নিজস্ব প্রতিবেদক

  ০৮ আগস্ট, ২০২২

‘বঙ্গবন্ধুকে সংকটে পরামর্শ দিতেন বঙ্গমাতা’

প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বা মুচলেকা দিয়ে আইয়ুব খানের ডাকা গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেওয়া সম্পর্কিত দলের কিছু নেতার সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বন্দি মুজিবের কাছে বার্তা পাঠিয়েছিলেন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সমঝোতা করলে তার সামরিক বাহিনী তাদের সুবিধামতো যেকোনো সময়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবে বলে আরো পরে তিনি তাকে (বঙ্গবন্ধুকে) সাবধান করে দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকে ৭ মার্চের ভাষণের আগেও অনেকে অনেক রকম পরামর্শ দিলেও সঠিক পরামর্শটি দিয়েছিলেন তার সহধর্মিণীই। তিনি বঙ্গবন্ধুকে একটি কথাই বলেছিলেন, তিনি যেন তার নিজের মনে যা আছে, তাই ওই ভাষণে বলেন।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকাকালে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বা মুচলেকা দিয়ে আইয়ুব খানের ডাকা গোলটেবিলে যোগ দেওয়া সম্পর্কিত দলের কিছু নেতার সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বঙ্গবন্ধুর কাছে বার্তা পাঠিয়ে অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন বঙ্গমাতা। রণমূর্তি ধারণ করে সেদিন তিনি বঙ্গবন্ধুকে পরিষ্কার জানিয়ে দেন, তিনি হাতে বঁটি নিয়ে বসে আছেন, প্যারোলে মুচলেকা দিয়ে আইয়ুবের দরবারে যেতে পারেন, কিন্তু তাতে তার জীবনের তরে ৩২ নম্বরে আসা বন্ধ হবে।

প্রয়াত সাংবাদিক এবং লেখক এ বি এম মূসা তার ‘মুজিব ভাই’ গ্রন্থে এ ব্যাপারে লেখেন, শেখ মুজিব যদি মুচলেকা দিয়ে সহবন্দিদের ক্যান্টনমেন্টে রেখে রাওয়াল পিন্ডি যেতেন এ দেশের ভবিষ্যৎ ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।

৭১-এর ২২ মার্চ ইয়াহিয়া খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভুট্টোর মধ্যে বৈঠক চলছিল। কিন্তু বৈঠক খুব একটা ফলপ্রসূ বলে মনে হচ্ছিল না। এদিনেই সরকারের এক ঘোষণায় বলা হয়, পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আরো বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কারণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু করার পূর্ব সিদ্ধান্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল করা হয়েছে। ওই সময় আভাস পাওয়া গিয়েছিল, ইয়াহিয়া খান কোনো শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান করতে আন্তরিক নয়।

এম এ ওয়াজেদ মিয়া এ বিষয়ে তার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থে বলেন, ওইদিন দুপুরে বঙ্গবন্ধু কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে গম্ভীরভাবে খাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে শাশুড়ি বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘এত দিন ধরে যে আলাপ-আলোচনা করলে, তার ফলাফল কী হলো কিছু তো বলছো না। তবে বলে রাখি, তুমি যদি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সমঝোতা করো, তবে একদিকে ইয়াহিয়া খানের সামরিক বাহিনী তাদের সুবিধামতো যেকোনো সময় তোমাকে হত্যা করবে, অন্যদিকে এ দেশের জনগণও তোমার ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হবে।’

এ কথা শুনে বঙ্গবন্ধু রাগান্বিত হয়ে শাশুড়িকে বললেন, ‘আলোচনা এখনো চলছে। এ মুহূর্তে সবকিছু খুলে বলা সম্ভব না।’ এ পর্যায়ে শাশুড়ি রেগে গিয়ে নিজের খাবারে পানি ঢেলে দ্রুত ওপরের তলায় চলে যান। তিনি না খেয়ে সারা দিন শুয়ে থাকলেন, কারো সঙ্গে কথাও বললেন না।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে এদিন মা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রকাশ্য রাজনীতিতে কখনো না এলেও তিনিই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার মা ঘরের ভেতরে ডেকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সেদিন একটি কথাই বলেছিলেন, তিনি যেন তার নিজের মনে যা আছে তাই ওই ভাষণে বলেন। তিনি বলেছিলেন, গোটা দেশ তার এই ভাষণের দিকে তাকিয়ে আছে। অতএব, তাকে সে কথাই বলতে হবে যা বাঙালি জাতি চায়।’

শেখ হাসিনা সেদিন সেমিনারে তার বক্তব্যে আরো বলেন, তার মা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের সে কথা মেনেই বঙ্গবন্ধু ওই ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তবে, ইয়াহিয়া খানকে নিয়ে বেগম মুজিবের এ আশঙ্কায়ে অমূলক ছিল না পরবর্তী সময়ে কিন্তু তা প্রমাণ হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া যখন ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি দেওয়ার আবারও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর আগে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায়ও বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার একটি পরিকল্পনা আঁটা হয়েছিল।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close