নিজস্ব প্রতিবেদক

  ১৩ আগস্ট, ২০২২

ব্লক ইটে ভবন নির্মাণে খরচ কমে ৩০ ভাগ

* ব্লক ইট তৈরিতে পরিবেশের ক্ষতি হয় না * ঘর গ্রীষ্মকালে ঠাণ্ডা ও শীতকালে গরম থাকে

বাড়ির স্থায়িত্ব বেশি, দেখতেও সুন্দর। এ ছাড়া ঘরের ভেতর গ্রীষ্মকালে ঠাণ্ডা ও শীতকালে গরম থাকে। ব্লক ইটে তৈরি বাড়ি বা ভবনে পাওয়া যায় এই সুবিধা। পোড়া ইটের পরিবর্তে ব্লক দিয়ে বাড়ি তৈরিতে প্রায় ৩০ শতাংশ খরচ কমে যায়। ব্লক ইট তৈরিতে পরিবেশের কোনো ক্ষতিও হয় না।

বাংলাদেশ সরকারের হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই) দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবান্ধব ব্লক ব্যবহারে গবেষণা করে আসছে। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের ভবন বা ইমারত নির্মাণে ব্লক ইটের ব্যবহার চলছে। ২০২৫ সালের মধ্যে ইমারত নির্মাণে শতভাগ ব্লক ইটের ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা আরো জানান, শতভাগ ব্লক ব্যবহারের বিষয়ে এখনো কোনো নীতিমালা তৈরি হয়নি। এটি ব্যবহারের জন্য একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতিমালা হলে তা দ্রুতই বাস্তবায়ন করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ইমরাত নির্মাণে বাধ্যতামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার নিশ্চিত করার অগ্রগতি বিষয়ে একটি সভা গত ১৬ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। ব্লক ইটের ব্যবহার সভায় শতভাগ নিশ্চিত করতে একটি গাইডলাইন তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এই সভায়। এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক এইচবিআরআই-এর প্রধান গবেষণা কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ব্লক ইটের ব্যবহারের জন্য গাইডলাইন তৈরির কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে ইমারত নির্মাণে ২০২৫ সালের মধ্যে শতভাগ ব্লক ইটের ব্যবহার নিশ্চিত করার ব্যাপারে সফলতা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

২০১৯ সালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় থেকে ২৫ সালের মধ্যে সরকারি কাজে ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলত করে একটি গেজেট প্রকাশ করে। সেখানে ২০২০ সালে মধ্যে শতকরা ১০ ভাগ, ২০-২১ সালের মধ্যে ২০ ভাগ, ২১-২২ সালের মধ্যে ৩০ ভাগ, ২২-২৩ সালের মধ্যে ৬০ ভাগ, ২৩-২৪ সালের মধ্যে ৮০ ভাগ এবং ২৪-২৫ সালের মধ্যে সরকারি কাজে শতভাগ ব্লক ইটের ব্যবহারের কথা বলা হয় গেজেটে। তবে উপকারী নির্মাণসামগ্রী হওয়ার পরও ব্লক ইট ব্যবহারে আগ্রহ কম নির্মাণকারীদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বেসরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশে ব্লক ইট তৈরি করছে ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান। কনকর্ড গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ব্লক কারখানা তৈরি করে ২০০১ সালে। এ ছাড়া এইচবিআরআইও বেশ কয়েক ধরনের ব্লক বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করছে। ঢাকার বাইরে মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও পিরোজপুরে ১০টির মতো ব্লক ইট তৈরির কারখানা রয়েছে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান সিএসইবি, সিএসইবি ইন্টার লকিং, স্যান্ড সিমেন্ট হলো ব্লক, থার্মার ব্লক, স্যান্ডউইচ প্যানেল ও ফেরোসিমেন্ট চ্যানেলের মতো আধুনিক ব্লক তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্লক ইট দিয়ে বাড়ি তৈরি করলে খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়। থার্মাল বা অন্যান্য ব্লক দেয়ালে ব্যবহারের ফলে তাপ ও শব্দনিরোধক হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া ইটের তৈরি বাড়ির তুলনায় ওজনেও হয় কম। একটি ইট কিনতে যেখানে ব্যয় হয় গড়ে ১০ টাকা, সেখানে সাড়ে চারটি ইটের সমান একটি ব্লক কেনা যায় ৩০ টাকায়।

২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি সব নির্মাণকাজে পোড়া ইটের পরিবর্তে ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব, দামে সাশ্রয়ী, কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পরিবেশবান্ধব এই ব্লক ইট ব্যবহারের উপকারিতার কথা জনসাধারণকে অবহিত করার বিষয়ে নেই যথেষ্ট প্রচার। ফলে ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি কাজে শতভাগ ব্লক ইটের ব্যবহারের সফলতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

সরকারের হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ ব্লক ইটের ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে এই প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, স্বল্প পরিসরে সরকারিভাবে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে ব্লক ইট ব্যবহার হচ্ছে। এ ছাড়া চাহিদার দিকে লক্ষ রেখে দেশের বিভিন্ন জেলায় গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ব্লক ইট তৈরির কারখানা। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা একেবারে হাতে গোনা। ফলে এলাকাভেদে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগেও ব্লক ইটের ব্যবহার শুরু হয়েছে। যদিও তা একেবারেই কম।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে আইন সংশোধিত করে ধারা ৫(৩ক) যোগ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে মাটির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে হ্রাসকল্পে সব সরকারি নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারকাজে পোড়ানো ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু বেসরকারি ইমরাত নির্মাণকাজে ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক না হওয়ায় এ ক্ষেত্রে ব্লক ইটের ব্যবহার ও এর প্রসারে ঘাটতি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাস্তাঘাট বা ভবনের দেয়ালে পোড়া ইট ব্যবহারের আর কোনো প্রয়োজনই নেই। সব কাজই ব্লক দিয়ে করা সম্ভব। প্রচলিত যে ইট ব্যবহার করা হয়, তা হলো মাটি পুড়িয়ে তৈরি করা। আর ব্লক ইট আগুনে পোড়ানো নয়। মাটি, বালি, সিমেন্ট বা অন্য কোনো উপাদান মিশিয়ে তৈরি হয় ব্লক ইট। ব্লক ইট তৈরি হয় কারখানায় এবং ব্লক তৈরিতে পোড়ানো ইটের চেয়ে কম মাটির দরকার হয়। মাটির সঙ্গে সিমেন্ট মিশিয়ে কমপ্যাক্ট করে আরো ভালো ও টেকসই করা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো উন্নত দেশেই পোড়ামাটি ব্যবহার হয় না। আমাদের দেশে মানুষ বেশি ও কৃষিজমি কম। তাই কৃষিজমি যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য পোড়া ইটের বদলে ব্লক ব্যবহার আরো আগে হওয়া উচিত ছিল।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close