নিজস্ব প্রতিবেদক

  ২৮ নভেম্বর, ২০২২

জাপায় ঐক্যের ডাক রওশন এরশাদের

জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার আসন এবং দল পরিচালনার কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বে জাতীয় পার্টির টলায়মান অবস্থায় দেশে ফিরেছেন দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। পাঁচ মাস থাইল্যান্ডে চিকিৎসা শেষে রবিবার (২৭ নভেম্বর) দুপুরে দেশে ফিরেছেন রওশন। থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে রবিবার তিনি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন। বিভিন্ন সময় জাতীয় পার্টি ছেড়ে যাওয়া নেতাকর্মীদের দলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন রওশন এরশাদ।

বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে রওশন এরশাদ বলেন, আগেও বলেছি, আজও বলছি- আমি সব সময়ই জাতীয় পার্টির ঐক্য চাই। পার্টিকে বিভক্ত করার প্রশ্নই উঠে না। এ সময় রওশন এরশাদের পাশে ছিলেন জাতীয় পার্টির সাবেক দুই মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও মশিউর রহমান রাঙ্গা।

রওশন এরশাদ বলেন, আমি ঢাকায় ফিরে এসেছি, আমি পার্টির সব এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং অন্যদের সঙ্গে যেকোনো ভুল বোঝাবঝি দূর করব। আমি নিশ্চিত, সেই ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে।

জাতীয় পার্টিকে দুর্বল করতে বিভিন্নমুখী ষড়যন্ত্রের আভাস দিয়ে রওশন এরশাদ বলেন, এসব ভুল বোঝাবুঝির জন্য এবং পার্টিকে দুর্বল করতে কিছু ষড়যন্ত্র হতে পারে; যেমনটি আমরা ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০১৪ সালে দেখেছি। আমরা সেই ষড়যন্ত্রগুলোকে নস্যাৎ করব এবং ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী জাতীয় পার্টি গড়ে তুলব। নব্বই দশকের পর আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নাজিউর রহমান মঞ্জু ও কাজী জাফর আহমদের সঙ্গে যারা জাতীয় পার্টি ছেড়ে চলে গেছেন বা জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন, তাদের জাতীয় পার্টির মূল দলে ফিরে আসার আহ্বান জানান রওশন এরশাদ?

তিনি বলেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় পার্টির কঠিন ও প্রতিকূল সময়ে যারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন, তাদের আমাদের অবশ্যই যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে।

জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বলেন, আপনারা সবাই জানেন আমার স্বামী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যদের কত কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। আমি দেখেছি গত ৩২ বছরে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা কতটা কঠোর পরিশ্রম করেছেন। জাতীয় পার্টির জন্য যারা কষ্ট করেছেন, জেল খেটেছেন এবং জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

আসন্ন রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে রওশন এরশাদ বলেন, মনে রাখবেন রংপুর জাতীয় পার্টির প্রাণ। এটা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাড়ি। তাই আসনটি যেকোনো মূল্যে ধরে রাখতে হবে এবং জাতীয় পার্টির প্রতীক লাঙ্গল নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হবেন- এমন যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেব, ইনশাআল্লাহ। এজন্য সব নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

বক্তব্যের শুরুতে রওশন এরশাদ তার সুস্থতা ও স্বদেশে ফিরে আসার জন্য জাতীয় পার্টির নেতাকর্মী এবং দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানান। ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসার সময় সহযোগিতা এবং স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও ধন্যবাদ জানান তিনি।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে জাতীয় পার্টির ঐক্য গঠনের সব জল্পনা-কল্পনার জবাবে রওশন এরশাদ বলেন, বিএনপির সঙ্গে জোটের প্রশ্নই আসে না। বিএনপির অধীনে জাতীয় পার্টি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের নেতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং আমি ও আমার নাবালক সন্তানসহ দলের হাজার হাজর নেতাকর্মী জেল খেটেছিলেন। তখন আমাদের জনসভাও করতে দেওয়া হয়নি। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অনেক জনসভায় হামলা চালিয়ে কতশত নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল। সেই অন্ধকার দিনগুলো আমরা ভুলব কী করে? তা ছাড়া আমরা তাদের শাসনামলে হাওয়া ভবনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অপতৎপরতা দেখেছি।

চলমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রওশন এরশাদের সঙ্গে ছিলেন তার মুখপাত্র কাজী মো. মামুনুর রশীদ, ছিলেন তার ছেলে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদ ও পুত্রবধূ মাহিমা সাদ।

রবিবার সকাল থেকে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জের সামনে অবস্থান নেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। রওশন এরশাদ ভিআইপি লাউঞ্জের বাইরে এলে মুহুর্মুহু স্লোগানে, করতালিতে দেশে স্বাগত জানান নেতাকর্মীরা।

রবিবার বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে উপস্থিতি থেকে বিরোধীদলীয় নেতাকে অভ্যর্থনা জানান জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা, বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ, পার্টির সিনিয়র নেতা অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান, এস এম এম আলম, সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, সাবেক সংসদ সদস্য ও দলীয় চেয়ারম্যানের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা, সাবেক সংসদ সদস্য এম এ গোফরান, সাবেক সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মিলন, পার্টির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু ও জাতীয় ছাত্রসমাজের সাবেক সভাপতি মনিরুজ্জামান টিটুসহ অন্য নেতারা।

জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু না এলেও তার শিবির থেকে কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সালমা ইসলাম বিমানবন্দরে রওশন এরশাদকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন।

রওশন এরশাদ তার বক্তব্য শেষ করলে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিন পর্যন্ত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা।

গুলশানের ৬৯ নম্বর সড়কে বাড়িটিতে দীর্ঘদিন কেউ না থাকায় তা বসবাসের জন্য যথোপযুক্ত নয়। তাই কয়েক দিন গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে থাকবেন রওশন এরশাদ।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close