গাজী শাহনেওয়াজ

  ২৪ নভেম্বর, ২০২২

গাইবান্ধা উপনির্বাচন তদন্ত কমিটির ৭ সুপারিশ

সিসিটিভি থাকলে পোলিং এজেন্ট দরকার নেই

বিদ্যুৎবিহীন অঞ্চলে ব্যালটে ভোট নেওয়া * দুর্গম এলাকায় ইভিএম না রাখা * ট্রাভেল শুটার না রাখা * বুথের বিশেষ কোড ইভিএমে সংযুক্ত করা

গাইবান্ধা-৫ সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে- এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি। তারা দু-দফায় ১৪৫ কেন্দ্রের ভোটের অনিয়ম তদন্তে নানা ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে; যার আলোকে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সুপারিশ করেছে। সুপারিশে ৭টি পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছে তদন্ত কমিটি। এই সুপারিশের মধ্যে স্থগিত ৫১ কেন্দ্রের ৫টি এবং বাকি ৯৪ কেন্দ্রের জন্য দুটি। প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় গত ২৭ অক্টোবর এবং দ্বিতীয় প্রতিবেদনটি জমা দেয় সোমবার (১৪ নভেম্বর)।

সুপারিশমালায় রয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ‘ইভিএম’ এবং গোপন ক্যামেরা ‘সিসিটিভি’ নির্বাচনে ব্যবহার হলে সেখানে প্রার্থীদের কোনো পোলিং এজেন্ট না রাখা। সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় স্তরের যেকোনো নির্বাচনের ক্ষেত্রে এটা বজায় রাখতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটি পর্যবেক্ষণে বলেছে, পোলিং এজেন্ট রাখার ফলে ভোটকক্ষের মধ্যে সমস্যা তৈরি হয়।

কেন্দ্রের ভোটকক্ষে পোলিং অফিসার কমানো (বর্তমানে দুজন দায়িত্ব পালন করেন, আগামীতে একজন রাখা), দুর্গম এলাকায় ইভিএমের বদলে প্রথাগত ব্যালটে ভোটগ্রহণ করা (কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, যন্ত্রের বাটনে চাপ দিলে জোরে একটা শব্দ হয়; যার কারণে সাধারণ ভোটাররা ভয় পেয়ে যান এবং তাৎক্ষণিক কেন্দ্র ত্যাগ করেন; এতে বাইরে অপেক্ষারত ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, এজন্য সাধারণ মানুষকে ইভিএম সম্পর্কে শিক্ষিত করা এবং বেশি বেশি প্রচার করা), ভোটের গোপন কক্ষে ভোটার ছাড়া কেউ প্রবেশ করলে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে বাধা দেওয়া এবং ভোটকক্ষে ট্রাভেল শুটার (প্রশিক্ষিত কিছু ইসির কর্মকর্তা থাকেন যাদের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয়) হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেন তাদের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব না দেওয়া। কমিটি তাদের সুপারিশে এ বিষয়ে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে, নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি সার্বক্ষণিক এক কক্ষে অবস্থান করেন, তাহলে ভোটগ্রহণে সমস্যা তৈরি হয়।

দ্বিতীয় তদন্ত প্রতিবেদনে দুই সুপারিশ হচ্ছে, বিদ্যুৎবিহীন এলাকায় ব্যালটে ভোট করা অর্থাৎ ইভিএম না রাখা এবং যে কেন্দ্রে ইভিএমে ব্যবহার করা হবে ওই কেন্দ্রের বিশেষ চিহ্ন বা কোড ব্যবহার করা। তদন্ত কমিটির অভিমত, যদি ভোটের দিনে কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম কমিশনের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে তাহলে তাৎক্ষণিক ওই কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ফোন করে সতর্ক করা।

এই সাত সুপারিশ ছাড়াও অনিয়ম সংঘটিত হওয়া-সংক্রান্ত প্রথম তদন্তে ৩০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের সঙ্গে ৮৪৮ পৃষ্ঠার সংযুক্তি এবং দ্বিতীয় তদন্তেও বেশ কিছু মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্তি দিয়ে তৈরি হয়েছে প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে কারো বিরুদ্ধে সরাসরি শাস্তির সুপারিশ করা হয়নি। তদন্ত কমিটির সূত্র নিশ্চিত করে বলেছে, শাস্তি কী হবে- সেটা কমিশন নির্ধারণ করবে। শুধু অনিয়ম কী হয়েছিল- তারা সে বিষয়টিই প্রতিবেদনে আলোকপাত করেছে। তদন্তে কমিটি স্থগিত ৫১টি কেন্দ্রে ৬ শতাধিক ব্যক্তির সাক্ষ্য নিয়েছে। গত ১৮-২০ অক্টোবর গাইবান্ধা গিয়ে তদন্তকাজ পরিচালনা করে কমিটি। দ্বিতীয় তদন্তটি কমিশন অফিসে বসে সিসি ক্যামেরা দেখে দেখে অনিয়ম খুঁজে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ জানিয়েছে। তবে দ্বিতীয় তদন্তে ৬টি কেন্দ্রের ইভিএম কক্ষের ছবি ঝাঁপসা দেখতে পেয়েছে। চারটি বিষয় আমলে নিয়ে তদন্তের কাজ করেছে কমিটি।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, পর্যবেক্ষণে স্থগিত ৫১ কেন্দ্রের সব প্রিসাইডিং অফিসারকে দায়ী করা হয়েছে। এ ছাড়া ভোটকক্ষের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারকেও দায়ী করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ভোটবুথে বহিরাগত প্রবেশ করলেও তাদের বাধা না দেওয়া, নিজেরাই বিশেষ প্রার্থীর পক্ষে গোপনকক্ষে প্রবেশ করে অনাধিকারচর্চা করাসহ অনিয়মকে পক্ষান্তরে সমর্থন করেছে। ক্ষেত্রবিশেষে তারাও গোপনকক্ষে গিয়ে ভোট দিয়েছে, যা অনিয়ম। পাশাপাশি কেন্দ্রওয়ারি অনিয়মগুলো সমন্বিত করে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৫১ কেন্দ্রের ৪৬টি কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই অপরাধের সঙ্গে জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৯৪টি কেন্দ্রের সব কটিতেই অনিয়ম পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

