গাজী শাহনেওয়াজ

  ১৭ আগস্ট, ২০২২

নতুন দল নিবন্ধনের আবেদনে সাড়া কম

নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য তিন মাস সময় দিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত ২৬ মের বিজ্ঞপ্তির আলোকে আবেদনের সময় শেষ হবে ২৯ আগস্ট। এখন পর্যন্ত নিবন্ধন পেতে নতুন দলের সাড়া পাচ্ছে না নির্বাচন কমিশন।

মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) পর্যন্ত দুটি দলের আবেদন জমা হয়েছে নিবন্ধন শাখায়। দল দুটি হচ্ছে- বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি ও মুক্তিযোদ্ধা লীগ।

নির্বাচন কমিশনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন আইন করে দল নিবন্ধনের পদ্ধতি চালু করে। এর আগে অষ্টম জাতীয় সংসদ পর্যন্ত নামসর্বস্ব ও ভুঁইফোড় দল নির্বাচনে অংশ নিয়ে হুলস্থুল পরিস্থিতি তৈরি করত। নিবন্ধনপ্রথা চালুর পর ইসির নিবন্ধন পেতে ১১৭টি দল আবেদন করলেও সব শর্ত পূরণ করে ৩৯টি দল নিবন্ধন পেয়েছিল। ওই সময়ের পর আরো কিছু দল নিবন্ধিত হলেও সে সংখ্যা আধাডজনের কম। সর্বশেষ নিবন্ধিত দল বাংলাদেশ কংগ্রেস। সবমিলিয়ে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৪৪টি হয়। তবে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত ও বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার আসামির নেতৃত্বাধীন দলসহ ৫টি দলের নিবন্ধন বাতিল বা স্থগিত হয়। দলগুলো হচ্ছে ফ্রিডম পার্টি; বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী; ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন; জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি (পিডিপি)। বর্তমানে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৩৯টি।

ইসির নিবন্ধন শাখার তথ্য মতে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দল নিবন্ধনের আবেদনকারীর সংখ্যা কমতে থাকে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, এর একটিই কারণ নিবন্ধনের শর্ত জটিল করা, নিবন্ধনের পর দলগুলোকে জবাবদিহির জায়গায় নিয়ে এবং শর্ত পূরণ করে নিবন্ধনের যোগ্যতা অর্জনে অক্ষমতা অন্যতম। কারণ, নিবন্ধনের পর প্রতি আর্থিক বছরের হিসাব অডিট ফার্ম দিয়ে বাছাই করে দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব ৩১ জুলাই তারিখের মধ্যে ইসিতে জমা দেওয়া এবং সময়ে সময়ে দলের শর্ত পূরণ করা দলীয় অফিস-কার্যালয় আছে কি না তা কমিশন থেকে যাচাই-বাছাই করা হয়। তদন্তে গিয়ে ইসির কর্মকর্তারা অনেক দলের কার্যালয় খুঁজে পায় না। এ নিয়ে দলগুলোকে ইসিকে চিঠি দিয়ে জবাব চাওয়া হয়। আবার কমিশন থেকে আর্থিক কোনো সুবিধা না পাওয়া এবং উল্টো জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়া। এসব ঝামেলা এড়াতে অনেক দল আবেদন করা ছেড়েই দিয়েছে বলা যায়। তবে বিশেষ গোষ্ঠী বা পক্ষের সমর্থন নিয়ে সময়ে সময়ে কিছু দল নিবন্ধন পেতে দৌড়ঝাঁপ করে। এ ছাড়া দেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ-বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বেশ কটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়াও নতুন দল আত্মপ্রকাশে অনীহা বলেও জানা গেছে।

ইসি সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর নিবন্ধনের জন্য আবেদন চেয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল কমিশন। সে বছর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন দল ইসিতে নিবন্ধিত হওয়ার জন্য আবেদন করার সুযোগ পায়। তখন ৭৬টি দল ইসির নিবন্ধন পাওয়ার জন্য আবেদন করলেও কোনো দলকেই নিবন্ধন দেয়নি কে এম নুরুল হুদা কমিশন। যদিও পরবর্তী সময়ে আদালতের আদেশে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন- এনডিএম (সিংহ) ও বাংলাদেশ কংগ্রেস (ডাব) নিবন্ধন দেয় ইসি।

সূত্র জানায়, এর আগে দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ৪৩টি দল নিবন্ধনের আবেদন করেছিল। তার মধ্য থেকে ৪১টিকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) ও সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট এই দুটি দলকে নিবন্ধন দিয়েছিল কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ কমিশন।

এবার নতুন দল নিবন্ধনের জন্য অনধিক ৭টি নতুন দল আবেদন ফরম সংগ্রহ করে ইসি থেকে বলে জানা যায়। এর মধ্যে দুটি দল আবেদন জমা দিয়েছে। দল দুটি হচ্ছে- বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি ও মুক্তিযোদ্ধা লীগ। ইসির ওয়েবসাইট থেকে আরো কয়েকটি দল ফরম সংগ্রহ করে শেষ সময়ে জমা দিতে পারে বলে নিবন্ধন শাখা থেকে জানা গেছে।

