নিজস্ব প্রতিবেদক

  ১৭ আগস্ট, ২০২২

বিআরটি প্রকল্পে দায়িত্বহীনতার নজির

রাজধানীর ব্যস্ততম বিমানবন্দর সড়কে প্রায় এক দশক ধরে চলা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি প্রকট- এ অভিযোগ পুরোনো। নির্মাণকাজের সময় সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব প্রকল্প কর্তৃপক্ষের। এ জন্য খানাখন্দ মেরামত করতে হয় প্রতিনিয়ত। যানবাহন ও পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রকল্পের কাজের অংশ। এ জন্য নির্মাণ এলাকা ঘিরে রাখার নিয়ম।

নির্মাণকাজ শুরুর পর এ পর্যন্ত বিআরটির উড়ালপথ তৈরির গার্ডার ধসে চারটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সোমবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর উত্তরার জসিম উদ্দীন এলাকায় গার্ডার তোলার সময় তা একটি গাড়ির ওপর পড়ে যায়। এ ঘটনায় শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এর আগে গত ১৫ জুলাই গাজীপুর নগরীতে গার্ডারের নিচে চাপা পড়ে একজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। গত বছর ১৪ মার্চ বিমানবন্দর এলাকায় এবং আবদুল্লাহপুরে একই দিনে দুবার গার্ডারধসের ঘটনা ঘটে। এতে নির্মাণকাজে যুক্ত ছয়জন আহত হন। তাদের মধ্যে তিনজন চীনের নাগরিক।

নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত সূত্র জানায়, গার্ডারগুলো ইংরেজি বর্ণ ‘আই’ আকৃতির। প্রতিটির ওজন প্রায় ৪৫ টন। এসব গার্ডারের ওপর সø্যাব বসিয়ে বাস চলার পথ তৈরি হবে। এই গার্ডার বসানোর কাজ চলছিল কোনো রকম নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়াই। এ ছাড়া যেসব ক্রেন ব্যবহার করা হচ্ছিল, এগুলোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

প্রকল্প-সংক্রান্ত নথি অনুসারে, ২০১২ সালে নেওয়া বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজ চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে উড়ালপথ ও সড়ক নির্মাণের দায়িত্ব পালন করছে তিনটি চীনা কোম্পানি। এগুলো হচ্ছে চায়না গেজহুবা গ্রুপ, জিয়াংশু প্রভিনশিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ এবং ওয়েহেই ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেটিভ। আর গাজীপুরে ডিপো নির্মাণের দায়িত্বে ছিল দেশীয় কোম্পানি সেল- ইউডিসি। এদের কাজ আগেই শেষ হয়েছে। তবে চীনের তিনটি কোম্পানির কাজ চলছে। এ প্রকল্পের কাজ ২০১৬ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই অর্থসংকটে ভোগে। এ ছাড়া তাদের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ জন্যই কাজের গতি কম, মান নিয়ে অসন্তোষ আছে।

২০১৭ সালের দিকে নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত সড়কে গভীর খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। আবদুল্লাহপুর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত অংশে জলাবদ্ধতার সমস্যা ছিল তিন বছর। বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত চারটি সংস্থা। এর মধ্যে তিনটি সংস্থা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন। সড়ক পরিবহন বিভাগ সমন্বয়কের দায়িত্বে রয়েছে।

এই প্রকল্প ধীরগতির কাজেরও নজির তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে ৫ বছরের প্রকল্পকাজ প্রায় ১০ বছর ধরে চলছে। গত জুলাই পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৮১ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যয় বেড়েছে ১০৯ শতাংশ, যা ২ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। নির্মাণকাজের মূল সংস্থা সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সংস্থাটি এ পর্যন্ত ছয়জন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বড় প্রকল্পে শুরুতে প্রাথমিক সমীক্ষা করতে হয়। এরপর চূড়ান্ত সমীক্ষা করে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে হয়। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিআরটি নির্মাণে ২০১১ সালে প্রাথমিক সমীক্ষা করে এডিবি। তবে পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা হওয়ার আগেই প্রকল্প নেওয়া হয়। এতে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা সমস্যা দেখা দেয়। যেমন নির্মাণকাজ করতে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় যথাযথ পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নেই। ফলে পানি জমে যাচ্ছে। সেবা সংস্থার লাইন কীভাবে সরানো হবে, তাণ্ডও আগে থেকে ঠিক করা হয়নি। ব্যস্ততম সড়কে নির্মাণকাজের সময় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার কোনো বিকল্প চিন্তাও করা হয়নি।

২০১৯ সালে এসে বিমানবন্দর এলাকায় মানুষের রাস্তা পারাপারের জন্য বিআরটির মধ্যে একটি পাতালপথ যুক্ত করা হয়। এর ফলে ব্যয় বাড়ে ৪২০ কোটি টাকা। নির্মাণকাজে দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকি হ্রাসের ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়ম আছে। এর পরও দুর্ঘটনা ঘটে গেলে তা সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি থাকে। বিআরটি প্রকল্পে এর কিছুই ছিল না। প্রথমত, ব্যস্ত সড়কে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা না দিয়ে ভারী গার্ডার তোলা হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারে ক্রেন কিংবা আহতদের নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সও থাকার কথা, যা ছিল না। এটি চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার নজির।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close