বিএনপির পক্ষ থেকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা মনে করছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করলে বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণ করা অপেক্ষাকৃত সহজ হবে পুলিশের পক্ষে। তাই ২৬টি শর্তে গতকাল মঙ্গলবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গত শনিবার দুপুরে বলেন, বাধ্য হয়ে সরকার কোথাও অনুমতি দেবে না। সরকার যেখানে ভালো মনে করে সেখানেই অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাড়া বড় সমাবেশ করা সম্ভব নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেন্যু বিএনপিই চেয়েছে। ডিএমপি কমিশনার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানই উপযুক্ত মনে করেছেন, এজন্য বিএনপিকে সেখানেই অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের কিছু দলীয় প্রোগ্রাম রয়েছে, সেগুলো শেষ হয়ে যাবে। এরপর বিএনপি সেখানে সমাবেশ করতে পারবে।

বিএনপি বলছে, সরকার নয়াপল্টনে সমাবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য হবে। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বারবার বলছেন, নয়াপল্টনে বিএনপি সমাবেশ করতে চায়। সমাবেশের অনুমোদন দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় গতকাল বলেছেন, বিএনপি নয়াপল্টনে কমফোর্ট ফিল করে। এখানে ঢোকাণ্ডবের হওয়ার ২০-২৫টি পথ রয়েছে। সারা দেশ থেকে লোকজন আসবে। স্থায়ী মঞ্চ না হলে দুটি ট্রাকের ওপরও মঞ্চ বানিয়ে সমাবেশ করা যায়। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছাত্রলীগের সম্মেলন ভেন্যু। সেখানে প্রধানমন্ত্রী যাবেন, এরপর বিএনপির মঞ্চণ্ডপ্যান্ডেল তৈরি ও অন্যান্য প্রস্তুতির সুযোগ নেই। এ ছাড়া সেখানে ঢোকা ও বের হওয়ার গেট মাত্র দুটি। পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি দলের লোকজন বাইরে গ-গোল বাধালে উদ্যানের ভেতরের লোকজন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে। জনগণের নিরাপত্তা বিবেচনা করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, উদ্যানের ভেতরে গাছসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। এসবের ক্ষতির মামলা হতে পারে- এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘ঢাকায় ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশটিও বিভাগীয় সমাবেশ হিসেবেই করা হচ্ছে। সেজন্যই আমরা পল্টনেই চেয়েছি।’ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা আর কোনো মাঠ বা ভেন্যু নয় কেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাদের তো কোনো দিনই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দেয় না। এজন্যই পার্টি অফিসের সামনে বিএনপি সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছে। পার্টি অফিসের সামনে আমাদের জন্য সুবিধা হয়, সেজন্য আমরা চেয়েছি।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, সমাবেশের জন্য নয়াপল্টনই তাদের পছন্দ। কারণ সব সময় সেখানেই সমাবেশ করে আসছেন তারা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সম্পর্কে তিনি বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনেক কিছু তৈরি হয়েছে। সেখানে আসলে তেমন কোনো মাঠ নেই। সর্বশেষ ঢাকায় বিএনপির সমাবেশ নিয়ে কথা বলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত শনিবার কুমিল্লা বিভাগীয় গণসমাবেশে পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সরকার পূর্বাচল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসছে। সোহরাওয়ার্দী থেকে নয়াপল্টনেও আসবে। তারা নয়াপল্টনেই শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশ করবেন।

বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী জানান, তারা নয়াপল্টনেই শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশ করতে চান।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close