নতুন দলের নিবন্ধন সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি জারির পর সর্বসাকল্যে ৭টির মতো ফরম সংগ্রহ করেছে ইসি থেকে। এর মধ্যে দুটি দল আবেদন জমা দিয়েছে, তাদের অবস্থাও সুবিধাজনক নয়। আশা করছি, শেষ কর্মদিবসের আগে আরো কয়েকটি জমা পড়তে পারে।

নতুন দলের নিবন্ধন-সংক্রান্ত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়- গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৯০-ক-এর অধীন নিবন্ধন করতে ইচ্ছুক এবং রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮-এ উল্লিখিত শর্তাবলি পূরণে সক্ষম রাজনৈতিক দলসমূহকে বিধিমালায় সংযোজিত ফরমণ্ড১ নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত নির্দেশিকা মোতাবেক পূরণপূর্বক আগামী ২৯ আগস্ট, ২০২২ তারিখের মধ্যে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করার আহ্বান জানানো যাচ্ছে। নিবন্ধীকরণে আগ্রহী রাজনৈতিক দলকে স্বীয় লেটারহেড প্যাডে দরখাস্ত করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে (ক) দলের গঠনতন্ত্র; (খ) দলের নির্বাচনী ইশতেহার, যদি থাকে; (গ) দলের বিধিমালা, যদি থাকে; (ঘ) দলের লোগো এবং পতাকার ছবি; (ঙ) দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি বা সমমানের কমিটির সব সদস্যের পদবিসহ নামের তালিকা; (চ) দলের নামে রক্ষিত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর ও ব্যাংকের নাম এবং ওই অ্যাকাউন্টের সর্বশেষ স্থিতি; (ছ) দলের তহবিলের উৎসের বিবরণ; (জ) দলের নিবন্ধনের দরখাস্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুকূলে প্রদত্ত ক্ষমতাপত্র। (ঝ) নিবন্ধ ফি বাবদ সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের বরাবরে জমা করা অফেরতযোগ্য টাকার ট্রেজারি চালানের কপি (ট্রেজারিতে টাকা জমাদানের কোড নম্বর : ১০৬০১০১১০০১২৫-১১০০০০০০০-১১০০১০০০-১৪২২২০৪); (ঞ) দরখাস্ত দাখিলে দিন পর্যন্ত- (অ) বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দরখাস্ত দাখিল করার তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের যেকোনো একটিতে দলীয় নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে কমপক্ষে একটি আসন লাভের সমর্থনে প্রামাণিক দলিল; অথবা (আ) বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দরখাস্ত দাখিল করার তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের যেকোনো একটিতে দরখাস্তকারী দল কর্তৃক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা নির্বাচনী এলাকায় প্রদত্ত মোট ভোট সংখ্যার শতকরা পাঁচ ভাগ ভোট লাভের সমর্থনে কমিশন বা তদন্ত কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক ইস্যুকৃত প্রত্যয়নপত্র; অথবা (ই) দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ, উহা যে নামেই অভিহিত হোন না কেন, একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় দপ্তর অন্যূন এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর জেলা দপ্তর এবং অন্যূন একশতটি উপজেলা বা, ক্ষেত্রমতে, মেট্রোপলিটন থানায় কার্যকর দপ্তর এবং প্রতি উপজেলায় বা ক্ষেত্রমত, থানায় অন্যূন দুইশত ভোটার সদস্য হিসাবে দলের তালিকাভুক্ত থাকার সমর্থনে প্রামাণিক দলিল।

ইসির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, দল নিবন্ধনের যে শর্ত তা পূরণ করে নতুন দল হিসেবে নিবন্ধন পাওয়া কঠিন। কারণ জনসমর্থন বলতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর বাইরে জাতীয় পার্টি ও নিষিদ্ধ জামায়াতের কিছু সমর্থন আছে। বাকি দলগুলো বড় দুটি দলের ওপর ভর ও তাদের প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হচ্ছেন। তাতেই বোঝা যায়, নতুন দল আসা কঠিন ও চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে ইসির নিবন্ধনে থাকা ৩৯ দল হলো

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপি; জাতীয় পার্টি- জেপি; বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল); কৃৃষক শ্রমিক জনতা লীগ; বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি; বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি; গণতন্ত্রী পার্টি; বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি; বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি; বিকল্পধারা বাংলাদেশ; জাতীয় পার্টি; জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ; জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডি; জাকের পার্টি; বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদ; বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি- বিজেপি; বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন; বাংলাদেশ মুসলিম লীগ; ন্যাশনাল পিপলস্? পার্টি (এনপিপি); জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ; গণফোরাম; গণফ্রন্ট; বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- বাংলাদেশ ন্যাপ; বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি; ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ; বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি; ইসলামী ঐক্যজোট; বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস; ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ; বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট; বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি; খেলাফত মজলিস; বাংলাদেশ মুসলিম লীগ- বিএমএল; বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট); বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফ; জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন- এনডিএম ও বাংলাদেশ কংগ্রেস।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close