প্রথম প্রতিবেদন বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর বুধবার (২৩ নভেম্বর) এ প্রতিবেদককে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে এখনই মন্তব্য করব না। পুরো কেন্দ্রের তদন্ত শেষ হলে আপনাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রকাশ করা হবে।

তদন্তের সুপারিশসহ কী পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ। শুধু বলেন, মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে অডিও, ভিডিও ও হার্ডডিস্ক জমা দেওয়া হয়েছে। কমিশন নির্ধারিত সভায় তা পর্যালোচনা করে গণমাধ্যমে জানাতে পারে। এর বাইরে আর কিছু জানাতে রাজি হননি এই অতিরিক্ত সচিব।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার, কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা, প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার ও প্রার্থীর পোলিং এজেন্টসহ ভোটের গোপনকক্ষে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী রাজনৈতিক কর্মীদের তারা দায়ী করে কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন। তবে একজন নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে শাস্তি না পান, সেজন্য সতর্কভাবে কাজ করতে হয়েছে বলেও এ প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন কমিটির সদস্যরা। বলেছেন, এজন্য একজন নিরীহ মানুষের জন্য কোনো কোনো কেন্দ্রে দু-একজন অপরাধীকে ছাড় দিতে হয়েছে।

একজন সদস্য বলেন, অনিয়ম সংঘটিত হওয়া ১৪৫টি কেন্দ্রের বলা যায় সব কেন্দ্রেই দায়িত্বরতরা অপরাধী। ভিডিও ফুটেজের কারণে কারো দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। অনিয়ম অনিয়মই- আমরা সেভাবেই প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। তবে সুনির্দিষ্ট কতজনের বিরুদ্ধে শান্তির এই সুপারিশ তা খোলাসা করেননি সদস্যরা।

সূত্র বলছে, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাময়িক বহিষ্কার থেকে চাকরিচ্যুত করার মতো এখতিয়ার রয়েছে সাংবিধানিক সংস্থা ইসির। সেই সঙ্গে দুর্বৃত্তদের জেল-জরিমানার বিধানও রয়েছে। নির্বাচনে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ‘মাত্রা অনুযায়ী’ শাস্তি দেওয়ার কথা জানিয়েছে ইসি। বলেছে, তদন্তের জমা দেওয়া প্রতিবেদনের মাধ্যমে অপরাধের মাত্রা বুঝে শাস্তি নির্ধারণ হবে।

এদিকে, ১৪৫ কেন্দ্রের জন্য অনিয়ম তদন্তে গঠিত কমিটিকে চারটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের ছক কষে দিয়েছিল কমিশন। এগুলো হচ্ছে, পোলিং এজেন্ট বা ভোটার ছাড়া অন্যান্য ব্যক্তির গোপন কক্ষে প্রবেশ, গোপন কক্ষে ভোটদান দেখা, ভোটারদের কোনো প্রার্থীকে ভোটদানে বাধ্য করা বা প্রভাবিত করা, মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে গোপন কক্ষের ছবি ধারণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা। তবে দুটি প্রতিবেদন পেলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কমিশন থেকে কী ধরনের শাস্তির সুপারিশ জানাবে- এ বিষয়ে কমিশন দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথের নেতৃত্বে কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ইসির যুগ্মসচিব (প্রশাসন ও অর্থ) মো. কামাল উদ্দিন বিশ্বাস, যুগ্মসচিব (চলতি দায়িত্ব) মো. শাহেদুন্নবী চৌধুরী ছাড়াও কারিগরি কাজে সহায়তার জন্য যুক্ত ছিলেন ইসি সচিবালয়ের আইডিইএ ২ প্রকল্পের স্কোয়াড্রন লিডার মো. শাহরিয়ার আলম। কমিটির দুটি প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর অপরাধীদের বিরুদ্ধে কমিশন কী ধরনের শাস্তির সুপারিশ করেন, সেটাই দেখার বিষয় বলে জানিয়েছেন ইসি কর্মকর্তারা।

উল্লেখ্য, প্রয়াত ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার শূন্য হওয়া গাইবান্ধা-৫ সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন ছিল গত ১২ অক্টোবর। অনিয়মের কারণে ভোট চলাকালীন পুরো নির্বাচন বাতিল করা হয়।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close